Bartaman Logo
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

হে সখা মম হৃদয়ে রহ

ঈশ্বরকে নানা ভাবে নিজের সঙ্গে যুক্ত করা যায় যার মধ্যে সখ্য ভাবটি অনেক বেশি মনের কাছাকাছি। শ্রীকৃষ্ণকে যদি মন খুলে নিজের কথা বলা যায়, তিনি ফেরান না। লিখছেন সুচেতনা সেন।

হে সখা মম হৃদয়ে রহ
  • ১ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ঈশ্বরকে নানা ভাবে নিজের সঙ্গে যুক্ত করা যায় যার মধ্যে সখ্য ভাবটি অনেক বেশি মনের কাছাকাছি। শ্রীকৃষ্ণকে যদি মন খুলে নিজের কথা বলা যায়, তিনি ফেরান না। লিখছেন সুচেতনা সেন।

Advertisement

‘হে কৃপাময়! এখন বোধ হচ্ছে, আমি পতিপুত্র-বিহীনা; আমার বন্ধু নেই, ভ্রাতা নেই, পিতা নেই ও তুমিও আমার পক্ষে নেই।’

ভারতসম্রাজ্ঞী সব হারিয়েছেন; ঐশ্বর্য, সম্পদ, রাজ্য এমনকি সম্মানও। তিনি বনবাসী হয়ে বসে আছেন আর তাঁর সামনে তাঁর ‘সখা’, দ্বারকার নায়ক বাসুদেব কৃষ্ণ। মুকুটের ময়ূরপুচ্ছ মৃদুমন্দ বাতাসে আন্দোলিত আর সেই সঙ্গে একজনের মনও অত্যন্ত বিক্ষিপ্ত, আন্দোলিত, তিনিই ভারতসম্রাজ্ঞী দ্রৌপদী। 
বন্ধুর সংজ্ঞাকে যদি প্রাচীন মহাকাব্যের আলোকে দেখা হয়, তাহলে বন্ধুত্বের বা সখ্যের যে ক’টি বিশিষ্ট উদাহরণ উঠে আসবে, তার অন্যতম, কৃষ্ণ-দ্রৌপদীর বন্ধুত্ব। তবে তা নিয়ে আলোচনার আগে, এই সখ্যভাব নিয়ে কিছু কথা বলা আবশ্যক। 
ভক্তিরসের পাঁচটি প্রধান ভাবের মধ্যে সখ্য তৃতীয় ভাব, যার প্রাণ হল বিশ্রম্ভ অর্থাৎ ঐশ্বর্যজ্ঞানশূন্য নিগূঢ় বিশ্বাস। এই ভাবে ঈশ্বর সখা বা বন্ধু। তাঁর কাঁধে চড়া যায় আবার খেলায় হেরে গেলে তাঁর সেই কাঁধেই মাথা রেখে কাঁদা যায়। ভাগবত পুরাণে বৃন্দাবনের গোপবালকদের নেতাই যে পরব্রহ্ম, সেকথা ভেবেই শুকদেব চিন্তিত হন, উদ্ধব ঈর্ষা করেন। 
রূপ গোস্বামী তাঁর ভক্তিরসামৃতসিন্ধুতে সখাদের আবার চারভাগে ভাগ করেছেন। 
সুহৃদ (বয়সে সামান্য বড়ো, স্নেহ ও রক্ষণের ভাব মিশে থাকে), সখা (বয়সে ঈষৎ ছোটো, বিশ্বাস ও নির্ভরতার ভাব মিশে থাকে), প্রিয় সখা (সমবয়সি, নিরন্তর সঙ্গী বলা যায় পার্টনার ইন ক্রাইম তবে শুধুই ননীচুরিতে তাঁরা কৃষ্ণের সঙ্গী ছিলেন না, অন্যান্য লীলারও সাক্ষী তাঁরা), প্রিয়নর্মসখা (অন্তরঙ্গতম, কিছুটা বেস্ট ফ্রেন্ড বলা চলে)।   
বহু জন্মের কঠোর সাধনার পরেও যোগীরা যাঁর নাগাল পায় না, তাঁকে ব্রজবাসীরা লাভ করেছেন অনায়াসে। তাঁদের ভাগ্য দেখেও লোকে অবাক হয়। ভাগবতে এ কথা বারবার বলা হয়েছে। 
