Bartaman Logo
৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গুন্ডাদমন যেন বিরোধী খতমের রূপ না নেয়

গুন্ডাদমনের নতুন আইন নিয়ে আলোচনা চলছে। বিরোধী দমনের শঙ্কা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনের পদক্ষেপ কি কার্যকর হবে? বিস্তারিত পড়ুন।

গুন্ডাদমন যেন বিরোধী খতমের রূপ না নেয়
  • ৫ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: দু’মাস ধরে যাঁরা ডিম ছুড়ছেন সেই মহামান্যরা গুন্ডা না সমাজ সংস্কারক, নাকি ৪ মে’র পরের নব্য বিজেপি, তার মীমাংসা এখনও হয়নি। এর সঙ্গে দুর্নীতিদমন কিংবা সোনার বাংলার পত্তনের কোনো সম্পর্ক আছে বলেও মনে হয় না। যাঁরা সেটিং করছেন তাঁদের দিকে ডিম ছোড়া বন্ধ, পুলিশও নির্বিকার। এমপি হলে দিল্লিতে বিজেপি নেতার বাড়িতে চা জলখাবারও জুটছে। এত সহজে ভালো তৃণমূল সাজা যায় ভোট দেওয়ার সময় জনগণ জানত? সমাজবিরোধীদের কঠোর শাস্তি হোক, নাগরিক সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হোক সবাই মনেপ্রাণে চায়। যাঁরা সকাল-সন্ধ্যা কাটমানি খেয়েছেন, বান্ধবীর বাড়িতে কেজি কেজি সোনাদানা, খাটের তলায় টাকা গচ্ছিত রেখে ফুলেফেঁপে উঠেছেন, নদীর চর বুজিয়ে সম্পত্তি বাড়িয়েছেন, কাফে খুলেছেন, সরকার পরিচালনায় গোরু বালি পাচারকেই ধ্যানজ্ঞান করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা হোক।  টাকা দিয়ে তাঁরা যেন ভালো তৃণমূল হতে না পারে।  

Advertisement

একইসঙ্গে এও সত্যি, মতবিরোধ থাকলেও আদালতে বিচারের আগে কাউকে কোমরে দড়ি বেঁধে প্রকাশ্যে ঘোরানো কিংবা তিনতলার জানলায় দাঁড়ানো কোনো মহিলা এমপিকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া সমর্থনযোগ্য নয়। ভোট রাজনীতিতে জয় পরাজয় ঘুরে ঘুরে আসে যায়। যাঁরা যায়, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকবেই। আইন মেনে বিচার হোক। মনে রাখতে হবে, গতকালের বিরোধীই আজকের শাসক। কিন্তু পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সামনে তিনতলার জানলা তাক করে পরপর ছুটে আসছে ঢিল আর ডিম! সবাই নির্বিকার। চোখেমুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে এমপি সাহেবা তা ভিডিয়ো করছেন ‘দু’পয়সার মিডিয়া’য় ছড়িয়ে দিতে! দৃশ্যটা বাংলার সংস্কৃতির পক্ষে মোটেই সুখকর নয়। আক্রোশ যতই তীব্র হোক, পরিবর্তনের বাংলায় এটা খুব ভালো বিজ্ঞাপনও হতে পারে না। স্বীকার করতেই হবে ডিম ছোড়াও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রাজ্য বিজেপি সভাপতি বারবার অসন্তোষ প্রকাশের পরও পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করছে না কেন? এই পরিবেশ ‘ভয় ইন আর ভরসা আউট’কেই প্রতিষ্ঠিত করছে না কি? অভিযুক্তেরও মানবাধিকার আছে। সেই অধিকার আদালত ও আইন স্বীকৃত। মেটাল ডিটেক্টর যে ডিম ডিটেক্ট করতে পারবে না সবার জানা। তাই বলে ভোটের ফল বেরনোর দু’মাস পরও নিরন্তর এই সস্তা নাটক চলবে দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, বেকারি, সামাজিক বঞ্চনা সহ জীবন ও জীবিকার জ্বলন্ত সমস্যাগুলিকে পিছনে ফেলে! ফল বেরনোর পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এক-দু’সপ্তাহ চললেও এখন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। অবিলম্বে মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর প্রশাসনের উচিত ‘ডিম ট্রায়াল’ বন্ধ করা।
