Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে কুপোকাত বিরোধীরা

২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের পর বিরোধী দলের অনেকেই বলেছিলেন, ‘এ-তো সবে ট্রেলার, পিকচার আভি বাকি হ্যায়।’

ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে কুপোকাত বিরোধীরা
  • ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের পর বিরোধী দলের অনেকেই বলেছিলেন, ‘এ-তো সবে ট্রেলার, পিকচার আভি বাকি হ্যায়।’ প্রাথমিকের ৩২ হাজার চাকরি খাওয়াই ছিল পরবর্তী টার্গেট। দু’দফায় ৫৮ হাজার চাকরি খেয়ে যারা পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার অপেক্ষায় ছিল, ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে তাদের হয়েছে বদহজম। খোঁজ করছে ওয়াশরুমের। তাই আদালতের রায়ে হাজার হাজার পরিবার উচ্ছ্বাসে ভাসলেও বিরোধী শিবিরে নেমেছে অমাবস্যার অন্ধকার। ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি’র অস্ত্র আর কাজ করবে না। উল্টে তাদের গায়েই লেগে গেল ‘চাকরিখেকো’ তকমা। অনেকে বলছেন, ছাব্বিশের নির্বাচনের আগে এই রায় বিরোধী শিবিরের কাছে ‘শিরে সর্পাঘাতে’র শামিল।

Advertisement

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের চালু করা সামাজিক প্রকল্পে গরিব খেটেখাওয়া ও নিম্নবিত্তরা ব্যাপক খুশি। কিন্তু নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্য সভায় এরজন্য সিপিএমের সাংসদ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের দিকেই আঙুল তুলেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ‘সরকার চাকরি দিতে চায়। কিন্তু বিরোধীরা মামলা করে চাকরি আটকে দিচ্ছে।’ এই পরিস্থিতিতে ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি খারিজ হওয়ায় তৃণমূল সরকার চাপে পড়ে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু তা নিয়েও কিছু মামলা হওয়ায় সেই নিয়োগ ঘিরেও সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। 

এই পরিস্থিতিতে ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি গেলে সরকার ও রাজ্যের শাসক দল বিপাকে পড়ত। সেই কারণেই ছাব্বিশে ভোটের আগে বিজেপি, সিপিএম একযোগে চাকরি খেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। কিন্তু, কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ বিরোধীদের সেই আশায় জল ঢেলে দিয়েছে। আদালতের রায় শুধু ৩২ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার পরিবারের মুখেই হাসি ফোটায়নি, রাজ্যের শাসক দলকেও দিয়েছে স্বস্তি। পাশাপাশি এই রায় তুলে দিয়েছে বেশকিছু প্রশ্ন।

ডিভিশন বেঞ্চ বলেছে, উদ্দেশ্যহীন তদন্ত এবং তার থেকে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে আদালত কখনও চাকরি বাতিলের মতো নির্দেশ দিতে পারে না। সরকারি নিয়োগের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আদালত জোর দিতে পারে। পরিকল্পনা করে অনিয়ম হলে গোটা প্রক্রিয়া বাতিল করে দেওয়া যায়। কিন্তু, এক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থা সেই অনিয়ম 
চিহ্নিত করতে পারেনি। শুধু তদন্ত চলছে বলে পুরো নিয়োগ বাতিল করা যায় না। আদালত একথা বলে ফের একবার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল। 

রাজ্যের শাসক দল প্রথম থেকে একটা দাবিই করে আসছিল, ‘প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে বিজেপি কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোকে কাজে লাগাচ্ছে। তথ্য প্রমাণ জোগাড় না করে কেবল সন্দেহের বশে শাসক দলের নেতাদের গ্রেপ্তার করছে। বছরের পর বছর তদন্ত চলতে পারে না। দ্রুত তদন্ত শেষ করা হোক।’ আইনজীবীদের একাংশের মতে, আদালতের রায় শাসকদলের সেই অভিযোগকেই মান্যতা দিয়েছে।

রায় ঘোষণা হতেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রাক্তন বিচারপতি তথা বিজেপি সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে নিয়ে কটাক্ষের বন্যা বইছে। কারণ ২০২৩ সালে ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনিই। তাঁর সেই নির্দেশের বিরুদ্ধেই ডিভিশন বেঞ্চের এই রায়। রায়ে বলা হয়েছে, তদন্ত করা কোর্টের কাজ নয়। জনগণকে প্রতারণা করা এবং প্রমাণবিহীন দুর্নীতির মধ্যে ফারাক আছে। চাকরি বাতিলের ক্ষেত্রে দুর্নীতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। চাকরি বাতিলের রায়ের ক্ষেত্রে আদালত মামলাকারীদের আর্জি ও সওয়ালের বাইরে গিয়েছিল। কোর্ট নিজের ইচ্ছামতো যা খুশি করতে পারে না।

অনেকে বলছেন, অভিজিৎবাবু যে নিজের ইচ্ছামতো এই রায় দিয়েছিলেন, সেটাই ডিভিশন বেঞ্চ বোঝাতে চেয়েছে। আর উনি তো প্রথম থেকেই ‘ঢাকি সহ বিসর্জনে’র নেশায় মেতেছিলেন। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি হাজার হাজার শিক্ষকের চাকরি খেতে চেয়েছিলেন। আদালতের মধ্যে তিনি রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের সম্পর্কে এমন সব মন্তব্য করতেন যা আগে কোনও বিচারপতির মুখে শোনা যায়নি। অনেক বিতর্কিত কথা বলেও তিনি পার পেয়ে গিয়েছিলেন। কারণ মহামান্য আদালত এবং বিচারপতিদের প্রতি মানুষ এখনও শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু বিচারপতির পদে ইস্তফা দিয়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় এখন আর সেই আগল নেই। তাই অনেকে বলছেন, চাকরি খাওয়ার বিনিময়েই মিলেছিল বিজেপি দলের এমপি টিকিট। 