এখন এ তো গেল বৃন্দাবনে কৃষ্ণের সখাদের বিভাগ; এদের সঙ্গে কিন্তু অর্জুনের সখ্য মিলবে না। কেন? সে উত্তর আসবে কালের নিয়মে। তবে প্রথমে কথা বলি দ্রৌপদী-কৃষ্ণের সখ্য নিয়ে। 
যেমনটা কিছু কিছু সিরিয়ালে দেখানো হয় যে দ্রৌপদী আগে থেকেই কৃষ্ণকে চিনতেন, মহাভারত কিন্তু তেমন কিছু বলে না। মূলত কৃষ্ণের আবির্ভাবও মহাভারতে দ্রৌপদীর স্বয়ংবরে। দ্রৌপদী তারপরে পঞ্চপাণ্ডবের পরিণীতা হলেন; জীবন শুরু হল। স্পষ্টতই, হরিবংশ বা মহাভারতে রাধার অস্তিত্ব নেই। সুভদ্রা এবং কৃষ্ণের অষ্টভার্যার পরে তাঁর জীবনের ইমপর্ট্যান্ট নারী, দ্রৌপদীই। তিনি কৃষ্ণা; কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত মিল। কেউ বলবেন, হ্যাঁ তাঁরা দু’জনেই শ্যামবর্ণ, এ-ই তো মিল। না, আসল মিল অন্য কোথাও। কৃষ্ণ আর কৃষ্ণা দু’জনেই এসেছেন ধ্বংসস্বরূপ/ধ্বংসস্বরূপিণী হয়ে। ভারতভূমিতে যে ধর্মস্থাপনের কঠোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছেন কৃষ্ণ, যার জন্য কুরুক্ষেত্র, কৃষ্ণা সেই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অনুঘটক, গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক। 
স্বয়ংবরের পরে বন্ধুত্ব কীভাবে এগল সে বর্ণনা তেমন নেই আবার ঘুরিয়ে, আছেও। অর্জুন বারো বছরের ব্রহ্মচর্য শেষ করে দ্বারকায় গেলেন। সুভদ্রাকে বিয়ে করলেন; তাঁকে নিয়ে এলেন ইন্দ্রপ্রস্থে, দ্রৌপদীর একেবারে সামনে।
এবারে বরং তাঁর ভাগবতসত্তাকে দূরে সরিয়ে দেখি, দ্রৌপদীকে খুব ভালো করে স্টাডি করেছিলেন কৃষ্ণ। সুভদ্রার প্রতি তাঁর নির্দেশই ছিল তাই, সাধারণ গোপীর বেশে যাবেন আর দ্রৌপদীকে অনুরোধ করবেন, ভালোভাবে বুঝিয়ে দেবেন যে সুভদ্রা তাঁর দাসী। 
যজ্ঞাগ্নিসম্ভূতা দ্রৌপদী পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী; তাঁর চরিত্রে যে সামান্য অহংকারটুকুর প্রকাশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাওয়া যায়, ওটুকু যেন অলংকার। কৃষ্ণের এই স্টাডি থেকেই সুভদ্রার জয়; দ্রৌপদী হাসিমুখে মেনে নেন তাঁর প্রিয় স্বামীর চতুর্থ স্ত্রীকে। এরপরে কৃষ্ণ এসেছিলেন খাণ্ডবপ্রস্থে। সরাসরি অনেক কিছুই লেখা থাকে না তবে কৃষ্ণের খাণ্ডবপ্রস্থ আগমন, কৃষ্ণার্জুনের পিকনিক ইত্যাদি থেকে স্পষ্ট, দ্রৌপদীর সঙ্গে কৃষ্ণের একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তবে সেই সম্পর্কটা ঠিক কতটা গভীর? 
