Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

ডুডুমার ডাকে দেওমালি

ছোটবেলায় স্কুলপাঠ্যে পড়েছিলাম ‘ডুডুমার ডাক’। ভ্রমণপ্রেমী লেখক আশুতোষ ভট্টাচার্যের লেখা। সেই থেকেই সাধ, আমরাও ডুডুমার ডাক শুনব! এবার সেই সাধপূরণের উদ্দেশ্যেই বেরিয়ে পড়েছিলাম ওড়িশার দেওমালি।

ডুডুমার ডাকে  দেওমালি
  • ১০ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ছোটবেলায় স্কুলপাঠ্যে পড়েছিলাম ‘ডুডুমার ডাক’। ভ্রমণপ্রেমী লেখক আশুতোষ ভট্টাচার্যের লেখা। সেই থেকেই সাধ, আমরাও ডুডুমার ডাক শুনব! এবার সেই সাধপূরণের উদ্দেশ্যেই বেরিয়ে পড়েছিলাম ওড়িশার দেওমালি। তালামালি টপ পেরিয়ে গাড়ি বেশ কিছুটা এগতেই চোখে পড়ল পাহাড়টা! গোধূলির আলো মেখে কুণ্ডলী পাকানো মেঘের ধোঁয়া আর অপরূপ সবুজে সেজে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ওড়িশার সর্বোচ্চ পর্বত পূর্বঘাট পর্বতমালার শৃঙ্গ দেওমালি। চারপাশের পাহাড়, জঙ্গল সব গাঢ় সবুজ আর হলুদে মোড়া। পথ আর আকাশ মিলেমিশে গিয়েছে। সূর্যাস্তের সময় দুটোর রংই কমলাটে লাল! পাহাড়ের কোলে বোন্ডা, ভূমিয়া, মালি ইত্যাদি উপজাতির জনজীবন। পরের দু’দিন আমাদের এই এলাকাতেই ঠাঁই। যেদিকে চোখ যায় কেবল পাহাড় আর পাহাড়, সবুজ উপত্যকা, পাহাড়ের গায়ের উপর ঘন জঙ্গল, সেই ঘন বজঙ্গলের মধ্যে আদিবাসীদের বাস। 
মেঘপাহাড়ের দেশে নিরালা সময় কাটানোর ইচ্ছে আর হাতে দিন দুই-তিনের সময়। দেওমালি ঘুরে আসার জন্য মূলত এই দুটো মূলধনই যথেষ্ট। এখানকার রাস্তাঘাট, প্রতিটা বাঁক যেন খাস এক একটা ‘সাইটসিইং’! প্রকৃতিই এখানে আপনার প্রতিবেশী। দেওমালি পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ৫,৪৯৫ ফুট। এটি শুধু ওড়িশার বৃহত্তম পর্বতই নয়, পূর্বঘাট পর্বতমলার তৃতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। 
পড়ন্ত বিকেলের বাতাসে হালকা শীত। জায়গাটার নৈঃশব্দ্য যেন খান খান করে দিচ্ছে আমাদের গাড়ির আওয়াজকেও। হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে যেন উঠে এল একদল কিশোর কিশোরী। মলিন পোশাক, খালি পা, মাথার উপর বই চাপানো। তাদের গ্রামীণ পাঠশালা শেষ হয়েছে সদ্য। জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে ফিরছেন আদিবাসী রমণী। পাহাড়ের ঢালে বলেই হয়তো সূর্য ঝুপ করে নিভে গেল। আমরাও পৌঁছলাম আগাম বুকিং করে রাখা ওএফডিসি (ওড়িশা ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন)-র বাংলোয়। সেখানে অভ্যর্থনা অতুলনীয়। সন্ধে নামার পরেই শীত বাড়ছিল। পাহাড়ের ঢালে ঢালে তৈরি কটেজ। গোটা কটেজে আধুনিকতার ছোঁয়া ও দুর্দান্ত খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা দেখে মালুম হচ্ছিল, দেওমালি নিয়ে ওড়িশা সরকার বেশ সিরিয়াস! 
