Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভরসা নয় ভয় ইন

রাজনীতির কারবারিদের কাছে ভোট ছাড়া আছে কী? তাই পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামের উপর পড়লেও ভারতে পেট্রল-ডিজেলের দর ওঠানামা করেনি।

ভরসা নয় ভয় ইন
  • ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাজনীতির কারবারিদের কাছে ভোট ছাড়া আছে কী? তাই পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামের উপর পড়লেও ভারতে পেট্রল-ডিজেলের দর ওঠানামা করেনি। কেবলমাত্র রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছে একদফা। তাতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে ব্যাপক গণক্ষোভের আঁচ। পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচ জায়গায় বিধানসভা নির্বাচন তখন শিয়রে। এমন সময়ে ঝুঁকি নেওয়ার দুঃসাহস দেখায়নি কেন্দ্রীয় সরকার, থুড়ি, বিজেপি। ‘মালিককে’ বাঁচাবার দায় আছে তেল কোম্পানিগুলিরও। অনুমান করা শক্ত নয় যে, এই ‘নৈতিক’ চেতনা থেকেই রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়াতে পারছে না। ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রলিয়াম এবং হিন্দুস্তান পেট্রলিয়াম দামবৃদ্ধি থামিয়ে রেখেছে বিপুল লোকসান সত্ত্বেও। সূত্রের খবর, তিন সংস্থারই ক্ষতির বহর পৌঁছে গিয়েছে দৈনিক দেড় হাজার কোটি টাকায়! চলতি দামে পেট্রল বেচে প্রতি লিটারে তাদের লোকসান হচ্ছে ১৮ টাকা। অঙ্কটা ডিজেলের ক্ষেত্রে আরো বেশি—৩৫ টাকা। এই পরিসংখ্যানে একটাই ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে যে, পাহাড়প্রমাণ এই ক্ষতির বোঝা তেল কোম্পানিগুলি বেশিদিন বইতে পারবে না। স্রেফ নির্বাচন মিটে যাওয়ার জন্য দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করছে তারা। মনিবকে বাঁচাতে এছাড়া তাদের উপায়ও নেই। বাণিজ্য মহলের অনুমান, দেশের পাঁচ জায়গায় বিধানসভা ভোট মেটার পরই পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়ানো হবে, বৃদ্ধির পরিমাণটা যে বেশ চড়াই হবে, এই আশঙ্কাও বদ্ধমূল হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সকলের। এর সহজ কারণ লোকসানের ক্রমপুঞ্জিত বহর। লোকসানের বোঝা ঘাড় থেকে পুরো না নামানো পর্যন্ত কোম্পানিগুলির মুক্তি হবে কী করে? 

Advertisement

আর কিছুদিন বাদেই পেট্রল-ডিজেলের দামবৃদ্ধির জল্পনাটি উসকে দিয়েছে বিখ্যাত অ্যাসেট ম্যানেজিং সংস্থা ম্যাককুয়ারি গ্রুপের একটি রিপোর্ট। পেট্রল ও ডিজেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজার দরের উপর ছেড়ে দিয়েছে মোদি সরকার। এই নীতিগ্রহণের দশক পেরিয়ে গিয়েছে। তবে ভোটের দামামা বেজে গেলে এই নিয়মে লাগামও পড়ে। বাজারে তোলপাড় পড়লেও ভোটের সময় পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়ে না। এবার পাঁচটি বিধানসভার ভোটের আগেও তার অন্যথা হয়নি। তেল কোম্পানিগুলির কিল খেয়ে কিল হজম করার অবস্থা। ইতিমধ্যেই অসম, কেরল ও কেন্দ্রশাসিত পুদুচেরিতে ভোট নেওয়া হয়ে গিয়েছে। সামনেই ভোটগ্রহণ তামিলনাড়ু এবং বাংলায়। এই দুই রাজ্যেই কঠিন লড়াই বিজেপির। প্রতিপক্ষ যথাক্রমে এম কে স্ট্যালিন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই অন্তত খনিজ তেলের দাম নিয়ে মোদি সরকার এখনই এমন কোনো পদক্ষেপ করতে রাজি নয়, যাতে জনগণেশ বিমুখ হয়ে যান। তবে ম্যাককুয়ারি গ্রুপ জানিয়েছে, ‘ভোটপর্ব মিটে গেলে এপ্রিলে পেট্রল ও ডিজেলের খুচরো দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা করছি।’ 
গত দু-তিন বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম ওঠানামা করেছে বিস্তর। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে অশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার পেরিয়ে যায়। এরপর তা কমতে কমতে নেমে আসে ৭০ ডলারে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধপরিস্থিতিতে, গতমাসে অশোধিত তেলের দাম একসময় ১২০ ডলারও পেরিয়ে গিয়েছিল! মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংঘর্ষ বিরতি ঘোষণা এবং শান্তি আলোচনা শুরুর পর হরমুজ প্রণালী খোলার আশায় আবার তা কমে ৯২ ডলারে পৌঁছায়। কিন্তু আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তথ্যাভিজ্ঞ মহলের মতে, অশোধিত তেলের দামবৃদ্ধি এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। এর আগেও এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। ভোটের বাজার ধরে রাখতে দুবার অন্তঃশুল্ক কমিয়ে পরিস্থিতি সামলেছেন মোদিবাবু। গতমাসেও প্রতি লিটারে ১০ টাকা অন্তঃশুল্ক কমিয়েছে কেন্দ্র। সেন্ট্রাল লেভিও নিম্নমুখী। একটি সূত্র জানাচ্ছে, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ইরান যুদ্ধের কারণে সংকট বাড়বে ধরে নিয়ে, মার্চ মাসে দেশজুড়ে পেট্রল-ডিজেল কেনার ধুম পড়ে গিয়েছিল। তাতে তিন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার দৈনিক লোকসানের বহর দাঁড়িয়েছিল ২,৪০০ কোটি টাকা। এই সমস্যা ছিল টানা বেশ কয়েকদিন। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও লোকসান পুরো শূন্যে নামেনি, দৈনিক লোকসানের পরিমাণ এখনো ১,৬০০ কোটি টাকা। তাই আচ্ছে দিনের ফেরিওয়ালা যতই ‘ভয় আউট ভরসা ইন’ স্লোগান দিন না কেন, মানুষ পদ্মপার্টির উপর মোটেই ভরসা রাখতে পারছেন না। বাংলা তথা সারা ভারতের মানুষের পদে পদে ভয়ের কারণ বিজেপি। ভয় তাড়াবার যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার বাংলার মানুষ আগামী ২৩ ও ২৯ তারিখ সেটা নিতে ভুল করবে না বলেই আশা করা যায়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