তাঁর উত্তর ওই বক্তব্যেই আছে। বন্ধু নেই, ভ্রাতা নেই এমনকি তুমিও নেই। আসলে আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন বিশেষ কোনো বন্ধু থাকে, যাকে আমরা আক্ষরিক অর্থেই রাজদ্বার থেকে শ্মশানে আমাদের পাশে আশা করি। মনে হয়, কেউ না থাকলেও সে পাশে থাকলে সবটা পারা যায়; মহাসমুদ্র লঙ্ঘন করা যায়, সুউচ্চ পর্বতের শৃঙ্গে উঠে বসে থাকা যায়। তার উপস্থিতিই যথেষ্ট। দ্রৌপদীর কাছে কৃষ্ণ সেইরকমই বিশেষ বন্ধু ছিলেন। এই যে ‘তুমিও নেই’, এটিই সখ্যের অধিকার। দাস্যে এ ভাষা অসম্ভব। কৃষ্ণ ক্রুদ্ধ না হয়েই তাই উত্তর দেন, ভরত বংশের মেয়েরা এভাবেই কাঁদবে সখী। 
এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় আসবেই, দ্যূতসভা। বি আর চোপড়ার মহাভারতে সবাই দেখেছেন, দ্রৌপদী কেঁদে কেঁদে ডেকেছেন কৃষ্ণকে আর তিনি চলে এসে বস্ত্র দিয়ে দ্রৌপদীকে রক্ষা করেছেন। এটি কিন্তু প্রচলিত মহাভারতে নেই। কালীপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদেও লেখা আছে ধর্ম দ্রৌপদীকে আবৃত করেন। তাহলে এই কৃষ্ণের বস্ত্র জোগানোর বিষয়টি এল কীভাবে? এ প্রসঙ্গে আর একটি গল্পও খুব প্রচলিত। শিশুপালকে বধ করতে উদ্যত কৃষ্ণের আঙুল কেটে গিয়েছিল তাঁর নিজেরই সুদর্শনে; দ্রৌপদী নিজের কাপড় জড়িয়ে দিয়েছিলেন ওই ক্ষতস্থানে। কৃষ্ণ বলেন, এই বস্ত্র একদিন আমি তোমাকে ফেরত দেব। ফলত দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময়ে তিনি ওই কাপড়েই যেন আবৃত করেন তাঁকে। তবে ‘গোবিন্দ’ বলে কৃষ্ণকে ডাকাডাকি করেছিলেন দ্রৌপদী, এই বিষয়টি রয়েছে নীলকণ্ঠের সভাপর্বে। সম্ভবত সেই থেকেই এটি পরে সিরিয়ালের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ওই কাপড় ফেরত দেওয়ার গল্পটি যতদূর ধারণা করা যায়, বনপর্বে দ্রৌপদীর ওই বক্তব্য থেকেই অনুপ্রাণিত যে, কেউ নেই আর তুমিও নেই। এখন তত্ত্বগতভাবে মহাভারতে কৃষ্ণই ধর্ম। ফলত ধর্ম কাপড়ে আবৃত করেন, এই ব্যাপারটা কৃষ্ণের দিকে চালিয়ে দেওয়া যায় অনায়াসে। 
বনপর্বে কৃষ্ণ এলেন; দ্রৌপদীর ওই অবস্থা দেখে বললেন, তিনি থাকলে দ্যূতসভার আয়োজন সম্ভবই হত না। তাছাড়াও দুর্বাসার উৎপাত আর অভিশাপের হাত থেকেও দ্রৌপদীকে রক্ষা করেন এই কৃষ্ণই। সূর্য যে অক্ষয়স্থালী দিয়েছিলেন যুধিষ্ঠিরকে, তা দিয়ে সকলের ক্ষুধা নিবৃত্ত হত। দ্রৌপদীর খাবার পরে সেই খাবার শেষ হত। দুর্বাসা খেতে আসবেন অথচ দ্রৌপদীর খাওয়া শেষ। তাহলে কী হবে? এগিয়ে এলেন কৃষ্ণ। থালার এককোণে লেগে থাকা শাক-ভাত মুখে তুলে বললেন, সবাই তৃপ্ত হোক। দুর্বাসাও স্নান করে হঠাৎ ঢেঁকুর তুলে ভাবলেন, ব্যাপারটা হল কী? তবে যেটাই হোক, যুধিষ্ঠিরের ওখানে ফেরা যাবে না। লোকটা খাবারের বন্দোবস্ত করে রাখবে আর না খেলে ব্যাপারটা বড্ড খারাপ দেখাবে; সে যে ধর্মপুত্র, যদি অভিশাপ দেয়? ভাবা যায়, যে দুর্বাসা জগৎ সংসারকে অভিশাপ দেন তিনি নিজেই যুধিষ্ঠিরকে ভয় পাচ্ছেন? আর কৃষ্ণ? তিনি সেই সময়ে দাঁড়িয়েই হয়তো আজকের ভাষায় বলেছিলেন, ‘ইয়ে ডর হমে আচ্ছা লগা’।  
