তন্ময় মল্লিক: যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্যই ব্রিটিশ আমলে পাতা হয়েছিল রেলপথ। উদ্দেশ্য মানুষকে পরিষেবা দেওয়া। সেই রেলকেই মুনাফা লোটার হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা চলছে। শুরু হয়েছে হকার উচ্ছেদ অভিযান। স্টেশন চত্বরের পাশাপাশি সাফ হয়ে যাচ্ছে শহরের রাস্তাও। শুধু গরিবের পেটে লাথি মারলেই হবে না। ট্রেন চালাতে হবে টাইম টেবিল মেনে। নিশ্চিত করতে হবে যাত্রী সুরক্ষা। তা না হলে মানুষ ভাবতে পারে, হকার উচ্ছেদের পিছনে আছে কোনো গোপন অভিসন্ধি।
আসানসোলের এনএস রোডে বাপের বাড়িতেই থাকেন বছর বত্রিশের কিরণ মিশ্র। স্বামী মারা যাওয়ার পর শ্বশুরবাড়ির লোকজন যোগাযোগ রাখেন না। অগত্যা বৃদ্ধ বাবাই ভরসা। নিজের পড়াশোনা বেশি দূর হয়নি। তাই দুই ছেলেকে মানুষ করার খুব ইচ্ছা। তারজন্য দেড় লক্ষ টাকা দিয়ে রামধেনু মোড়ে ফুটপাতের একটা দোকান নিয়েছিলেন। অল্পদিনেই জমে গিয়েছিল দোকান। কিন্তু, সুখ তো সবার কপালে সয় না। স্বামীহারা কিরণদেবীরও সয়নি। উচ্ছেদ অভিযানের ধাক্কায় শুধু গুমটিদোকানই নয়, চুরমার হয়েছে তাঁর স্বপ্নও। বড়ো ছেলের তিন মাসের স্কুল ফি বাকি। কিরণদেবী বিড় বিড় করে বলেন, ‘ছেলে দু’টোকে হয়তো আর পড়াতে পারব না।’
পুরুলিয়া শহরের কোর্ট রোডে স্টেট ব্যাংকের গেটের কাছেই ছিল মথুর দত্তের চায়ের দোকান। বড়ো মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোটো মেয়ে ও ছেলে কলেজে পড়ছে। উচ্ছেদ হয়েছে তাঁর ২৫বছরের দোকান। মথুর বলেন, ‘দোকানটা ভেঙে দেওয়ায় খুব বিপাকে পড়েছি। বুঝতে পারছি না কী করব?’
শুধু পুরুলিয়া, আসানসোল, সোদপুর বা দমদম নয়, এই ছবি রাজ্যের সর্বত্র। নির্বাচনের আগে বুলডোজারের সামনে বিহারের মা, বোনেদের বুকফাটা কান্নার ভিডিয়ো ছড়িয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। মহিলাদের বুকফাটা হাহাকার, ‘দরকার নেই ১০ হাজার টাকা। ফিরিয়ে দাও আমাদের ঘর।’ সেই ভিডিয়ো দেখে অনেকে বলেছিলেন, ‘এসব ফেক।’ কিন্তু, এখন বাংলার মানুষও বুঝতে পারছেন ভিডিয়োগুলি ফেক নয়। চরম বাস্তব।
বিভিন্ন স্টেশন, শহরের ফুটপাত ও ড্রেন দখল করে প্রচুর দোকান হয়েছে। তাতে মানুষকে সমস্যায় পড়তে হয়। তাই ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় অনেকেই খুশি। তাঁরা বলছেন, ‘উদ্যোগ প্রশংসনীয়।’ পাশাপাশি একথাও তো ঠিক, শিক্ষান্তে চাকরির এবং যোগ্যতা অনুসারে কাজের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।
কিন্তু, রাষ্ট্র যদি সেকাজে ব্যর্থ হয়? তখন নিজের
মতো করে বাঁচার ও জীবিকার সন্ধান করাটাকে কি বেআইনি বলা যায়!
