মনের উদ্বেগে সারারাত্রি ভাল নিদ্রা হইল না। শেষ রাত্রে ৩টার সময়ে উঠিয়া, বুড়ীগঙ্গায় স্নান করিয়া, ব্রাহ্মমন্দিরে প্রচারক-নিবাসের দ্বারে গিয়া উপস্থিত হইলাম। শুনিতে লাগিলাম—গোস্বামী মহাশয় করতাল বাজাইয়া ভোর-কীর্ত্তন করিতেছেন। “জয় জ্যোতিৰ্ম্ময়, জগদাশ্রয়, জীবগণ-জীবন”—এই গানটি গাইতে গাইতে, এক একবার ভাবাবেশে তিনি রুদ্ধকণ্ঠ হইয়া পড়িতে লাগিলেন। আমি কিছুক্ষণ দ্বারে বসিয়া রহিলাম। কীর্ত্তনান্তে গোস্বামী মহাশয় বাহিরে আসিলেন এবং আমাকে সম্মুখে দেখিতে পাইয়া হাসিমুখে বলিলেন— এত ভোরে এসেছ? তা বেশ হয়েছে। এখন সমাজে গিয়ে ব’সো। একটু বেলা হোক্; পরে শুভক্ষণ বুঝে তোমাকে ডেকে নিব।
আমি সমাজ-ঘরে আসিয়া বসিলাম। প্রায় এক ঘণ্টা পরে গোস্বামী মহাশয় আমাকে ডাকিলেন। গোস্বামী মহাশয়ের কাছে উপস্থিত হওয়ামাত্রই তিনি আসন হইতে উঠিয়া বলিলেন—“চল উপরে যাই, সেইখানে কাজ হবে।” আমি গোস্বামী মহাশয়ের পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিলাম। শ্রীযুক্ত অনাথবন্ধু মৌলিক, শ্রীধর ঘোষ, শ্যামাকান্ত চট্টোপাধ্যায় মহাশয়েরাও আমাদের সঙ্গে চলিলেন। দোতলার পূবের ঘরে প্রবেশ করিয়া দেখিলাম, ঐ ঘরের দক্ষিণ-পূর্ব্ব কোণে দু’খানা আসন পাতা রহিয়াছে। গোস্বামী মহাশয় দেওয়াল ঘেঁসিয়া পশ্চিমমুখো হইয়া বসিলেন, এবং তাঁহার সম্মুখে প্রায় ৩ ফুট অন্তরে অন্য আসনে আমাকে বসিতে বলিলেন। গোস্বামী মহাশয়ের কন্যা শ্রীমতী শান্তিসুধা এই সময়ে ধুনুচিতে করিয়া আগুন আনিয়া দিল। গোস্বামী মহাশয় ধূপ-ধুনা-গুগ্গুল-চন্দনাদি অগ্নিতে পুনঃপুনঃ নিক্ষেপ করিয়া, করজোড়ে বারংবার নমস্কার করিয়া, স্থিরভাবে বসিয়া রহিলেন। অবিরলধারে তাঁহার গণ্ড বাহিয়া অশ্রুজল পড়িতে লাগিল। এখন কিছুক্ষণের মত গোস্বামী মহাশয় বাহ্যজ্ঞানশূন্য থাকিবেন অনুমানে, ব্যাকুল অন্তরে, কাতরতাবে, আমি মনে মনে ভগবানের চরণে প্রার্থনা করিতে লাগিলাম—“হে জ্ঞানস্বরূপ, জাগ্রতপুরুষ, হে সর্বসাক্ষী, সর্ব্বব্যাপী, দীনজনের একমাত্র গতি পরমেশ্বর, হে পতিতপাবন দয়াময় প্রভু, তোমাকে আমি বিশ্বাস করি আর না করি, তুমি এখানে আছ, আমার অন্তরের সমস্ত অবস্থাই দেখিতেছ। বহুকাল হইতে তোমার চরণলাভ করিবার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি করিয়া দিয়া, দিন দিন তুমি আমাকে অস্থির করিয়া তুলিয়াছ, নানাপ্রকার বিঘ্ন বিপদ সৃষ্টি করিয়া, তুমিই দয়া করিয়া তাহা হইতে আবার আমাকে উদ্ধার করিয়াছ। প্রভু, যেমন আশা দিয়াছ, ফলও তেমনি দিও। তোমাকে লাভ করিবার উপায় আমি কিছুই জানি না। প্রভো, তুমি সর্ব্বঘটে পূর্ণরূপে বর্তমান। আজ গোঁসাইয়ের ভিতরে তুমি থাকিয়া আমাকে দীক্ষা দাও। তোমার শ্রীচরণ লাভ করিবার পথ তুমিই আমাকে বলিয়া দাও। এখন আমি আমাকে তোমার শান্তিপ্রদ অভয় চরণে সমর্পণ করিলাম। হে সর্ব্বশক্তিমান্, সত্যস্বরূপ, পুরাণপুরুষ, এ সময়ে গোস্বামী মহাশয়ের মুখে তুমিই আমাকে সাধন দাও। তাঁর ঐ মুখে তুমিই আমাকে তোমার সর্ব্বাপেক্ষা প্রিয় নাম বলিয়া দাও। এখন গোঁসাইয়ের মুখের প্রত্যেকটি শব্দ তোমারই অভ্রান্ত বাণী বলিয়া আমি গ্রহণ করিব। তোমার শ্রীচরণে আমার এই প্রার্থনা বিষয়ে তুমিই আমার একমাত্র সাক্ষী রহিলে। স্বয়ং তুমিই আমাকে আজ দীক্ষা না দিলে গোঁসাইয়ের মুখ অকস্মাৎ বন্ধ হইয়া পড়ুক। আর কি বলিব, তুমিই আমাকে দয়া কর।”
প্রার্থনান্তে নমস্কার করিয়া চাহিয়া দেখি, গোস্বামী মহাশয় পুনঃপুনঃ শিহরিয়া উঠিতেছেন, তাঁহার কলেবর কণ্টকিত হইতেছে। করজোড়ে গদগদ স্বরে—“নমস্তস্মৈ নমস্তস্মৈ নমস্তস্মৈ নমোনমঃ। যো দেবঃ সর্ব্বভূতেষু শান্তিরূপেণ সংস্থিতঃ”—ইত্যাদি স্তোত্র পড়িতেছেন।
কুলদানন্দ ব্রহ্মচারীর ‘শ্রীশ্রীসদ্গুরু সঙ্গ’(১ম খণ্ড) থেকে