Bartaman Logo
২ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নয়া দিশা ১২৫ দিনের কাজ

পশ্চিমবঙ্গে শুরু হল নয়া দিশা প্রকল্প, ১২৫ দিনের কাজের গ্যারান্টি। বেকার ভাতা ও মজুরি নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ। বিস্তারিত পড়ুন।

নয়া দিশা ১২৫ দিনের কাজ
  • ২ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বুধবার রাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হল ভিবি জি রাম জি প্রকল্প। ২০০৬ সাল থেকে রাজ্যে চালু ছিল মহাত্মা গান্ধীর নামাঙ্কিত ১০০ দিনের কাজের গ্যারান্টি প্রকল্প (সংক্ষেপে মনরেগা)। গরিব শ্রমজীবী মানুষের আংশিক কর্মসংস্থান এবং তাদের হাতে নগদ জোগান বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করাই ছিল প্রকল্পটির উদ্দেশ্য। কোভিড-১৯ সংকটকালে বেশিরভাগ পণ্য ও পরিষেবা ক্ষেত্র মুখ থুবড়ে পড়েছিল। তার দরুন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় গরিব বা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলি। কারণ রাতারাতি বেকার হয়ে গিয়েছিল কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ। ওই দুঃসময়ে অর্থনীতির হাল চাঙা রেখেছিল কৃষিক্ষেত্র। আর তার সঙ্গে সুসংগত করেছিল মনরেগা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানার শেষদিকে, ২০২২ নাগাদ পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্প রূপায়ণে ব্যাপক বেনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ আনে বিজেপি। তার জেরে রাজ্যে মনরেগায় কেন্দ্রীয় অর্থ বরাদ্দ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়েও মমতার এঁটে উঠতে পারেনি। কেন্দ্র-রাজ্য (বাস্তবে বিজেপি-তৃণমূল) বিবাদের মাশুল একতরফা গুনতে হয়েছিল বাংলার কোটি কোটি গরিব মানুষকে। কয়েক কোটি শ্রমদিবস জলাঞ্জলি গিয়েছিল। তার প্রত্যক্ষ ও বিরূপ প্রভাব পড়েছিল রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিতে। সেই বিবাদ জিইয়ে রেখেই নির্বাচনে যায় বিজেপি। দু-মাস আগে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে গিয়েছে রাজ্যে। 

Advertisement

নবান্ন এখন বিজেপির দখলে। বঙ্গে অর্ধ শতকে প্রথম ডবল ইঞ্জিন সরকার প্রতিষ্ঠা হতেই সংশ্লিষ্ট মহলের কৌতূহল ছিল—এবার কি শাপমোচন ঘটবে বাংলার? বাংলা কি দুয়োরানি থেকে সুয়োরানি হয়ে ওঠার যোগ্যতা অর্জন করবে? বাংলা কি সেই সৌভাগ্যের অধিকারী হবে যে, আর নিত্য কেন্দ্রীয় বঞ্চনার আঙুল তুলতে হবে না দিল্লির দিকে? উপর্যুক্ত প্রতিটি প্রসঙ্গে, নির্বাচনি প্রচারে বিজেপির তরফে অন্তত ইতিবাচক দাবিই করা হয়েছিল। দলের দাবিতে এন্তার সিলমোহরও দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্বয়ং। রাজ্যজুড়ে ভিবি জি রাম জি প্রকল্পের সূচনাকে বিজেপির সেই অঙ্গীকার রক্ষা বিবেচনা করা যেতে পারে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যে জবকার্ডধারীর সংখ্যা আড়াই কোটির অধিক। তাঁরা বছরে ন্যূনতম ১২৫ দিনের কাজের নিশ্চয়তা পেলেন। ওইসঙ্গে এই গ্যারান্টিও দেওয়া হয়েছে যে, আবেদন করেও কাজ না পেলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা আবেদন করার ১৫ দিনের মধ্যে পাবেন দৈনিক হারে বেকার ভাতা। ভাতার হার আইনমাফিক পশ্চিমবঙ্গ সরকারই নির্ধারণ করবে। অর্থবর্ষের প্রথম ৩০ দিনের জন্য বেকার ভাতা হবে ঘোষিত মজুরির কমপক্ষে চারভাগের একভাগ বা ২৫ শতাংশ।  পরবর্তী সময়ের জন্য বেকার ভাতা হবে ঘোষিত মজুরির কমপক্ষে অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ। এছাড়া কাজ করার পর বাধ্যতামূলকভাবে সপ্তাহের ভিতরে কিংবা সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে মজুরি প্রদান করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে মজুরি না পেলে প্রতিদিনের জন্য ০.০৫ শতাংশ হারে ক্ষতিপূরণ পাবেন সংশ্লিষ্ট শ্রমিক। এই প্রকল্পের ৬০ শতাংশ অর্থ দেবে কেন্দ্র এবং ৪০ শতাংশ বহন করবে রাজ্য সরকার। তবে বেকারভাতা ও মজুরি বিলম্বজনিত ক্ষতিপূরণের সম্পূর্ণ দায় থাকবে রাজ্যের উপর। 
মনরেগায় দুর্নীতি থেকে শিক্ষা নিয়ে নয়া প্রকল্প রূপায়ণে রাজ্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করবে বলে জানানো হয়েছে। কাজের অগ্রগতি এবং মূল‌্যায়নের জন্য চলবে ডিজিটাল নজরদারি। থাকছে বায়োমেট্রিক উপস্থিতি, প্রতিটি প্রকল্পের জিয়ো-ট্যাগিং ও রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যাবস্থা। এমনকি পরিকল্পনা, নিরীক্ষা ও জালিয়াতি রোধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কমপক্ষে ৫০ শতাংশ কাজ গ্রাম পঞ্চায়েতের মাধ্যমে করাতে হবে এবং কোনো ঠিকাদার নিয়োগ করা যাবে না। কৃষিক্ষেত্রে শ্রমিকের সংকট এড়াতে কৃষি মরশুমে (বছরে মোট ৬০ দিন) ভিবি জি রাম জির কাজ বন্ধ থাকবে। ১ জুলাই থেকে গ্রামে ১২৫ দিনের কাজের গ্যারান্টি প্রকল্প চালু করা নিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তর। গ্রামীণ এলাকার যেসব পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যরা অদক্ষ শ্রমিকের কাজ করতে আগ্রহী, তাঁরাই এই প্রকল্পে কাজের আবেদন করতে পারবেন। একক মহিলা, বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি, প্রবীণ নাগরিক, বিশেষভাবে দুর্বল আদিবাসী গোষ্ঠী, ট্রান্সজেন্ডার প্রভৃতি কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় ক্ষেত্রে কিছু সম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে। যদি স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং নিরপেক্ষতা বজায় রেখে ধারাবাহিকভাবে এটি রূপায়িত হতে পারে, তবে বেকারত্ব এবং দারিদ্রদূরীকরণে বড়ো ভূমিকা থাকবে প্রকল্পটির। সৃষ্ট সম্পদেও সমৃদ্ধ হবে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা। এজন্য যুগপৎ প্রশংসা পাবে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