নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া: এ যেন উলট পূরাণ। এখানে কোনও ব্রাহ্মণের হস্তে কালীপুজো হয় না। এই পুজোয় ব্রাত্য খোদ ব্রাহ্মণ! শুনতে অবাক লাগলেও এটাই বাস্তব। শতাব্দী প্রাচীন করমা বামা কালী মন্দিরে ব্রাহ্মণের পরিবর্তে পৌরহিত্যের দায়িত্ব রয়েছে অব্রাহ্মণের কাঁধে। বংশ পরম্পরায় সেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন পুরুলিয়া জেলার বলরামপুর ব্লকের করমা গ্রামের কর্মকার পরিবারের সদস্যরা। শতবর্ষ পুরনো এই রীতি মেনেই তাঁরা মন্দিরের পৌরহিত্য করে চলেছেন। তবে শুধু বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনেই নয়, নিত্যপূজোর দায়িত্বও ওই কর্মকার পরিবারের কাঁধেই বর্তেছে। বর্তমানে এখানে মায়ের পুজো করেন বছর আঠান্নর মহাবীর কর্মকার। পৌরহিত্যের পাশাপাশি ওই প্রৌঢ় দক্ষ শিল্পীর মতো নিজে হাতে প্রতিমাও গড়েন।
মহাবীর কর্মকারের কথায়, বাবা ও দাদার পর এখন আমি বংশ পরম্পরায় মায়ের পুজো করছি। আমাদের পুজোয় ব্রাহ্মণ ব্রাত্য। পুরনো রীতি মেনেই ভক্তিভরে পুজো হয়ে আসছে। সাত বছর ধরে পুজো করছি। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে রাতভর চলে পুজো। এই পুজো ঘিরে গোটা গ্রাম আলোর রোশনাইয়ে সেজে উঠে। গ্রামে বসে মেলাও।
করমা গ্রামে এখনও সেভাবে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। এই গ্রামেই রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন করমা বামা কালী মন্দির। লোকমুখে শোনা যায়, একসময় বর্গিদের হাতে ওই পুজোর সূচনা হয়। তবে, বর্গিরা এলাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে পুজোর দায়িত্ব কর্মকার পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছিল। সেসময় থেকেই অব্রাহ্মণের হাতে বামা কালীর পুজোর প্রথা চালু। যা আজও অপরিবর্তিত। সেইসঙ্গে শতাব্দী প্রাচীন রীতি অনুসারে আজও বলি প্রথা চালু রয়েছে মন্দিরে। রাতভর পুজো শেষে কাকভোরে প্রথম বলি দেওয়া হয়।
প্রৌঢ় মহাবীর পেশায় কামার। লোহা পুড়িয়ে নানা ধরণের নিত্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরিই তাঁর পেশা। রুটি-রুজির তাগিদে বংশ পরম্পরায় সেকাজ আজও করে চলেছেন কর্মকাররা। যদিও ফি বছরের ন্যায় এবারও দুর্গাপুজো শেষ হতে না হতেই তিনি কামার থেকে কুমোরের বেশ ধরেছেন। দিনকয় ধরে তিনিই মন্দির চত্বরে বসে নিয়ম করে কাঠামোয় মাটির প্রলেপ দিয়ে প্রতিমা গড়ার কাজ করে চলেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এই মূহূর্তে তাঁর কর্মব্যস্ততা তুঙ্গে। কারণ হাতে যে খুব একটা সময় নেই। কর্মকার পরিবারের তরফে জানা গিয়েছে, বামা কালীর দুই ডান হাতে খর্গ ও চক্র থাকে। আর দুই হাতে থাকে কাটামুণ্ডু ও রক্তের বাটি।
এক সময় মাটির দেওয়াল ও টালির ছাউনির মন্দির ছিল। তবে গ্রামের বাসিন্দাদের সহযোগিতায় বছর কয়েক আগে কংক্রিটের সুদৃশ্য মন্দির গড়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ঠেলু গড়াই বলেন, গোটা গ্রামের মানুষই এই পুজোর সঙ্গে জড়িত। খুব নিষ্ঠা সহকারে কর্মকার পরিবারের সদস্যরা বংশ পরম্পরায় পৌরহিত্য করে চলেছেন। মা খুবই জাগ্রত। সব বিপদ থেকে গোটা গ্রামকে আগলে রাখেন মা। প্রতীকী ছবি