বাংলার নয়া মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর তৎপরতায় রাজ্যে কড়া আইন এসেছে গুন্ডাদমনে। শপথের ঠিক ৫০ দিন পর পাশ হওয়া এই আইন বলে সন্দেহ হলেই যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবে পুলিশ। বিনা বিচারে একবছর গারদে পুরে রাখা যাবে বড়ো ঝামেলা ছাড়াই। নয়া আইন বলে যেকোনো জায়গায় তল্লাশি চালাতেও বাধা থাকবে না। অর্থাৎ সন্দেহের বশে অপরাধ সংগঠিত হওয়ার আগেই যেকোনো ব্যক্তি বিনা বিচারে একবছরের সাজা ভোগ করতে বাধ্য থাকবেন। একথা ঠিক, কোনো অঙ্গরাজ্যে সমাজবিরোধী দমন নির্বাচিত সরকারের অবশ্যকর্তব্য। সীমান্তবর্তী রাজ্য হওয়ার সুবাদে বাংলায় অনুপ্রবেশ সমস্যা নিয়ন্ত্রণের মতোই সমাজবিরোধীদেরও সবক শেখানো জরুরি। কিন্তু গুন্ডাদমনের নামে যেন বিরোধীদমনের কুনাট্য মঞ্চস্থ না-হয়! নয়া আইনে শঙ্কা সেটাই। যোগীরাজ্য উত্তরপ্রদেশ এবং মোদি-শাহের গুজরাতে আগেই এই কঠোর আইন কার্যকর হয়েছে। এবার বাংলা। 
স্রেফ সন্দেহের বশে ঢালাও গ্রেপ্তারির পিঠোপিঠি কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সংসদের আগামী অধিবেশনেই আর একটি আইন আনছে। ওই আইন কার্যকর হলে গুরুতর অপরাধে একমাস জেলে থাকলেই হারাতে হবে মন্ত্রীর পদ। রেহাই পাবেন না দেশের প্রধানমন্ত্রী বা কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও। এ তো বিরোধীশাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ। এমনিতে গ্রেপ্তারিতে প্রশাসনকে খোলাছুট, অন্যদিকে এক মাস জেলে কাটালেই পদচ্যুত! দেশে অবিজেপিশাসিত রাজ্যের সংখ্যা দ্রুত কমছে। নতুন আইন এলে প্রমাদ গুনবেন নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীরাই। গত বছরই এই সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিলটি সংসদে পেশ করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সেই বিলই বাদল অধিবেশনে পাশ হতে পারে বলে খবর। জানা গিয়েছে, ১৭ জুলাই এই বিলের রিপোর্ট গ্রহণ করতে চলেছে যৌথ সংসদীয় কমিটি। তারপরই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন। ওই বিল আইন হলেই বৃত্ত সম্পূর্ণ হবে। সন্দেহ হলেই যে-কেউ গ্রেপ্তার, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত। একমাস গারদে কাটালেই মুখ্যমন্ত্রী পদ খারিজ। সব মিলিয়ে বিরোধী দমনে বিজেপির সোনায় সোহাগা, অপারেশন লোটাসের স্বর্গরাষ্ট্র!
মূল বিলটির পাশাপাশি ১৯৭২ সালের ‘পশ্চিমবঙ্গ জনশৃঙ্খলা রক্ষা আইন’ সংশোধন করতে আরও একটি বিল গত ২৯ জুন পেশ করা হয়। সংশোধনের পর এই আইনটি ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল, ২০২৬’ নামে পরিচিত। রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়ার কথা স্পষ্ট করেছেন। বিলটি প্রসঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, গুন্ডাদের সম্পূর্ণ দমন করা হবে। শুধু জেলে পোরা নয়, অপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার উপরই নজর। ঋষি অরবিন্দ, ডঃ শ্যামাপ্রসাদের রাজ্যে দেশবিরোধী বা সমাজবিরোধী কার্যকলাপ বরদাস্ত করা হবে না। পুলিশ সুপার বা তাঁর উপরের পদমর্যাদার আধিকারিকের রিপোর্টের ভিত্তিতে রাজ্য সরকার এই আটকের নির্দেশ জারি করতে পারবে। কমিশনার বা ডিএম নির্দেশ দিলে তা অবিলম্বে রাজ্য পুলিশকে জানাতে হবে এবং ১৫ দিনের মধ্যে সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হবে। চিহ্নিত অপরাধী যদি ফেরার হয়ে যায়, তবে পুলিশ আদালতের দ্বারস্থ হবে। আদালত নির্দিষ্ট সময়ে হাজিরার নির্দেশ দেবে, তা অমান্য করলেই জারি হবে পরোয়ানা এবং তার ভিত্তিতেই বাজেয়াপ্ত হবে ঘরবাড়ি বা সম্পত্তি। আইন কঠোর