রূপ গোস্বামীর বর্গীকরণে দ্রৌপদীর ভাব বৃন্দাবনের সখ্য থেকে ভিন্ন, আবার অর্জুনের থেকেও ভিন্ন। তিনি সাহায্য চান কিন্তু ক্ষমাপ্রার্থনা করেন না অর্জুনের মতো। দ্রৌপদীর এক অদ্ভুত অধিকার আছে কৃষ্ণের উপরে। তিনি জানেন কৃষ্ণ তাঁকে ফেরাবেন না যদি সেই প্রার্থনা উপযুক্ত হয়। 
সেই দিক থেকে দেখলে অর্জুনের সঙ্গে কৃষ্ণের সখ্য দ্বারকাসখ্যের সর্বোৎকৃষ্ট প্রকাশ। তিনি বিশ্বরূপ দেখে ক্ষমা চান, বলেন যে তিনি যা ধৃষ্টতা করেছেন তাঁর জন্য যেন কৃষ্ণ তাঁকে ক্ষমা করেন। আর এখানেই দ্রৌপদীর সঙ্গে তাঁর পার্থক্য। দ্রৌপদী আর অর্জুন দু’জনেই কৃষ্ণের ভাগবতসত্তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন কিন্তু অর্জুন কোথাও যেন সখ্যভাবে থেকেও তাঁকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করেন, দূর গ্রহের মানুষ মনে করেন অথচ দ্রৌপদীর কাছে তিনি কৃষ্ণার সখা কৃষ্ণ, যার কাছে নিজের দাবি রাখা যায়। তাসত্ত্বেও প্রশ্ন রয়ে যায়, কৃষ্ণের প্রিয় কে? এ জন্মের পিসতুতো-মামাতো ভাই নয়, একটি অন্য সম্পর্কেও অর্জুন-কৃষ্ণ আবদ্ধ যে কাহিনি রয়েছে মহাভারতেই। 
মহাভারত মতে বদরিকাশ্রমে নর-নারায়ণ ঋষিদ্বয় তপস্যা করতেন। সেই দুই ঋষিরই নর হলেন অর্জুন আর নারায়ণ হলেন কৃষ্ণ। সুতরাং প্রথমে একটি বিষয় স্পষ্ট করে নিতে হবে, এ সম্পর্ক জন্মজন্মান্তরের।
অর্জুনের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা নিয়ে ফুটনোটে বলা হয়েছে। কৃষ্ণ অর্জুনের কাছে কৃতজ্ঞ। গীতায় তিনি নিজেকে বৃষ্ণিশ্রেষ্ঠ বলার পরেই জানান যে পাণ্ডবদের মধ্যে অর্জুনই তাঁর বিভূতি, অর্থাৎ তাঁর সত্তার অংশ। অর্জুন কৃষ্ণকে নানাভাবে পেয়েছেন। শুরুতে সখারূপেই পেয়েছেন দ্রোণের আশ্রমে; তারপরে শ্যালকরূপে কিন্তু তাতে প্রবল হয়েছে সখ্যের ভাব, আত্মার টান। আর তারপরে তাঁকে পেয়েছেন শুভাকাঙ্ক্ষীরূপে (রাজসূয় যজ্ঞের প্রধান পরামর্শদাতা); তাই নারায়ণী সেনার বিপরীতে হাসিমুখে তিনি বরণ করে নিতে পারেন নিরস্ত্র কৃষ্ণকে নিজের সারথিরূপে। সবশেষে তাঁকে গুরুরূপে পেয়েছেন, যিনি অর্জুনের চেতনা জাগ্রত করেন। তবে সেখানেও টুইস্ট; অর্জুন বলেন আমি তোমার শরণাগত শিষ্য হই, তুমি আমাকে শাসন করো। আর কৃষ্ণ সেই প্রস্তাব কিঞ্চিৎ মডিফাই করে, ‘তুমি আমার ভক্ত ও সখা’ বলে গীতার মূল অংশে প্রবেশ করেন। তবে গীতার শেষে ওই বিশ্বরূপ অর্জুনের কাছেও সুবিশাল আর কিঞ্চিৎ ভয়েরও। তাই তিনি ক্ষমা চান, বলেন সখাকেই ফেরত চাই। আর ঠিক এখানেই দ্রৌপদী নির্ভীক এবং অর্জুন সচেতন। দু’জনের সখ্যভাবে পার্থক্য রয়ে যায়। এই বিষয়গুলিকে সামনে রাখলে বোঝা যায় তাই, অর্জুন আর কৃষ্ণের সখ্য একাধিক স্তম্ভের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। 
তবে  হ্যাঁ, কৃষ্ণ অর্জুনকে অসম্ভব ভালোবেসেছেন, স্নেহ করেছেন। তাই, রথের চাকা তুলে নিজের প্রতিজ্ঞা ভেঙে এগিয়ে যান যুদ্ধক্ষেত্রে যাতে অর্জুন নিজের ফর্মে ব্যাক করেন; তাই জয়দ্রথবধের সময়ে সূর্যকে ঢেকে দেন সুদর্শনে। 
আর সখ্যের নিঃশব্দতম রূপটি? 
