কাঠমাণ্ডু: ঠিক এক বছর এক মাস আগে এমনই এক দুপুরবেলা বদলে গিয়েছিল বাংলাদেশের ভাগ্য! ছাত্র-যুবদের তুমুল বিক্ষোভের জেরে প্রধানমন্ত্রী পদে ইস্তফা দিয়ে ভারতে পালাতে হয়েছিল শেখ হাসিনাকে। সেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দিনটাই যেন ফিরে এল মঙ্গলবার, আরও এক প্রতিবেশী দেশে। এবার নেপাল! মাত্র দেড়দিনের ছাত্র-যুব অভ্যুত্থানে শেষপর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি। অশান্তি অবশ্য তাতে থামেনি। রাস্তায় ফেলে পেটানো হয় উপপ্রধানমন্ত্রী, বিদেশমন্ত্রী এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে। বিদ্রোহী ছাত্র-যুবরা হাতে অত্যাধুনিক ইনসাস, একে ৪৭ রাইফেল হাতে টহল দিতে থাকে গোটা কাঠমাণ্ডুতে। একের পর এক নেতা-মন্ত্রীর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় উন্মত্ত জনতা। রেহাই পায়নি সংবাদমাধ্যমের অফিস, কমিউনিস্ট পার্টির দপ্তরও। কাঠমাণ্ডুর ডাল্লু এলাকায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ঝালানাথ খানালের বাড়িও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বাড়িতে আটকে পড়েন তাঁর স্ত্রী রাজলক্ষ্মী চিত্রকর। ঝলসে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
দুর্নীতি আর সোশ্যাল মিডিয়ায় নিষেধাজ্ঞা চাপানোর প্রতিবাদে সোমবার থেকেই জ্বলছিল গোটা নেপাল। পুলিসের গুলিতে মৃত্যু হয়েছিল ২১ জনের। প্রবল বিক্ষোভের চাপে রাতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে ওলি সরকার। কিন্তু তাতে যুবসমাজের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। মঙ্গলবার ভোরের আলো ফুটতেই কাঠমাণ্ডুর রাস্তার দখল নেয় ‘জেন জেড’। সাত সকালে আগুন লাগানো হয় ওলির বালকোটের বাড়িতে। এরপর ‘প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই’ স্লোগান দিতে দিতে ওলির সরকারি দপ্তরে ঢুকে পড়ে কয়েকশো মানুষ। জনতার ক্ষোভ আঁচ করে ইস্তফা দিতে শুরু করেন একের পর এক মন্ত্রী। তাতেও বিক্ষোভ না থামায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ওলি। যুবসমাজ অবশ্য তারপরও স্লোগান দিতে থাকে... ‘কে পি চোর। দেশ ছোড়।’ রাস্তায় রাস্তায় পুলিশকে ঘিরে ধরে ইট ছোড়া হয়। সেনা ছিল নির্বিকার। একটি সূত্রে দাবি করা হয়েছে, কুর্সি ধরে রাখতে অনড় ছিলেন ওলি। তবে শেষপর্যন্ত সেনার চাপে তিনি নতি স্বীকার করেন। প্রেসিডেন্টকে পাঠানো পদত্যাগ পত্রে ওলি লিখেছেন, ‘দেশে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতির সাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যেই আমি ইস্তফা দিলাম।’
প্রধানমন্ত্রী ইস্তফা দিতেই তাণ্ডব শুরু হয় পার্লামেন্ট ভবনে। আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় সেখানে, এমনকী পার্শ্ববর্তী সুপ্রিম কোর্টেও। দেশের একাধিক আদালত, বিমানবন্দরে এদিন অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। বাদ যায়নি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দহলের বাসভবন, সদ্য ইস্তফা দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক এবং নেপালের টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী পৃথ্বী সুব্বা গুরুংয়ের বাসভবনও। প্রাক্তন উপপ্রধানমন্ত্রী রবি লামিছানেকে জেল ভেঙে বের করে নিয়ে যায় উত্তেজিত জনতা। বিভিন্ন সংশোধনাগার থেকে মোট ৯০০ জন বন্দির পালানোর খবর পাওয়া গিয়েছে।
দুপুরে রাস্তার বেরিয়ে প্রতিবাদীদের হাতে প্রহৃত হন উপপ্রধানমন্ত্রী তথা অর্থমন্ত্রী বিষ্ণু প্রসাদ পৌড়েল। ভাইরাল এক ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন। সেই সময় সামনে থেকে ছুটে এসে তাঁর কোমর বরাবর লাথি মারেন এক ব্যক্তি। একটি বাড়ির পাঁচিলে ছিটকে পড়েন বিষ্ণু। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা নেপালি কংগ্রেসের প্রধান শের বাহাদুর দেউবার বাড়িতেও এদিন সকালে হামলা চলে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর স্ত্রী তথা তথা নেপালের বর্তমান বিদেশমন্ত্রী আরজু রানা দেউবাকে রক্তাক্ত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে দেখা গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জনগণকে শান্তি ফেরানোর আর্জি জানিয়েছে সেনা।