Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

কলকাতায় নরবলি

ঘন শুনসান জঙ্গল। অমাবস্যার নিকষ কালো অন্ধকার। স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে শিয়ালের ডাক... হিংস্র জন্তুদের গর্জনও। দূরে টিমটিম করে জ্বলছে কয়েকটা মশাল। লালচে আগুনের শিখায় অস্পষ্ট দেবীমুখ।

কলকাতায় নরবলি
  • ১৯ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অলকাভ নিয়োগী

Advertisement

‘আঁং হ্রীং ফট্‌’........!
• ঘন শুনসান জঙ্গল। অমাবস্যার নিকষ কালো অন্ধকার। স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে শিয়ালের ডাক... হিংস্র জন্তুদের গর্জনও। দূরে টিমটিম করে জ্বলছে কয়েকটা মশাল। লালচে আগুনের শিখায় অস্পষ্ট দেবীমুখ। সামনে সিঁদুরমাখা বড় হাঁড়িকাঠ। হাঁটু মুড়িয়ে বসে এক জলজ্যান্ত তরুণ। পূর্বদিকে তাঁর মুখ। শরীরে পুরু করে মাখানো চন্দন। গলায় ফুলমালা। পাশেই উত্তর দিশায় মুখ করে মন্ত্র পড়ছেন সাধক। বলির জন্য প্রস্তুত সকলে! দেবীর পুজো শেষ। এবার খড়্গকে মন্ত্র দ্বারা আহ্বান করছেন সাধক। ততক্ষণে সুদর্শন পুরুষটির মাথা গলানো হয়েছে হাঁড়িকাঠে। ‘আঁং হ্রীং ফট্‌’ মন্ত্র শেষ হওয়ার মুহূর্তেই শিরশ্ছেদ! ফিনকি দিয়ে রক্ত। মাটিতে গড়িয়ে গেল নরমুণ্ড!
১৭৭৮ সাল। কলকাতার চিৎপুর রোডের চিত্তেশ্বরী মন্দির। পরদিন সাতসকালেই নরবলির প্রমাণ পেলেন এলাকার মানুষ। দেখলেন, মন্দিরের বাইরের চাপ চাপ রক্ত। পড়ে আছে যুবকের মুণ্ডহীন দেহ! আর রুধিরাক্ত নরমুণ্ড রাখা দেবীর পদতলে। খবর পৌঁছল ব্রিটিশদের কানেও। ‘হিউম্যান স্যাক্রিফাইস’। কলকাতায় ফের নরবলি!
মাত্র আড়াইশো বছর আগের ঘটনা। আজকের মহানগরী তখন একেবারে অচেনা এক জনপদ। চতুর্দিকে ঘন জঙ্গল, হিংস্র বাঘেদের ডেরা! রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন নগ্ন ফকির। গঙ্গার পাড়ে প্রকাশ্যেই মৃতদেহের মাংস খাচ্ছেন অঘোরীরা। প্রায়ই ঢাক, কাঁসর, ঘণ্টা বাজিয়ে সদ্য বিধবা রমণীকে তোলা হচ্ছে জ্বলন্ত চিতায়। অমাবস্যার রাত কিংবা পূর্ণিমা, যখন তখন ঘটে যাচ্ছে নরবলি। কখনও সাধক বলি দিচ্ছেন মোক্ষলাভের আশায়। কখনও ডাকাতরা ‘মা’কে নরমুণ্ড ভেট চড়িয়ে চলেছে ডাকাতিতে।