হোক, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক, কিন্তু ভয় আইনের অপব্যবহার নিয়ে। পুলিশ, প্রশাসন কেউ ১০০ শতাংশ নিরপেক্ষ হতে পারে না। নেতানেত্রীরাও নন। এটা আমাদের আর্থ-সামাজিক কাঠামোরই সীমাবদ্ধতা। ভারতে সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার হয়েছে ৪৯৮ ধারার। মহিলাদের উপর গার্হস্থ্য হিংসা রুখতে সৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ওই আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, আইনের সুযোগ নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় পুলিশ-অভিযোগকারীর যোগসাজশে অযথা গ্রেপ্তারি এবং বিনা বিচারে দীর্ঘদিন আটকে রাখার মতো ঘটনা ঘটেছে। সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত এই আইনের ব্যবহারে শ্বশুরবাড়ির লোকজন ও স্বামীর প্রতি স্ত্রীর প্রতিহিংসার ছায়া প্রকট বলে সতর্ক করতে বাধ্য হয়েছে। ল কমিশনের রিপোর্টেও ওই কালা কানুনের অপব্যবহার নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। আইনের রক্ষক যদি ভক্ষকের ভূমিকা নেন, তা হলে প্রতিবাদ হবেই। একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে অভিযুক্তের অধিকারহরণ নিয়েও। এর প্রেক্ষিতে আইনে ৪৯৮ ধারার সংশোধনী পর্যন্ত এসেছে অবধারিতভাবে। 
শুভেন্দুবাবু যে শান্ত, নিরাপদ ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলা গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেছেন তাকে স্বাগত। এর বিরুদ্ধে গতানুগতিক সমালোচনার কোনো জায়গা নেই। কিন্তু দেশটা হল গণতান্ত্রিক ভারত। এদেশের অন্তরাত্মার সঙ্গে পরতে পরতে জড়িয়ে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, ধরনা আন্দোলন। তাই স্রেফ প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে যদি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আইনটির অপব্যবহার ঘটে তা সমর্থন করা যাবে না। বিরোধীদের জব্দ করা, বিশেষ করে একটি সম্প্রদায়কে শায়েস্তা করার লক্ষ্যে যদি আইনের ব্যবহার হয় তার ফল হবে উলটো। গুন্ডাদমনের নামে বিরোধীদমন, এই বাংলা কোনোদিন মেনে নেয়নি, নেবেও না। ইন্দিরা জমানার কালা কানুন ‘মিসা’র বিরুদ্ধেও বাংলা একসময় উত্তাল হয়। ‘মিসা’ ছিল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের শায়েস্তা করতে তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের কালা আইন। বিরোধীরা তো বটেই, সেই সঙ্গে সাংবাদিক, লেখক, চিন্তাবিদ কেউ ওই আক্রমণের হাত থেকে নিস্তার পাননি। বিবিসিতে ইন্দিরা গান্ধীর সেই সাক্ষাৎকার আবার শুনছিলাম। সাংবাদিক পল সলজম্যানকে ইন্দিরাজি বারবার বলছেন, ‘আমি যা করেছি সংবিধানের স্বার্থেই করেছি! কিছু লোককে গ্রেপ্তার করেছি মাত্র, বেআইনি কিছু করিনি।’ দুর্জনের ছলনার অভাব হয় না, আর শাসকেরও সাফাইয়ের অভাব হয় না! 
সেই ইতিহাস আজ ৫১ বছর পর শমীকবাবুদের নিশ্চয় মনে করিয়ে দিতে হবে না। শাসকের আইনকে বিদায় দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা তখনই সম্ভব যদি তা নিরপেক্ষভাবে ব্যবহৃত হয়। সংসদে এদের ভোট দরকার বলে বিচার বিবেচনা যেন বদলে না যায়। উলটোদিকে কেউ প্রতিবাদ কিংবা বেফাঁস মন্তব্য করলেই পরদিন তাঁর বাড়ি কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ঘিরে ফেলা আর যাই হোক গণতন্ত্র হতে পারে না। এমন ঘটতে থাকলে আবার পশ্চিমবঙ্গ ‘পুলিশ স্টেট’-এ পরিণত হবে। মমতার ‘পুলিশরাজ’-এর বিরুদ্ধেই কিন্তু শুভেন্দুবাবুদের প্রধান লড়াই ছিল!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