সংবাদদাতা, রামপুরহাট: কোটাসুরের দ্বারবাসিনী কালীর ইতিহাস অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ও প্রাচীন। বীরভূম জেলার রামপুরহাট মহকুমার অন্তর্গত কোটাসুর নাকি একদা কৌটেশ্বর রাজের রাজধানী ছিল। মহাভারতে বর্ণিত একচক্রা নগরীর অন্তর্ভুক্ত ছিল সেই কোটেশ্বর জনপদ। অজ্ঞাতবাসকালে পাণ্ডবরা এখানে কিছুদিন আত্মগোপন করেছিলেন। এখানেই ভীমের হাতে বকাসুরের নিধন হয়েছিল। সেই কৌটেশ্বর রাজ ছিলেন শিবভক্ত। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মদনেশ্বর শিবের মন্দির। সেই শিবমন্দিরকে রক্ষা করতে চারধারে বিরাট প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রাচীরের ছিল দু’টি দ্বার। একটি উত্তরে ও একটি দক্ষিণে। দক্ষিণ দিকের স্বার রক্ষা করতেন বাবা সন্ন্যাসী ও উত্তর দিকে অর্থাৎ কোটাসুর বাজার লাগোয়া দ্বারের রক্ষাকর্ত্রী ছিলেন দ্বারবাসিনী কালী। পরবর্তীকালে গোটা এলাকা ঘন জঙ্গলে ঢেকে যায়।
এ তো গেল জনশ্রুতির কথা। এর ঐতিহাসিক ভিত্তি আদৌ কিছু আছে কি না, তার প্রমাণ মেলে না। তবে শোনা যায় ব্রিটিশ আমলেরও আগে দুর্গাপদ পান্ডা নামে এক ব্রাহ্মণ ঘন জঙ্গলে পরিবৃত মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ থেকে দ্বরাবাসিনী কালীর শিলামূর্তি উদ্ধার করে তার নিত্যপুজোর ব্যবস্থা করেছিলেন। তারও বহু পরে গ্রামবাসীরা কালীমন্দির নির্মাণ করেন। এখনও কার্তিক মাসে কালীপুজোর দিন সেই দ্বারবাসিনী কালীর পুজো হয় মহা ধুমধাম করে। গোটা এলাকার মানুষ এই পুজো উপলক্ষ্যে উন্মাদনায় ভাসেন।
দেবীর ভোগে নিবেদন করা হয় পোড়া শোলমাছ। নিত্যপুজো হলেও কার্তিক মাসের কালীপুজোর রাতে এই মন্দির চত্বরে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। গভীর রাত পর্যন্ত চলে পুজো। শেষে হাজার হাজার ভক্তদের মধ্যে খিচুরি ভোগ বিলি করা হয়। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, এই দেবীর পুজো দিলে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি মেলে। সেই বিশ্বাসেই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন।
৬০ বছরের বেশি সময় ধরে দ্বারবাসিনীর নিত্যসেবা করে আসছেন করুণাসিন্ধু রায় ও তাঁর ছেলে সোমনাথ রায়। সোমনাথবাবু বলেন, প্রতি অমাবস্যায় এই কালীর পুজো হয়। তবে কার্তিক মাসের কালীপুজো বড় আকারে হয়। মায়ের নামে কোনও জমিজমা নেই। গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় এই পুজো হয়ে আসছে। যাঁদের মানত থাকে তাঁরা পাঁঠা ও কুমড়ো বলি দেন। পরে কয়েক হাজার ভক্তদের মধ্যে অন্ন প্রসাদ বিলি করা হয়। দেবী এখানে খুব জাগ্রত।
মদনেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গণে রক্ষিত একটি প্রস্তরখণ্ডকে বকাসুরের হাঁটুর মালাইচাকি বলে দাবি করেন স্থানীয় মানুষজন। একই সঙ্গে ওই চত্বরে রয়েছে প্রদীপের আকৃতির আরও একটি প্রস্তরখণ্ড।
ওই প্রস্তরখণ্ডটিকে কুন্তীর প্রদীপ হিসেবে মান্য করা হয়। পাণ্ডবরা অজ্ঞাতবাসে থাকাকালীন এই মদনেশ্বর শিবের পুজো দিয়েছিলেন দেবী কুন্তী। শুধুমাত্র কালীপুজোর সন্ধ্যায় আড়াই ফুট বাই দেড় ফুটের কুন্তীর প্রদীপটি জ্বালানো হয়। -নিজস্ব চিত্র