আরামেই রাতটুকু কাটল। ভোরের আলো ফুটতে একবার কটেজের সঙ্গে জোড়া খোলা বারান্দায় পা রাখলাম। মেঘে ঢেকে আছে চারপাশ। আলাদা করে সূর্যোদয় দেখা গেল না বলে সকলেরই মনখারাপ! ব্যাপারটা জেনে ফরেস্ট বাংলোর ম্যানেজার বললেন, কথা দিলাম, জীবনের সেরা সূর্যাস্ত দেখবেন। সেই আশায় ভর করে দিনটা সাজিয়ে ফেললাম। এদেরই ঠিক করে দেওয়া গাড়িতে এবার আমাদের বেরিয়ে পড়া। চালক নুবেন মজার মানুষ। গাড়ি চালানোর হাতখানাও চমৎকার। দেওমালি পাহাড়ের বৈশিষ্ট্যই হল উত্তরের পাহাড়গুলোর মতো অনেক বাঁক আর ভাঁজ। হু হু করে বয়ে আসা ঠান্ডা হাওয়া আর ঘন মেঘ কাটিয়ে দক্ষ হাতে স্টিয়ারিং পরিচালনা করছেন নুবেন। একটু নীচের দিকে নেমে বুঝলাম, এখানে আসা কেন সার্থক! কপালজোরে সেদিন আবার হাটবার। অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওড়িশা সীমান্তের এই হাটগুলি দেখার মতো হয়। যেন পৌঁছে গিয়েছেন প্রাচীন কোনও ভারতীয় জনপদে। আদিবাসী জীবনের নানা রঙের জিনিসপত্রের বৈচিত্র্য, স্থানীয় কফি, হ্যান্ডক্রাফটের জিনিস দেখতে দেখতে এই হাটকে একসময় ভালোবেসে ফেলবেন। 
নুবেনের তাড়ায় চটক ভাঙল। মেঘ করে হঠৎ বৃষ্টি নামলে ডুডুমায় যেতে অসুবিধা হবে। পথে পড়ল শ্রীজগন্নাথ মন্দির। নতুন রং করা হয়েছে। মন্দিরের দেওয়ালে নানা কারুকাজ ও জগন্নাথদেবের বিভিন্ন বেশের পৃথক পৃথক মূর্তি মন ভালো করে দেবে। পথে দক্ষিণী খাবারে প্রাতরাশ সেরে এবার চললাম কোলাব ড্যামের দিকে। এই কোলাব আসলে গোদাবরী নদীর একটি উপনদী। কোরাপুটের জেপুর শহরের কাছে অবস্থিত। এই ড্যামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপরূপ। পাশেই একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন আছে। প্রবেশমূল্য ১০ টাকা। নানা ফুলগাছের বাহারি রঙে গোটা ড্যামকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। ঢালু পাকদণ্ডী পথ পায়ে নেমে ড্যামের কাছে চলে আসা যায়, সেখান থেকে ড্যামের ভিউ আরও দুর্দান্ত। হঠাৎ একটা কিচকিচ আওয়াজ! পিছন ফিরতেই দেখি একপাল খরগোশ তিরতির করে এগচ্ছে ড্যামের ধার ঘেঁষে। ড্যামে কিছুটা সময়  কাটিয়ে নৌকাবিহার সেরে আমরাও এগলাম বহু প্রতীক্ষিত গন্তব্য ডুডুমার পথে! 
জলপ্রপাতের খানিক আগে গাড়ি থেমে গেল। আমরা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেলাম। দলের বয়স্করা উপরের ভিউ পয়েন্ট থেকেই ডুডুমা দেখলেন। সেখান থেকেও এই জলপ্রপাত যথেষ্ট সুন্দর ও মনোগ্রাহী। আমরা কয়েকজন সাবধানে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পাথুরে সিঁড়ি ভেঙে বেশ খানিকটা নেমে ডুডুমাকে দেখলাম। আশুতোষ লিখেছিলেন, ‘...