সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: প্রবাদ বলে, ‘ইঁদুর চেনে না ভাগবত পুঁথি।’ একেই তিনি বৃদ্ধ। আর বৃদ্ধবয়সে বুদ্ধিভ্রম হওয়াটাই স্বাভাবিক। তার উপর সুন্দরী রমণীর প্রেমে পড়লে মাথা কি আর ঠিক থাকে! আবেগঘন হয়ে দুর্জন আত্মীয়কেই বলে দিয়েছিলেন অসম প্রেম কাহিনির কথা। ফল যা হওয়ার তাই। ঈর্ষায় হোক কিংবা স্বভাব বৈশিষ্ট্যে হোক, ‘ইঁদুর’-এর মতো বৃদ্ধের প্রেম কাহিনির পুঁথি টুকরো টুকরো করে ছড়িয়েও শান্ত হয়নি ওই আত্মীয়। রীতিমতো ব্ল্যাকমেল করে টাকাও হাতিয়ে নিয়েছে সে। পরিমাণটা নেহাৎ কম নয়। লক্ষ টাকারও বেশি। উতলা মনকে অনুশাসনে রাখতে না পেরে এখন আফশোস করছেন জামালপুরের আঝাপুরের বাসিন্দা ওই বৃদ্ধ। তাঁর কাছে টাকার চেয়েও মূল্যবান ছিল সুন্দরী বধূর প্রেম। তাঁকে হারিয়ে বিষাদে দিন কাটছে বৃদ্ধের। অবস্থাটা এখন ‘আমও গেল, ছালাও গেল’ গোছের। ঘটনাটি জানাজানি হতেই বৃদ্ধের মোবাইল নম্বর ব্লক করে দিয়েছেন রমণী।
জানা গিয়েছে, বৃদ্ধের বয়স ৬৫ বছরের কাছাকাছি। সোশ্যাল মিডিয়ার সূত্রে তাঁর সঙ্গে আলাপ ওই সুবেশা বধূর। ক্রমেই তা গড়ায় প্রেম-সম্পর্কে। বাড়ির লোকেদের লুকিয়ে ফোন, ভিডিও কল—সবই চলছিল ঠিকঠাক। গোপন প্রেম গোপনেই রাখছিলেন বৃদ্ধ। কিন্তু, এমন বয়সে এরকম এক সুন্দরীর প্রেমে পড়ার আবেগ বেশিদিন গোপন রাখতে পারেননি তিনি। প্রথমে সমবয়সী ঘনিষ্ঠদের কাছে বেশ গর্বের সঙ্গে নিজের প্রেম কাহিনি বলে বেড়াচ্ছিলেন। সেটা কোনওভাবে কানে পৌঁছয় ওই দুর্জন আত্মীয়ের। সঙ্গে সঙ্গেই তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে যায়। একদিন সন্দর্পনে বৃদ্ধের মোবাইল ঘেঁটে দেখে, সত্যিই তো বৃদ্ধ সুন্দরী এক রমণীর প্রেমে মজে! পেয়ে যান তাঁর মোবাইল নম্বরও। সেই নম্বরে ভিডিও কলেও বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে বৃদ্ধের। আচমকা বৃদ্ধকে সে একদিন জানায়, ‘তুমি তো বেশ ডুবে ডুবে জল খাচ্ছ হে। ভিডিও কলে কোন যুবতীর সঙ্গে কথা বলেছো? কিন্তু তুমি কি জানো, তোমার নামে বর্ধমান আদালতে মামলা হয়েছে।’ কথাটা শুনেই ঘাবড়ে যান বৃদ্ধ। রাতের ঘুম উড়ে যায়। পর দিন তিনি দেখেন বাড়িতে একটি খামবন্দি কাগজ এসেছে। তাতে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের সিল এবং স্বাক্ষর। বর্ধমান আদালতে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে। এক লহমায় প্রেম উধাও। বৃদ্ধ এবার দ্বারস্থ হন ওই আত্মীয়ের। কাঁচুমাঁচু হয়ে বলেন,‘আমাকে বাঁচাও ভাই। পুলিস ধরে নিয়ে গেলে মান সম্মান যাবে। আমার পরিবার রয়েছে।’ ঠিক এটাই চেয়েছিল ওই আত্মীয়। অভয় দিয়ে সে বৃদ্ধকে বলে, ‘একদম চিন্তা নয়। আমার জানা ভালো আইনজীবী রয়েছেন। তিনি সব মিটিয়ে দেবেন। কেউ কিছু জানতেও পারবে না। তবে, হ্যাঁ ফিজ লাগবে।’ বৃদ্ধ রাজি হয়ে যান। তাঁকে নিয়ে আসা হয় বর্ধমানে। দু’জনে ওঠেন এক ব্যক্তির বাড়িতে। তাকে উকিল বলে পরিচয় করিয়ে দেয় ওই আত্মীয়। শলা পরামর্শ করার পর ২৫ হাজার টাকা নিয়ে নেয় ওই ব্যক্তি। সঙ্গে ভোটার, আধার কার্ডের জেরক্স। একটি সাদা কাগজে বৃদ্ধের সইও করিয়ে নেয় তারা। এভাবে ধাপে ধাপে বৃদ্ধের কাছ থেকে লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেয় ওই আত্মীয়।
কিছুদিন পর বৃদ্ধ টের পান, তিনি প্রতারিত। কারণ, ওই আত্মীয় ম্যাজিস্ট্রেটের সই ও স্ট্যাম্প নকল করে চিঠি পাঠিয়েছিল। উকিলও সাজানো। পুরো বিষয়টি জানিয়ে মহকুমা শাসকের দপ্তরে অভিযোগ করেন তিনি। মহকুমাশাসক তীর্থঙ্কর বিশ্বাস বলেন, ‘সই এবং সিল নকল করা সম্পূর্ণ বেআইনি। উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ ইতিমধ্যেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু প্রেম হারিয়ে তার চেয়েও বেশি শাস্তি পাচ্ছেন বৃদ্ধ।