অভিজিৎবাবু যদি চাকরি শেষে আর পাঁচজন বিচারপতির মতো অবসর জীবন কাটাতেন তাহলে হয়তো তিনি বেকারদের কাছে আজীবন ‘ভগবান’ হয়েই থেকে যেতেন। কিন্তু বিচারপতির চেয়ারে বসেই রাজনীতিতে যোগদানের ছক কষায় তাঁকে এত সমালোচনা হজম করতে হচ্ছে।

আমরা সাধারণ মানুষ আইন না বুঝলেও একটা বিষয় জানি, আদালত রায় দেয় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। সেখানে আবেগের কোনও জায়গা নেই। কিন্তু ডিভিশন বেঞ্চের ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি বহাল রাখার পর অভিজিৎবাবু সংবাদমাধ্যমকে ‘জুডিশিয়াল রিয়েলিজম’এর তত্ত্ব শুনিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘জুডিশিয়াল রিয়েলিজম’ বলে একটা তত্ত্ব আছে। একজন জজ কী রায় দেবেন, তা অনেকগুলো ফ্যাক্টরের পাশাপাশি তাঁর ব্যাকগ্রাউন্ড দ্বারাও প্রভাবিত হয়। আমি নন ‘কম্প্রোমাইজিং ব্যাকগ্রাউন্ড’ থেকে এসেছি। যে রায় আমি দিয়েছি তার থেকে অন্য কিছু আমার কাছে প্রত্যাশা করা উচিত ছিল না। যাঁরা ডিভিশন বেঞ্চে রায় দিয়েছেন, তাঁরা হয়তো অতটা ‘নন কম্প্রোমাইজিং ব্যাকগ্রাউন্ড’ থেকে আসেননি। বা তাঁরা হয়তো অনেক নরম। তাই এই রায় দিয়েছেন। 

অভিজিৎবাবু ‘নন কম্প্রোমাইজিং’ বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন, সেটা তিনিই বলতে পারবেন। তবে তিনি একথা বলে বেশকিছু প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিয়েছেন। কী সেই প্রশ্ন? তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতা থেকে সরানোর উদ্দেশ্যেই বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন।’ তার মানে, বিচারপতি পদে থাকাকালীনই তাঁর 
এই ভাবনা ছিল। সেই উদ্দেশ্যেই কি তিনি ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিলের রায় দিয়েছিলেন? 

দুই, তিনি বলেছেন, ‘হিন্দি বলয় থেকে নেতা এনে বাংলায় ভোট করানো যাবে না। এখানকার মানুষের মন, মেজাজ, অভিমান দিল্লিওলারা বোঝেন না। কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি বদল করতে চায় না।’ একথা বলার পরেও বিজেপির এমপি থাকাটা কি ‘নন কম্প্রোমাইজিং’? তিন, বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের পায়ের তলায় বসে আইন শেখা অভিজিৎবাবুর বিজেপিতে যোগদান কি ‘নন কম্প্রোমাইজিং’?

নিন্দুকে বলছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই অভিজিৎবাবু বিচারের মূল লক্ষ্যকে অগ্রাহ্য করেছেন। বিচার ব্যবস্থা মনে করে, একজন নিরপরাধেরও যেন শাস্তি না হয়। কিন্তু তাঁর রায়ে হাজার হাজার যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা চাকরি হারিয়েছেন এবং হারাতে বসেছিলেন। ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে তাঁর সেই উদ্দেশ্য কিছুটা হলেও ব্যর্থ হয়েছে।

হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে সিপিএম। তাদের একটাই লক্ষ্য, যে কোনও মূল্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করা। তারজন্য ‘বামেরা ভালো ছিল, তৃণমূল খারাপ’ এমন একটা ধারণা তৈরি করতে চেয়েছে। সেই উদ্দেশ্যেই বারবার ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি’ প্রমাণে তারা মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে। আর সেই কাজে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানুষটির নাম বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। 

২৬ হাজার চাকরি বাতিলের রায় দিয়েছেন বিচারপতিরা। কিন্তু আইনি লড়াইকে সেই উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার মূল কাণ্ডারী বিকাশরঞ্জনবাবুই। তবে চাকরি যাওয়ায় ক্ষোভের আঁচ যাতে সিপিএমে না লাগে, তারজন্য আলিমুদ্দিনের ম্যানেজাররা তাঁর কৃতিত্বকে কখনও ব্যক্তিগত বিষয়, কখনও পেশাগত ব্যাপার বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বিকাশরঞ্জনবাবুকে নিরস্ত করছেন না।

ডিভিশন বেঞ্চের নির্দেশের পর বিকাশরঞ্জনবাবু যখন এই রায়কে ‘দুর্ভাগ্যজনক এবং দুর্নীতি প্রশ্রয় পাবে’ বলে মন্তব্য করছেন তখন সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর গলায় ভিন্ন সুর। তিনি বলেছেন, ‘এই রায়ে যে শিক্ষকরা স্বস্তি পেলেন তাঁদের বড় অংশই যোগ্য’। তাতেই স্পষ্ট, সিপিএম সাপ হয়ে কামড়ে ওঝা হয়ে বিষ নামাতে চাইছে। অবশ্য এছাড়া সিপিএমের সামনে কোনও রাস্তাও নেই। একদিকে তাদের চক্ষুশূল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উৎখাতের বাসনা, অন্যদিকে ‘চাকরি খেকো’র তকমা সেঁটে যাওয়ার ভয়। এই দু’য়ের টানাপোড়েনে সিপিএম দিশেহারা। তাই আক্ষরিক অর্থেই সিপিএমের এখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