সরকার কি শুধুই শাসন করার ও আইন প্রণয়নের জন্য? গরিব, পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে পদক্ষেপ করাই কল্যাণকর রাষ্ট্রের কর্তব্য। তারজন্য উচ্ছেদের পাশাপাশি চালু হয়েছে পুনর্বাসন ব্যবস্থা। বিকল্প ব্যবস্থা না করে কারো জীবিকা কেড়ে নেওয়াটা সভ্য সমাজের চোখে ‘অমানবিক’ বলেই বিবেচিত হয়। কিন্তু, এখন সেইসব উৎখাত ও ভাঙচুরের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে অনেকেই ‘ঠিক হয়েছে’ মন্তব্য করছেন।
তর্কের খাতিরে ধরেই নেওয়া গেল, যাঁরা ফুটপাত ও ড্রেন দখল করে এতদিন বিক্রিবাটা করেছেন তাঁরা মানুষের যাতায়াতের পথে সমস্যা সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু, ট্রেনের হকাররা তো কারো জায়গা দখল করেন না। বড়োজোর তাঁদের চিৎকারে তন্দ্রাচ্ছন্ন যাত্রী কিছুটা বিরক্ত হতে পারেন। কিন্তু, এটাও তো ঠিক, হকাররা দোকানের চেয়ে অনেক কম দামে আম, কলা, লেবু, ঝালমুড়ি, ঘুগনি-পাউরুটি, চালের পাঁপড় ভাজা সহ হরেক রকমের জিনিস বিক্রি করেন। সারা দিন কিছু মুখে দিতে না পারা মানুষটার পেটে যখন ছুঁচোয় ডন মারে তখন তাঁর চোখ থাকে হকারের মাথার ঝাঁকার দিকে। ১৫ টাকার ঝালমুড়ি অথবা ২০ টাকার ঘুগনি-পাউরুটিতেই সারা হয়ে যায় ‘লাঞ্চ’। লাভবান উভয়পক্ষই। যিনি খাচ্ছেন এবং খাওয়াচ্ছেন। একজনের পেট ভরে, অন্যজনের জোগাড় হয় পেট ভরানোর রসদ।
তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাওয়া যাত্রীটির মুখের সামনে ঠান্ডা জলের বোতল কে এগিয়ে দেয়? হকার। যাঁরা কাজের জন্য সাতসকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফেরেন রাতে, তাঁদের কাছে হকাররাই মুশকিল আসান। গিন্নির ফরমাস করা সুচ, সেফটিপিন, মশারি টাঙানোর দড়ি, ছেলেমেয়ের জন্য লজেন্স থেকে গুড়কাঠি সবই পেয়ে যান ট্রেনের কামরায় বসে। দোকানের চেয়ে দামও কিছুটা কম। কিন্তু, সেই মুশকিল আসানদেরও আর দেখা যাবে না ট্রেনের কামরায়। শোনা যাবে না স্টিলের ডিব্বায় চামচ ঠোকার টং টং আওয়াজ আর ‘ঝালমুড়ি খা-বে-ন, ঝালমুড়ি’ ডাক।
রামপুরহাটের রাজুপ্রসাদ ভকত ২৫ বছর ধরে ট্রেনে ঝালমুড়ি বিক্রি করছেন। আগে তাঁর দুই দাদা ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন। কিন্তু, ট্রেন দুর্ঘটনায় জখম হওয়ার পর তাঁরা কাজ বন্ধ করে দেন। তখন থেকেই এক্সপ্রেস ট্রেনে রাজুপ্রসাদের ঝালমুড়ি বিক্রি শুরু। টানা আড়াই দশকের সেই রুটিনের এবার অবসান! রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে, ট্রেনের কামরায় হকারি করলে দিতে হবে ২০০০ টাকা জরিমানা। রাজুপ্রসাদ বলেন, ‘সস্তা হয় বলেই যাত্রীরা আমাদের কাছ থেকে খাবার, মালপত্র কেনেন। ট্রেনে হকারি করা বন্ধ হলে যাত্রীরা বেশি দাম দিয়ে রেলের খাবার খেতে বাধ্য হবেন। সেই কারণেই হকার উচ্ছেদ অভিযান। কিন্তু ৫২বছর বয়সে দাঁড়িয়ে এখন কী করব? আমি তো হকারি ছাড়া কিছুই জানি না।’
