জনগণের দান ছাড়া কোনও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের পক্ষে চলা সম্ভব নয়। কারণ তাদের বছরভর রাজনৈতিক আন্দোলন সংগঠিত করতে হয়। এছাড়া অংশগ্রহণ করতে হয় রকমারি নির্বাচনে। ভারতে লোকসভা, বিধানসভা থেকে স্থানীয় সরকার গঠন—প্রতিটিরই আয়োজন বস্তুত একেকটি রাজসূয় যজ্ঞ। সরকারি কোষাগারের পক্ষে এই বিপুল ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব। সংবিধান এবং দেশের আইন রাজকোষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলিকে অর্থ জোগান অনুমোদন করে না। ফলে দল চালাবার যাবতীয় খরচ পার্টিগুলিকেই জোগাড় করতে হয়। এজন্য জনগণের কাছে হাত পাতাই দস্তুর। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় দেশবাসী অকাতরে তাদের দানধ্যান করেছে। কেননা, তারা মনে করত সবরকমে স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো দেশবাসীর এক পবিত্র কর্তব্য। কিন্তু স্বাধীন ভারতে রাজনৈতিক দলগুলি মানুষের সেই শ্রদ্ধা ভালোবাসা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তার মূল কারণ ক্ষমতার রাজনীতি বেশিরভাগ পার্টিকে সীমাহীন দুর্নীতি আর দুর্বৃত্তায়নের পাঁকে নিমজ্জিত করেছে। স্বভাবতই টাকা জোগাড়ের জন্য পার্টিগুলি ধরেছে বাঁকা পথ। বলা বাহুল্য, শাসক দলের পক্ষেই এই বাঁকা পথে কামাল করা জলভাত। কেননা, ক্ষমতার উচ্চাসন জানে ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হবে না। সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করেই শাসক দলগুলি তাদের পার্টি ফান্ড ভরায়। এই ‘মহৎ কর্মে’ যে শাসক যত বেশি দড় তার পার্টি ফান্ড তত উপচে পড়ে। ইলেকশন বন্ড কেলেঙ্কারি এই চরম সত্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের পার্টি বিজেপি নির্বাচনি বন্ড মারফত কর্পোরেটদের থেকে যত টাকা পেয়েছে অন্য দলগুলি তার ধারেকাছেও নেই!
একই মানের অন্য এক চিত্র সামনে এল এবার। ২০২৩ সালের ঘটনা। ৪ জুন বিহারের ভাগলপুর জেলায় নমামি গঙ্গে ঘাটের কাছেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছিল আগুয়ানি-সুলতানগঞ্জ নির্মীয়মাণ সেতু। সেদিন ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল কয়েকশো কিমি দূরে অবস্থিত অসমের গুয়াহাটিতেও। গুয়াহাটি শহরে নির্মীয়মাণ ৮.৪ কিমি দীর্ঘ একটি সেতুর ভবিষ্যৎ বুঝে নিতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল ওই রাজ্যের বিজেপি সরকার। এই আতঙ্ক ও তৎপরতার কারণ কী? বিহারে অকস্মাৎ যে সেতুটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে সেটিরও নির্মাতা সংস্থা গুয়াহাটিতে সেতু নির্মাণের বরাত পেয়েছিল। গুয়াহাটির ব্রিজ নিয়ে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সেখানকার আইআইটি প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু গুয়াহাটির বিশেষজ্ঞ দল ওই বিষয়ে তদন্ত করে কী রিপোর্ট দিয়েছিল? মানুষ জানতে স্বভাবতই কৌতূহলী আজও। কিন্তু আড়াই বছরেও সরকার সেই রিপোর্ট মানুষের সামনে আনেনি। তবে যেটা সামনে এসেছে, তা হল—ওই বিপর্যয়ের বছরে নির্মাণকারী সংস্থাটি শাসক দলকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিয়েছিল। বিজেপিকে তাদের অনুদানের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি টাকা! সম্প্রতি ‘দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভ’-এর এক অন্তর্তদন্তে এই কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়েছে। ঝুলি থেকে বেরিয়েছে আরও রকমারি বিড়াল! যেমন উত্তর-পূর্ব ভারতে এনডিএ-শাসিত তিন রাজ্যেই যেসব সংস্থা সরকারি কাজের বরাত হাতিয়েছে, তাদের অনেকেই গেরুয়া শিবিরের প্রতি ভীষণ দরাজ। তারা দু’হাত উপুড় করেই টাকা ঢেলেছে বিজেপির পার্টি ফান্ডে। ওই রাজ্যগুলি হল—অসম, অরুণাচল প্রদেশ ও ত্রিপুরা।
২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে শুধুমাত্র চেক ও ডিজিটাল ট্রান্সফারের মাধ্যমে ওই তিন রাজ্য থেকে বিজেপির দলীয় ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে’ ঢুকেছে প্রায় ৭৮ কোটি টাকা। তার মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থ এসেছে এমন সংস্থা/ব্যক্তির থেকে যারা কেন্দ্রের মোদি সরকার এবং/অথবা এনডিএ রাজ্য সরকারগুলি থেকে কাজের বরাত বা কোনও ছাড়পত্র পেয়েছে। দ্য রিপোর্টার্স কালেকটিভের রিপোর্ট অনুসারে জানানো যায় যে, অসমে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে বিজেপির তহবিলে ঢোকা অনুদানের ৫২ শতাংশের বেশি দিয়েছিল সরকারি কাজের বরাত বা রেগুলেটরি ক্লিয়ারেন্স পাওয়া ব্যক্তি/সংস্থা। তার পূর্ববর্তী বছরে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ৬৪.৪৮ শতাংশের মতো। হুবহু চিত্র অরুণাচল প্রদেশেও। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ওই রাজ্যেও ২০ হাজারের বেশি অনুদানের অর্ধেকই এসেছিল একই ধরনের ব্যক্তি এবং সংস্থাগুলির কাছ থেকে। সে-বছর ত্রিপুয়ায় বিজেপির ফান্ডে এমন অনুদান জমা হয়েছিল মোট সংগ্রহের প্রায় ৬২ শতাংশ। পূর্ববর্তী বর্ষে এই শতাংশ হার ছিল ৮৪-র ঊর্ধ্বে। এই রিপোর্টকে লঘু করে দেখার সুযোগ নেই। কারা কোন স্বার্থে এই হারে শাসকের অর্থ-ভজনা করে গেল সেই রহস্য উদ্ঘাটনে বিচারবিভাগীয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কেননা, এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার মতো গুরুতর প্রশ্নটি। বহু সরকারি প্রকল্পের নিম্নমানের পিছনে শাসককে ব্যাপক হারে উপঢৌকন বিতরণ যে বহুলাংশে দায়ী তা ‘মোদির স্বচ্ছ ভারতের’ একটি শিশুও জানে।