সেই অপূর্ব দৃশ্যের সামনে বহুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। চারিদিক কুয়াশায় আচ্ছন্ন। সেই কুয়াশা শীতের কুয়াশা নয়, এই কুয়াশা এখানকার চিরন্তন কুয়াশা। জলরাশি নীচে পাথরের গায়ে আহত হয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণার সৃষ্টি করে। তাতেই এখানে প্রতি মুহূর্তেই কুয়াশার সৃষ্টি হয়।’ ডুডুমার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল সেই কোন যুগে লেখা এই কথাগুলি আজও একইরকম প্রাসঙ্গিক। ডুডুমার রূপ বদলায়নি এতটুকু! পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কথা শোনা যায় না তার তীব্র শব্দের জেরে। জনমানবহীন গা ছমছমে পথে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে যত এগচ্ছি, একটানা তীব্র জলের শব্দ ততই যেন জোরালো হয়ে উঠছে। একটা সময় অন্ধ্রপ্রদেশ-ওড়িশার সীমান্তের আদি জনজাতি বোন্ডা, গড়বাদের বসবাস ছিল এই ডুডুমার গা ঘেঁষা জঙ্গলে। পরবর্তীতে নদীবাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প শুরু হলে আদিম জনজাতিরা আরও গভীর জঙ্গলে চলে গিয়েছেন। তবে উপর থেকেই এই দৃশ্য এত মনোরম যে আলাদা করে নীচে নামার প্রয়োজন হয় না। 
ডুডুমা পেরিয়ে ৫০ কিমি দূরেই রানি ডুডুমা। এটি আলাদা জলপ্রপাত। গেট থেকে ২০ টাকার টিকিট কেটে বাঁধানো পথ বেয়ে এগিয়ে যেতেই নুবেনভাই জানালেন, আমরা এসে পড়েছি রানি ডুডুমার ডেরায়। এই জলপ্রপাতটি দেখেও মুগ্ধতা যেন শেষ হয় না! ঘন কালো মেঘের জটাজাল ছিন্ন করে যেন আচমকা বিপুল জলরাশি লম্বা বিনুনির মতো পড়ছে নাগাড়ে। অনেক উঁচুতে থাকা নন্দপুর পাহাড় এই রানি ডুডুমার উৎস। 
এবার দেওমালি হিল টপে আমাদের আস্তানায় ফেরার পালা। ততক্ষণে মেঘ চিরে আকাশে সোনালি মেঘ খেলছে। সবুজ গালিচায় মোড়া পাহাড়-জঙ্গলকে সাক্ষী রেখে আমাদের গাড়ি এগচ্ছে নরম লালমাটি কেটে। ঘণ্টা খানেক লাগল দেওমালি ফিরতে। গাড়ি রিসর্টের সামনে অবধি যায়। সেখান থেকে পাহাড়ি পথে কিছুটা ট্রেক করে উঠতে পারেন একেবারে চূড়ায়! সেখানে কিছুটা সময় কাটিয়ে ধীর পায়ে নেমে এলাম রিসর্টে। চারদিক খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সত্যিই দেখলাম জীবনের সেরা সূর্যাস্ত! 
লাল সিঁদুর আর কমলা আলোয় মাখা গোটা দেওমালি গ্রাম তখন স্বর্গের মেহফিলে আসা একটুকরো রক্তপ্রবাল! যার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ভালোবেসেই তখন চোখ নামিয়ে নিতে হয়।

Advertisement

কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে একটিই ট্রেন রয়েছে। নাম সম্বলেশ্বরী এক্সপ্রেস। ২১ ঘণ্টায় পোঁছে দেবে কোরাপুট। সেখান থেকে ভাড়া গাড়িতে চলে যান দেওমালি। বনদপ্তরের বাংলোয় থাকলে তাঁরাও পিক আপের ব্যবস্থা করেন। বিমানপথে বিশাখাপত্তনম হয়ে ওখান থেকে টানা গাড়িতেও পৌঁছে যেতে পারেন দেওমালি।


মনীষা মুখোপাধ্যায় 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