কলকাতার কাশীপুর এলাকা। চিৎপুর রোডের অদূরে ৯ নম্বর খগেন্দ্র চ্যাটার্জী রোড। শ্রী শ্রী জয়চণ্ডী চিত্তেশ্বরী মন্দির। চিৎপুরের আদি চিরপ্রসিদ্ধ চিত্তেশ্বরী দেবী দুর্গা। চিত্তেশ্বর বা চিতে ডাকাতের আরাধ্যা দেবী। আজও তিনি সেখানে বিরাজমান। ফাঁকা মন্দিরে ঢুকলে গা ছমছম করে ওঠে অনেকের। এখনও রয়েছে সেই পঞ্চমুণ্ড আসন। সামনে তন্ত্র পেঁচা। জীবিত এই পক্ষী তন্ত্রবলেই নাকি পাথর হয়ে আছে। সিঁদুর মাখিয়ে রাখা মানুষের মাথার পুরোনো খুলিও! মন্দিরের ভিতর দেবীর অপরূপ দারুবিগ্রহ। প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন। চিত্তেশ্বরী হলেন দশভুজা। অসুরদলনী। বাহন সিংহ হলেও তা ঘোটকাকৃতি। অসুরও রয়েছেন। পাশে রয়েছে একটি ছোট্ট বাঘ মূর্তি। মন্দিরে আছেন গঙ্গেশ্বর, পদ্মকুঁড়ি আকৃতির মস্ত শিবলিঙ্গ। কলকাতা সহ বাংলায় ডাকাতদের প্রতিষ্ঠিত কালী মন্দিরের সংখ্যা অনেক। রয়েছে হাড়হিম করা নরবলির কাহিনিও। কিন্ত, ডাকাতদের প্রতিষ্ঠিত দেবী দুর্গা কার্যত বিরল।
মন্দিরের বর্তমান সেবায়েত কাশীশ্বর রায়চৌধুরীর মুখে শোনা গল্প আজও নিয়ে যায় সেই পুরোনো কলকাতায়। বর্তমান চিৎপুর রোড তখন আঁকাবাঁকা সরু জঙ্গলের পথ। ঘুরে বেড়াচ্ছে বাঘ সহ নানা হিংস্র জন্তু। দিনের বেলাতেও বহু জায়গায় সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। ঝিঁ ঝিঁ পোকার অবিরত ডাক। সাধু, সন্ন্যাসী, কাপালিক, সাধক, ধর্মপ্রাণ মানুষ চিত্তেশ্বরী দর্শন করছেন। তারপর হেঁটে চৌরঙ্গী হয়ে যাচ্ছেন কালীক্ষেত্র কালীঘাটে। চিৎপুরের জঙ্গলেই ডেরা চিতে ডাকাতের। একদিন দেবী স্বপ্নাদেশ দিলেন তাঁকে, ‘আমি জঙ্গলের পাশে বহতি গঙ্গা দিয়ে ভেসে আসছি। আমায় তুই প্রতিষ্ঠা কর!’ ঘুম ভাঙতেই সদলবলে চিতে দৌড়লেন কাশীপুরের গঙ্গার পাড়ে। দেখলেন একটি বড় নিমকাঠ ভেসে ভেসে আসছে। সেই কাঠ তুলে এনে তৈরি হল দেবী দুর্গার বিগ্রহ। মা চিত্তেশ্বরী। পাঁচ শতাব্দী পরেও অক্ষত সেই বিগ্রহ। মাঝে মাঝে কেবল অঙ্গরাগ হয়। পড়ে রঙের প্রলেপ।
চিতের নাম শুনলেই সেকালে কেঁপে উঠতেন সকলে। দুঃসাহসী ডাকাত। বিশাল চেহারা। ‘চিতে আসছে’—আগাম চিঠি পাঠিয়ে ডাকাতি করতে যেতেন তিনি। প্রতি অমাবস্যাতেই নরবলি দিতেন!  তাঁর মৃত্যুর পর মা চিত্তেশ্বরী জঙ্গলে পড়েছিলে অবহেলায়। একদিন স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেখান থেকে মাকে উদ্ধার করলেন নৃসিংহ ব্রহ্মচারী নামে এক সন্ন্যাসী। ১৫৮৬ সাল। ফের শুরু হল দেবীর পুজো। ১৬৯০ সালে জমিদার মনোহর ঘোষের সহায়তায় তৈরি হয় মন্দির। চিতে ডাকাতের মৃত্যুর প্রায় ২০০ বছর পরেও এই মন্দিরে বলির প্রমাণ মিলেছে। ‘এ ভিউ অব দ্য হিস্ট্রি, লিটারেচার অ্যান্ড রিলিজিয়ন অব হিন্দুস’ বইয়ে ডব্লু ওয়ার্ড বলেছেন, ১৭৭৮ সালে চিৎপুরের চিত্তেশ্বরী মূর্তির কাছে কাছে একটি মুণ্ডহীন দেহ পাওয়া গিয়েছিল। যাঁরা দেখেছিলেন, তাঁদের অনুমান, আগের রাতে দেবীর উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছিল তাঁকে! শুধু একটি ঘটনাই নয়, রেভারেন্ড লঙ সাহেবের বর্ণনাতেও এই মন্দিরে সর্বাধিক নরবলির কথা বলা হয়েছে।
