সৌম্যকান্তি ত্রিপাঠী, বেলদা: দাঁতনে ভাষাগত সমস্যা বিগড়ে দিচ্ছে এসআইআরের শুনানি পর্বকে। সমস্যা হচ্ছে, দু’ভাবে। এক, নথি যাচাইয়ে। দুই, শুনানিতে ডাক পাওয়া ভোটারের সঙ্গে সওয়াল জবাবে। ফলে, শুনানি শেষ করতে সময় বেশি লাগছে। কোথাও সন্ধ্যা গড়িয়ে যাচ্ছে। আবার কোথাও বেশি রাত পর্যন্ত চেয়ারে বসে থাকতে হচ্ছে অফিসারদের। দাঁতনে এমন সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে, তা সম্ভবত ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি নির্বাচন কমিশন। যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা চলছে।
দাঁতন বিধানসভার মোহনপুর ও দাঁতন ১ ব্লকের একটা বড় অংশ ওড়িশা লাগোয়া। স্বাভাবিকভাবেই এইসব এলাকার মানুষের কথাবার্তায় ওড়িয়া ভাষার টান রয়েছে। বিশেষ করে প্রবীণ মানুষরা বাংলা-ওড়িয়া মিলিয়ে বাক্য বিনিময় করেন। অফিসাররা কোনও প্রশ্ন করলে তাঁরা ওই মিলিজুলি ভাষাতেই উত্তর দিচ্ছেন। যার অর্থ আত্মস্থ করতে গিয়ে হাতড়াচ্ছেন কমিশন নিযুক্ত অফিসাররা। দেখা দিচ্ছে সময়-সঙ্কট। অন্যদিকে, ওইসব এলাকায় বহু পরিবারের ছেলে-মেয়ের বিয়ে হয়েছে পড়শি রাজ্যে। যাঁরা বধূ হিসেবে বাংলায় এসেছেন তাঁরা এখনও বাংলা ভাষায় ঠিক সেভাবে সরগড় হয়ে উঠতে পারেননি। ওড়িয়া ভাষায় কথা বলতে তাঁরা বেশি স্বচ্ছন্দ। তাঁদের নথিপত্রের চুলচেরা পর্যালোচনা করতে গিয়েও চূড়ান্ত বিড়াম্বনায় পড়তে হচ্ছে অফিসারদের। কারণ, বেশির ভাগ নথিই ওড়িয়া ভাষায় লেখা। সমস্যা সব থেকে বেশি হচ্ছে মোহনপুর ব্লকের নীলদা, তনুয়া পঞ্চায়েত এলাকায়। দাঁতন ১ ব্লকের চকইসমাইলপুর, আঙ্গুয়া পঞ্চায়েতেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, দু’টি ব্লকে বসবাসকারী বহু ভোটারের নাম ২০০২ সালের তালিকা নেই। শুনানিতে ডাক পেয়েছেন সকলেই। হাজির হয়ে অনেকেই প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে পারছেন না। আবার অনেকের নাম এখনও ওড়িশার ভোটার তালিকায় রয়েছে। তাঁরা সেখানকার কোন বুথ ও কোন অংশে ভোট দিয়েছেন, তার সঠিক তথ্য জানাতে পারছেন না। দলিল-সহ অন্যান্য পারিবারিক নথিতেও ভাষাগত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সেগুলির সমাধান করে উঠতে কালঘাম ছুটছে প্রশাসনের কর্তাদের। একজনের শুনানি শেষ করে কেটে যাচ্ছে আধঘণ্টারও বেশি।
মোহনপুর ব্লকের নীলদা ও তনুয়া পঞ্চায়েতের দোব্যাড়িয়া, নীমপুরের বাসিন্দা সোনালী পাত্র, কাকলি জানা, প্রতিমা বেরা সহ একাধিক মহিলা বলছিলেন, ‘বিবাহ সূত্রে আমরা এখন এ রাজ্যের বাসিন্দা। অনেকে আবার এখানে আসার পর ভোটার তালিকায় নাম তুলেছি। আগে কোথায় ভোট দিতাম বা পরিবার কোথায় ভোট দিত, সে সব আজ মনে নেই। নথি দিলেও প্রশাসন ভাষা বুঝতে পারছে না। আমাদের নাগরিকত্ব নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়েছি।’
ভাষাগত সমস্যার বিষয়টি কার্যত মেনে নিয়েছেন মোহনপুরের বিডিও জয়ন্ত সাহা। তিনি বলেন, ‘ভাষাগত সমস্যার জন্য শুনানিতে কিছুটা দেরি হচ্ছে। এক একজনের পেছনে ১৫-২০ মিনিট কিংবা তারও বেশি সময় চলে যাচ্ছে। আলাদা করে দোভাষী থাকলে সুবিধা হতো। বিশেষত ওড়িশা সীমানা লাগোয়া গ্রাম গুলিতে এই কারণে শুনানিতে দেরি হচ্ছে। কোনও কোনও দিন বেশ রাতও হয়ে যাচ্ছে। বেশিরভাগ নথি ওড়িয়া ভাষায় লেখা। ট্রান্সলেট বা ভাষান্তর করতে দেরি হচ্ছে। একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে দাঁতন ১ ব্লকেও।’-নিজস্ব চিত্র