বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: মুরারই থানার মিত্রপুর গ্রামের মিস্ত্রি পরিবারে দুর্গাপুজো হয় একদিনে। একদিনেই সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীর পুজো হয়ে বেজে ওঠে বিসর্জনের বাজনা। একদিনের জন্য মিত্রপুরের বাসিন্দারা মেতে ওঠেন আনন্দে।
বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: মুরারই থানার মিত্রপুর গ্রামের মিস্ত্রি পরিবারে দুর্গাপুজো হয় একদিনে। একদিনেই সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীর পুজো হয়ে বেজে ওঠে বিসর্জনের বাজনা। একদিনের জন্য মিত্রপুরের বাসিন্দারা মেতে ওঠেন আনন্দে।
মিস্ত্রিবাড়ির সেই পুজো এবার ৬০ বছরে পা দিল। পুজোর প্রতিষ্ঠাতা বঙ্কিমবিহারী মিস্ত্রি ছিলেন ট্রেনের হকার। দারিদ্র ছিল নিত্যসঙ্গী। শোনা যায়, একদিন মা দুর্গা নাকি তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন, আমার পুজো করলে তোর অভাব অনটন দূর হবে। কিন্তু ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ পরিবারে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা তো মুখের কথা নয়। কীভাবে পুজো হবে, টাকা আসবে কোত্থেকে, এইসব চিন্তায় পাগল হওয়ার উপক্রম বঙ্কিমবাবুর। ভাবতে ভাবতে দিন চলে যায়। অবশেষে অনেক ভাবনাচিন্তা করে অষ্টমীর দিন বাড়ির উঠোনে তিনি মায়ের ঘট স্থাপন করে পুজো শুরু করেন। ওইদিনই সপ্তমী, অষ্টমী, সন্ধি ও নবমীর পুজো হয়। সন্ধেবেলায় গ্রামের পুকুরে ঘট বিসর্জন দিয়ে আসছে বছরে মাকে আহ্বান জানান গ্রামের বাসিন্দারা। সেই থেকে বেশ কয়েক বছর ঘটপুজো করার পর শুরু হয় মায়ের মৃন্ময়ী সিংহবাহিনী মূর্তি গড়ে পুজো। তিনি হকারির আয় থেকে প্রতিদিন মা দুর্গার নামে কিছু টাকা সরিয়ে রাখতেন। বছর দশেক আগে সেই টাকায় মায়ের পাকা মন্দির হয়েছে।
তবে বঙ্কিমবাবু প্রয়াত হয়েছেন। বর্তমানে তাঁর দুই পুত্র দেবাশিস ও আশিস বাবার প্রতিষ্ঠিত এই পুজোর দায়িত্ব সামলান। দেবাশিসবাবু মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘির মণিগ্রামে অ্যাম্বুলেন্স চালান। আশিস বাড়িতেই দশকর্মার দোকান করেছেন। এক যুগ আগে মারা গিয়েছেন বঙ্কিমবাবু। তবে পুজোর নিষ্ঠা ও রীতির কোনও পরিবর্তন হয়নি। এখনও অষ্টমীর দিন মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ে পুজো হয়ে আসছে। এখানে দুর্গার সঙ্গে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী থাকে না। কারণ, অর্থাভাব। সন্ধিপুজোর সময়ে একটি ছাগ বলি দেওয়া হয়। অর্থাভাবের কারণে মায়ের অন্নভোগ হতো না। ফল ভোগ দেওয়া হতো। এখনও সেই রীতির পরিবর্তন হয়নি। আশিস বলেন, ঠিক দুর্গাপুজোর যেমন নিয়ম, তেমনই। অষ্টমীর সকালে ঢাক বাজিয়ে গ্রামের পুকুর থেকে ঘট ভরে নিয়ে আসা হয়। তারপর মন্দিরে দেবী প্রতিমার সামনে ঘট প্রতিষ্ঠা করে সপ্তমী, অষ্টমী, সন্ধিক্ষণ, নবমী এবং দশমীর পুজো হয়। পুজোর শেষে বিসর্জন দেওয়া হয় ঘট। শুধু স্থানীয়দের অনুরোধে প্রতিমা থেকে যায় দশমী পর্যন্ত। যদিও আর পুজোআচ্চা হয় না। দশমীর সন্ধ্যায় অন্যান্য প্রতিমার সঙ্গে মিস্ত্রিবাড়ির প্রতিমাকেও গ্রাম প্রদক্ষিণ করিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। অনেকেই এই ব্যতিক্রমী পুজোর কথা শুনে তা চাক্ষুষ করতে আসেন। অষ্টমীর সকালে গ্রামের বাসিন্দাদের এই পুজো ঘিরে যতটা উন্মাদনা থাকে, বিকেল ঘনিয়ে এলেই তা স্তিমিত হতে শুরু করে। কারণ শুরুর দিনই এখানে দুর্গাপুজো শেষ হয়ে যায়। যদিও বাসিন্দারা বলেন, তাতেও আনন্দ কম হয় না। -নিজস্ব চিত্র