১৮৩২ সাল। আদিগঙ্গার পাড়ে কালীঘাট মন্দিরে নরবলি নিয়ে একবার হইচই পড়ে গেল। ‘ক্যালকাটা অ্যান্ড ইটস নেইবার’ বইয়ে রেভারেন্ড জেমস লঙ সেই ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। ক্ষৌরকর্মের জন্য এক নাপিতকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল মন্দিরে। তিনি এসে সেই কাজ করছিলেন। হঠাৎ মায়ের সামনে ছাগল বলি দিতে তাঁর সাহায্য চাওয়া হয়। কী সাহায্য? তিনি যেন ছাগলটি ধরে থাকেন। নাপিত তা করেওছিলেন। কিন্তু, বলিদাতা ছাগলের পরিবর্তে ধারালো খড়্গের কোপ বসিয়ে দিলেন নাপিতের ঘাড়ে! মুহূর্তেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল মুণ্ড! ওই ঘটনায় ব্রিটিশ ভারতের নিজামত আদালত অভিযুক্তকে ফাঁসির সাজা দিয়েছিল।
ডব্লু ওয়ার্ড এবং রেভারেন্ড জেমস লঙ দু’জনেই কলকাতার কালীঘাটে নরবলির কথা উল্লেখ করেছেন। এই নরবলির ঠিক পাঁচবছর আগে কালীঘাট মন্দিরে জিহ্বাবলি নিয়েও শোরগোল পড়েছিল। আত্মবলিদান! ১৮২৭ সালের ২১ এপ্রিল ‘সমাচার দপর্ণ’ সংবাদপত্রে সেই খবরের শিরোনাম ছিল, ‘কালীস্থানে জিহ্বাবলি’। লেখা হয়, ‘শুনা গিয়াছে যে গত ৮ চৈত্র মঙ্গলবারে পশ্চিমদেশীয় এক ব্যক্তি কালীঘাটে শ্রী শ্রী কালীঠাকুরাণীর সম্মুখে আপন জিহ্বা ছুরিকাদ্বারা ছেদনপূর্ব্বক বলিদান করিল তাহাতে রক্তনির্গত হইয়া ভূমি পর্যন্ত পতিত হইল এবং সে ব্যক্তি রক্তাক্ত কলেবর হইয়া একেবারে মূর্ছাপন্ন হইল...’।
দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত হিন্দুস্তান পার্ক, গোলপার্ক, গড়িয়াহাট এলাকাও ছিল ঘনজঙ্গল। হোগলা বনের ভিতর দিয়ে সরু স্যাঁতসেঁতে রাস্তা। তা ধরেই জেলে-বাগদিরা গঙ্গায় মাছ ধরতে যেতেন। বিকেল গড়ালেই ডাকাতদের উপদ্রব। সেই ডাকাতদল আর নেই। তবে, পূর্ণদাস রোডে গেলেই চোখে পড়বে মনোহর ডাকাতের প্রতিষ্ঠিত ‘ডাকাত কালীবাড়ি’। ভিতরে কষ্টিপাথরের একফুট উচ্চতার মা কালী। এই মন্দিরেও হতো নরবলি। ঠাকুমা চপলাবালাদেবীর মুখ থেকে এক হাড়হিম করা কাহিনি শুনেছিলেন মন্দিরের বর্তমান সেবায়েত কল্লোল ভট্টাচার্য। দেবীর সামনে নরবলি তো ছিলই। মন্দিরের বাইরে ছিল মস্ত এক বটবৃক্ষ। সামনের পথ ধরে ব্যবসার কাজে যেতেন অনেকে। ডাকাতরা সেই সুযোগের অপেক্ষায় থাকত। শুধু লুটপাট নয়, বহু ব্যবসায়ীকে হত্যাও করত। তারপর দড়ি দিয়ে মৃতদেহ ঝুলিয়ে রাখা হত সেই বটগাছের ডালে!