রামপুরহাটের বিজয় রায় ট্রেনে ঘুগনি বিক্রি করতেন। ঘুগনির হাঁড়ি মাথায় নিয়ে এক কামরা থেকে অন্য কামরা, এক ট্রেন থেকে আর এক ট্রেনে ঘুরে বেড়াতেন। এভাবেই কাবার হয়ে যেত দিন। তাতে তাঁদের চারজনের সংসার চলে যেত কোনোরকমে। কিন্তু আইন হয়েছে, ট্রেনে হকারি করা চলবে না। মেহুল চোকসি, নীরব মোদিরা আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাতেই পারেন। কিন্তু গরিব মানুষকে তা মানতেই হয়। বিজয়বাবুকেও মানতে হয়েছে। নির্দেশ অমান্য করে ট্রেনে ঘুগনি বিক্রি করায় দিতে হয়েছে কড়কড়ে ২০০০টাকা ফাইন। ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রির অবস্থা। তাই কাজ বন্ধ। বিজয়বাবুর স্ত্রী কণিকাদেবীর কথায়, করোনার চেয়েও পরিস্থিতি খারাপ। তখন রোজগার ছিল না। কিন্তু, পাশে ছিল এলাকার মানুষ, প্রশাসন। আর এখন? কাজ নেই। রোজগারও নেই। নেই সহানুভূতি। উলটে গুনতে হচ্ছে জরিমানা।
বাংলায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজ্যেই পরিযায়ী শ্রমিকদের কাজের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। কিন্তু, কর্মসংস্থান সৃষ্টির আগেই নামানো হয়েছে বুলডোজার। ফুটপাতের গুমটি, দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে নির্বিচারে। নতুন করে বেকার তৈরি হচ্ছে। উচ্ছেদ হওয়া হকাররা বলছেন, ‘আমরা ছিলাম হকার, রাজ্যে পালাবদলের পর হয়ে গেলাম বেকার।’ সরকার যদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে উচ্ছেদ অভিযানে নামত এইসব প্রশ্ন উঠত না। উলটে মানুষ মনে করত, তাঁদের সরকার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত সঠিক। কিন্তু, বছরে ২০ লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশ্বাস দিয়ে মানুষের রুজিরুটিতে আঘাত করলে প্রশ্ন তো উঠবেই।
রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে, ট্রেনে ভিক্ষা করাও অপরাধ। কেউ ট্রেনে উঠে ভিক্ষা করলে দিতে হবে ২০০০ টাকা জরিমানা। অন্যের করুণার উপর নির্ভর করে যাঁদের দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোটে তাঁদেরও দিতে হবে জরিমানা? রেল কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই চরম ‘অমানবিক’ বলে মনে করছেন। হকার উচ্ছেদ পর্বে নেপু মণ্ডল নামে এক দৃষ্টিহীন যুবক সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিয়ো পোস্ট করেছেন। তাতে তিনি বলেছেন, ‘প্লিজ, পেটে লাথি মারবেন না। লাথি খুব লাগে। যদি মারতেই হয় তাহলে একসঙ্গে দাঁড় করিয়ে গুলি চালিয়ে দিন।’ প্রতিবন্ধী ভাতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এমপি ভাতা, এমএলএ ভাতা বাড়ছে, ডিএ বাড়ছে। মাইনে বেড়ে লাখ টাকা হচ্ছে তখন আমাদের কী হচ্ছে? পেটে লাথি মারছেন। কেন? নরম মাটি আঁচড়াতে খুব ভালো লাগে, তাই না?’
জন্মান্ধ নেপুবাবুর বহির্জগৎ সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। কিন্তু, তাঁর অন্তর্দৃষ্টি অত্যন্ত প্রখর। তিনি নিজে দেখতে পান না ঠিকই। কিন্তু, আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্রযন্ত্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন, অন্যায় হলে প্রতিবাদ করা নাগরিকের কর্তব্য।