Bartaman Logo
৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সমস্যা গভীরে

অন্নপূর্ণা যোজনায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ মহিলার বরাদ্দে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ক্ষুব্ধ মহিলারা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। বিস্তারিত পড়ুন।

সমস্যা গভীরে
  • ৫ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রতিশ্রুতি ছিল বিধানসভা নির্বাচনের আগে সংকল্পপত্রে। এরাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে মহিলাদের মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে অন্নপূর্ণা যোজনায় প্রতিমাসে ৩০০০ টাকা করে দেওয়া হবে। মমতা সরকারের দেওয়া লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের দ্বিগুণ অর্থ। বলা হয়েছিল, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সব উপভোক্তাই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার পাবেন। প্রতিশ্রুতির খেলাপ করেনি রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকার। মে মাসে শপথ নেওয়ার পর জুন মাসেই প্রথম পর্বে রাজ্যের ২৭ লক্ষ উপভোক্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অন্নপূর্ণা যোজনার ৩০০০ টাকা পৌঁছে যায়। দ্বিতীয় পর্বে ১ জুলাই সরকার জানায়, সেদিন পর্যন্ত মোট ১ কোটি ৬০ লক্ষ মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য আবেদন করেছেন। এর মধ্যে বাদ পড়েছেন ২৬ লক্ষ, বাকি ১ কোটি ৩৪ লক্ষের মধ্যে ১ কোটি ৩০ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে মাসিক বরাদ্দ ঢুকে যাবে। সরকারের দেওয়া এই তথ্যে পরিষ্কার, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রায় ১ কোটি উপভোক্তা বাদ পড়তে চলেছেন অন্নপূর্ণা যোজনায়। এর একটি কারণ যদি হয়, অনেকেই এখনও আবেদন করেননি, তবে অন্য কারণটি হল, সরকারের দেওয়া শর্ত। যেখানে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরি করলে বা আয়কর দিলে মিলবে না অন্নপূর্ণার টাকা। এই শর্ত আগের আমলে ছিল না। এই নিয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ক্ষোভ রয়েছে মহিলাদের একাংশের মধ্যে। কারণ ভোটের আগে এসব শর্তের প্রসঙ্গ সামনে আনা হয়নি। ফলে ক্ষোভ, গত কয়েকদিনে কয়েকগুণ বেড়েছে। কারণ, অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম পূরণ করে জমা দিয়েও বরাদ্দ না পাওয়ার অভিযোগ। ঘটনা হল, বরাদ্দ টাকার অঙ্ক দ্বিগুণ হওয়ায় যে খুশির ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল মহিলামহলে, অপ্রাপ্তির ধাক্কায় তা যেন অনেকটা উধাও। একে তো ১২ পাতার ফর্ম পূরণের জটিলতা রয়েইছে। তার উপর পুরসভা ও পঞ্চায়েতে উপযুক্ত লোকবলের অভাব, সার্ভার অচল থাকার কারণে অনেক জায়গায় যোগ্য প্রাপকের অনেকে এখনও টাকা পাননি বলে মনে করা হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের তরফে গাফিলতির অভিযোগও উঠেছে। এসবের নিট ফল হল, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পঞ্চায়েত ও পুরসভার কর্তাদের ঘেরাও করে রাখছেন মহিলারা। কোথাও বা অফিসে তালা লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ক্ষুব্ধ মহিলাদের কেউ কেউ আবার ডিম ছুড়ে প্রতিবাদ করেছেন— এই ছবিও দেখা গিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি অতিরিক্ত তাড়াহুড়োর ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হল? 

Advertisement

অন্নপূর্ণা যোজনার মতো ১২৫ দিনের কাজের প্রকল্প নিয়েও গোড়াতেই অভিযোগের আঙুল উঠেছে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে। এর আগে দু’দশক ধরে চালু ১০০ দিন নিশ্চিত কাজের এই প্রকল্পটির নাম ছিল ‘মনরেগা’। সেটাই পালটে করা হয়েছে ১২৫ দিন। নতুন নাম ‘ভিবি জি রাম জি’ প্রকল্প। ১ জুলাই গোটা দেশে ঘটা করে চালু হয়েছে এই প্রকল্প। কিন্তু প্রথম তিন দিনেই পশ্চিমবঙ্গ কাঙ্ক্ষিত কর্মদিবস তৈরির ক্ষেত্রে অন্যান্য অনেক রাজ্য থেকে পিছিয়ে পড়েছে! কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া তথ্য বলছে, শুরুর প্রথম তিন দিনে অন্ধ্রপ্রদেশ ৯ লক্ষের বেশি, উত্তরপ্রদেশ ১ লক্ষ ৮৮ হাজারের বেশি, গুজরাত প্রায় ৩০ হাজার শ্রমদিবস সৃষ্টি করেছে। অথচ এই রাজ্যে সৃষ্টি হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৩৯৯ কর্মদিবস। পশ্চিমবঙ্গে জবকার্ড হোল্ডারের সংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি হওয়া সত্ত্বেও কেন এই হাল, তা খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে রাজ্যের ব্যাখ্যা হল, পশ্চিমবঙ্গে ৩ হাজার ৩৩৯টি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানের বেশিরভাগ এখন নিষ্ক্রিয়। অনেকে ইস্তফা দিয়েছেন। পাশাপাশি পঞ্চায়েতে শূন্যপদের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। ফলে পরিচালন ব্যবস্থায় বড়োসড়ো ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। শুধু জেলাশাসক, এসডিও, বিডিওদের মতো সরকারি আমলাদের দিয়ে কোনো প্রকল্পই বেশি দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। 
সন্দেহ নেই, গোটা রাজ্যেই এই সমস্যা এখন মূর্তিমান বাস্তব এবং গভীর। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার সুবাদে রাজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পুরসভা ও পঞ্চায়েত তৃণমূলের দখলে। রাজ্যে পালাবদলের পর অধিকাংশই অনেকটা ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’র পথে চলে গিয়েছে। বহুক্ষেত্রে সেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের টিকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নবান্নের গদি ওলটাতেই কার্যত তাঁরা বসে গিয়েছেন। অনেকে নৈতিকতার দোহাই দিয়ে মাঝপথেই পদত্যাগ করে দায়িত্ব ছেড়েছেন। অনেকে আবার ভয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন। ফলে শহর-গ্রামে প্রশাসনিক কাজে কিছুটা অচলাবস্থা দেখা দিচ্ছে। সরকারের দৈনন্দিন কাজ থেকে অন্নপূর্ণা যোজনা, ভিবি জি রাম জির মতো বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুষ্ঠু রূপায়ণে বড়োসড়ো ফাঁক থেকে যাচ্ছে। পুরসভা ও পঞ্চায়েতের কর্মিবাহিনীও উপযুক্ত জায়গা থেকে নির্দেশের অভাবে দোদুল্যমানতায় ভুগছেন। এই পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। নতুন সরকার শুরু থেকেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করছে। নিত্যনতুন ঘোষণাও হচ্ছে। কিন্তু যেকোনো কাজেরই সুষ্ঠু রূপায়ণের জন্য পুরসভা ও পঞ্চায়েতগুলির সচল অংশগ্রহণ এবং সমন্বয় ও সহযোগিতার দরকার। উপর থেকে চাপিয়ে দিলে সব কাজ হয়ে যাবে না। এই সমস্যায় দ্রুত সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে সরকারকে। না হলে সব উদ্যোগই প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়বে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