নরবলি না হলেও কলকাতার ঠনঠনিয়া বাজারের একটি খবরও সাড়া ফেলেছিল। মন্দিরের সামনে শিয়াল, বিড়াল, বানর সহ পাঁচ জন্তুর মুণ্ডহীন দেহ। ১৮২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ‘সমাচার দপর্ণ’ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হল, ‘মোকাম কলকাতার ঠনঠনিয়ার বাজারের উত্তরে কালীবাটীর নিজ পর্ব্বে তেমাথাপথে ১৪ মাঘ রবিবার ২৬ জানুয়ারি গ্রহণ দিবসে রাত্রিকালে ১ রাঙ্গা বাছুর ও ১ বানর ও ১ কাল বিড়াল ও ১ শৃগাল ও ১ শূকর এই পাঁচ পশু কাটিয়াছে পরদিন প্রাতঃকালে সকলে দেখিল যে এই পাঁচ জন্তুর শরীরমাত্র আছে, কিন্তু মুণ্ড নাই। ইহাতে অনুমান হয় যে মুণ্ড কাটিয়া লইয়া গিয়াছে। ইহার কারণ কিছু জানা যায় নাই’।
মূলত দেবীকে তৃপ্ত করার আশাতেই নরবলির সংস্কার ছিল। সঙ্গে ঐশ্বরিক অনুগ্রহ প্রাপ্তি! মহর্ষি ‘মার্কণ্ডেয়-কথিকম্‌ কা঩লিকাপুরাণম্‌’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যথাবিধি প্রদত্ত একটি নরবলিতে দেবী সহস্র বৎসর তৃপ্তি লাভ করেন, আর তিনটি নরবলিতে লক্ষ বৎসর তৃপ্তি লাভ করেন’। এমনকি, ‘মনুষ্যমাংস দ্বারা কামাখ্যা দেবী এবং আমার ভৈরব তিন হাজার বৎসর তৃপ্তি লাভ করেন’। যাঁকে নরবলি দেওয়া হত, আগেরদিন তাঁর জন্য থাকত নিরামিষ আহার। বিভিন্ন অঙ্গে পৃথক দেবতার পুজো করা হত। বলির পর ছিন্ন মস্তকে জ্বালানো হতো প্রদীপ। মস্তকের রুধির দেবীর দক্ষিণ দিকে নিবেদন করা হত। যদি সাধক নরবলির ছিন্ন মস্তক ডান হাতে এবং বাঁহাতে রুধির পাত্র নিয়ে রাত্রিজাগরণ করেন, তাহলে তাঁর রাজা হওয়ার সুযোগ। বলির পর কাটামুণ্ড নিয়েও পাপ-পুণ্য, হানি-মৃত্যুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মস্তক ছিন্ন করার পর যদি দাঁতের কটকট শব্দ হয়, তাহলে রোগের উৎপন্ন হবে। ছিন্ন মস্তক যদি হাসে, তাহলে শত্রুর বিনাশ এবং বলিদাতার সর্ব্বদা লক্ষ্মী ও পরমায়ু বৃদ্ধি। তবে, বলির পর ছিন্ন মস্তক যদি হুংকার দেয়, তাহলে রাজ্যের হানি নিশ্চিত!’
শহর কলকাতার নরবলি এখন অতীত। নেই ঘন জঙ্গল, হিংস্র বাঘও। তবে, রয়ে গিয়েছে নরবলির ইতিহাস। সঙ্গে বহু জনশ্রুতি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