যখন যুদ্ধের পরে কৃষ্ণার্জুন রথ থেকে নামলে তা ভস্ম হয়; কৃষ্ণ জানান রথ আগেই ভস্মীভূত, শুধুমাত্র তিনি ছিলেন বলেই রথ টিকে ছিল। নীরবে বলে দেন, ভগবান কীভাবে ভক্তকে রক্ষা করেন। 
তাই মুষলপর্বে কৃষ্ণকে হারিয়ে অর্জুন যেন সর্বহারা হয়ে যান। গাণ্ডীব রয়েছে অথচ সেই শক্তি নেই। এ অর্জুন যেন কুরুক্ষেত্রের অর্জুনের শব। কেন? প্রাণস্বরূপ কৃষ্ণ অনুপস্থিত। 
তবে এত যে স্নেহ ভালোবাসার কথা বললাম, কৃষ্ণ কি অর্জুনের উপরে কখনও বিরক্ত হননি? তাও আছে। 
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ। অর্জুন গীতা ভুলে গিয়েছেন। লজ্জা লজ্জা মুখে কৃষ্ণকে জানালেন। হয়তো ভেবেছিলেন, মৃদু হেসে কৃষ্ণ আবার সব বলবেন। কৃষ্ণ কিন্তু স্পষ্টতই বিরক্ত হলেন। আরে সেবারে যোগযুক্ত হয়ে বলেছি, এখন সেসব মনে আছে? আচ্ছা তুমি বলছ তাই আবারও বলে দিচ্ছি। বলা বাহুল্য এই অনুগীতা অংশটি গীতার মতো জুতসই নয়। 
অর্জুনের সখ্যভাবে শিষ্যের দাস্যভাব এসে মেশে কিন্তু তাও একটা কথা অস্বীকার করা যায় না, গীতার জ্ঞান পেয়েছিলেন এই অর্জুনই, শ্রীদাম-সুবল- সুদামা, উদ্ধব বা দ্রৌপদী নন।   
তাই দ্বারকা সখ্যের সর্বোৎকৃষ্ট প্রকাশ যদি অর্জুনকেই বলা হয়, খুব ভুল হবে না তা।  
ঈশ্বরকে নানা ভাবে নিজের সঙ্গে যুক্ত করা যায় যার মধ্যে সখ্য ভাবটি অনেক বেশি মনের কাছাকাছি। ‘ওহ মাই গড’ সিনেমায় যেভাবে পরেশ রাওয়াল বলেছিলেন, ‘ভগওয়ান মেরা দোস্ত হ্যায়’, সেটিই সত্য। সখ্যভাবে তাঁকে ডাকলে তিনি সাড়া না দিয়ে থাকতে পারেন না। ঈশ্বরকে ভয় পেয়ে তাঁকে পূজা করা যায় না; তাঁকে ডাকতে হয় ভালোবেসে। বিশেষ করে কৃষ্ণ, ঈশ্বরের সেই রূপ যাঁকে সখা ভাবা যায়, সবটা প্রাণ খুলে বলা যায়, তিনি ফেরান না। 
এই যে ব্যস্ত সময়ের ঘড়ি ছুটে চলেছে, তাকে থামিয়ে দু’দণ্ড বসে তো বলাই যায়, ‘কৃষ্ণ, প্লিজ শোনো... কৃষ্ণ, তুমি আমার সখা। আমার যা সমস্যা সেটাও তোমার, আমার সঙ্গে যা ভালো হবে সেটাও তোমার। আমিও তোমার... হে সখা মম হৃদয়ে রহ।’ 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