আমরা রাতে ঘুমাই। কিন্তু কিছু প্রাণী রাত হলেই জেগে ওঠে! এসব প্রাণী ব্যতিক্রমী ইন্দ্রিয় শক্তির অধিকারী। তেমনই কিছু প্রাণীর খোঁজ দিলেন কালীপদ চক্রবর্তী
আমরা রাতে ঘুমাই। কিন্তু কিছু প্রাণী রাত হলেই জেগে ওঠে! এসব প্রাণী ব্যতিক্রমী ইন্দ্রিয় শক্তির অধিকারী। তেমনই কিছু প্রাণীর খোঁজ দিলেন কালীপদ চক্রবর্তী
ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা যখন ঘুমিয়ে থাক, তখন বাদুড়, পেঁচা থেকে শুরু করে ছুটে চলা র্যাকুন, শিকারি শিয়ালরা অন্ধকারে কি তাণ্ডব করে বেড়ায়!
নিশাচর প্রাণী শুনলেই কেমন যেন আমাদের গা ছমছম করে। যারা অন্ধকারের আড়ালে জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এই ধরনের প্রাণীরা রাতেই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। এইসব নিশাচর প্রাণীর আবাসগুলিও বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।
নিশাচর প্রাণীদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল তাদের ব্যতিক্রমী ইন্দ্রিয়। এই প্রাণীরা গন্তব্যের দিক নির্দেশ করতে, খাবার খুঁজে পেতে এবং শিকারিদের এড়াতে কম আলোয় এদের ঘ্রাণ, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির উপর খুব বেশি নির্ভর করতে হয়। পেঁচার তীক্ষ্ণ শ্রবণশক্তি রয়েছে। যা তাদের অন্ধকারে শিকারকে কেবল শব্দের মাধ্যমে শনাক্ত করতে সাহায্য করে। বাদুড় ইকো-লোকেশন ব্যবহার করে উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সি শব্দ বের করে। যা বস্তুতে লেগে বাউন্স করে এবং তা তাদের কাছে ফিরে আসে। যা তাদের অন্ধকারে দিক নির্দেশ করতে এবং শিকার ধরতে সাহায্য করে।
নিশাচর প্রাণীরা কম আলোয় দেখার জন্য অভিযোজিত হয়েছে। অনেক নিশাচর প্রাণীর চোখ কিছুটা বড় থাকে। যা তাদের আরও আলো সংগ্রহ করতে এবং অন্ধকারে আরও ভালো দেখতে সাহায্য করে। বিড়ালের মতো কিছু প্রাণীর রেটিনার পিছনে কোষের একটি বিশেষ স্তর থাকে, যাকে ট্যাপেটাম লুসিডাম বলা হয়। যা তাদের রাতের দৃষ্টিশক্তি উন্নত করে। অর্থাৎ কম আলোয় দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
নিশাচর প্রাণীদের আরও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল তাদের আচরণ। এই প্রাণীদের ঘুমের ধরন অন্যান্য প্রাণীদের থেকে একদম আলাদা। দিনে এরা বিশ্রাম নেয়। আর রাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সূর্যালোক এরা সহ্য করতে পারে না। নিশাচর প্রাণীরা অন্ধকারে চুপিসারে চলাফেরা করে। যাতে শিকার বা শিকারি এদের অস্তিত্ব টের না পায়। কিছু প্রাণী যেমন মরুভূমিতে বসবাসকারী বিছে, সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে মাটির নীচে গর্ত করে থাকে। বালি ঠান্ডা হতেই এরা বেরিয়ে পড়ে। নিশাচর প্রাণীদের খাদ্যও আলাদা রকম। অনেক নিশাচর প্রাণী মাংসাশী। রাতে শিকার ধরে খায়। যেমন ইঁদুর ধরার জন্য রাতে বেরয় পেঁচা। বাদুড়ও নিশাচর মাংসাশী প্রাণী। এরা রাতের বেলা আলোতে আকৃষ্ট হওয়া পতঙ্গের মতো পোকামাকড় খেয়ে থাকে। তবে, ফলও খায়।
বেশিরভাগ মানুষ যখন নিশাচর প্রাণীর কথা ভাবেন, তখন তাঁরা প্রায়ই বাদুড় এবং পেঁচার মতো প্রাণীর কথাই ভেবে থাকেন। কিন্তু এছাড়াও অনেক নিশাচর প্রাণী আছে। যারা সূর্য অস্ত যাওয়ার পরে জেগে ওঠে। সবচেয়ে আইকনিক নিশাচর প্রাণীদের মধ্যে একটি হল র্যাকুন। উত্তর আমেরিকার এই প্রাণী অত্যন্ত ধূর্ত। র্যাকুন শহুরে পরিবেশের সঙ্গে ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। আবর্জনার স্তূপে খাবার সন্ধানে এদের দেখতে পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে এদের খুব নিরীহ প্রাণী বলে মনে হলেও খাদ্যের জন্য শিকারের খোঁজে বেরনোর সময় দলবদ্ধভাবে বেরতে দেখা যায়। এদের অনেক বদনাম সত্ত্বেও, র্যাকুনরা কীটপতঙ্গ এবং ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শিকার করে পরোক্ষভাবে প্রকৃতিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আরও একটি সাধারণ নিশাচর প্রাণী হল শিয়াল। আমাদের দেশে গ্রামেগঞ্জে যাঁরা থাকেন, এই শীতকালে প্রায়শই শিয়ালের ডাক শুনতে পান। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ জুড়ে পাওয়া যায় রেড ফক্স। এই লাল শিয়াল দক্ষ শিকারি।
উত্তর আমেরিকার মরুভূমিতে, কোয়োট একটি পরিচিত নিশাচর প্রাণী। এগুলি হল বন্য কুকুর। এগুলি আকারে নেকড়ের চেয়ে ছোট। কোয়োটকে আমেরিকান শিয়াল বা প্রেইরি উলফও বলা হয়।
আকাশে উড়ে বেড়ানো বড় বড় শিংওয়ালা পেঁচা হল একটি রাজকীয় নিশাচর শিকারি। যা উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে পাওয়া যায়। শিকারের জন্য অভিজ্ঞ এই বড় পাখিগুলি তাদের কানের এবং হলুদ চোখের জন্য পরিচিত। দুর্দান্ত শিংওয়ালা এই পেঁচাগুলো তাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং শ্রবণশক্তির জন্য প্রসিদ্ধ। এরা তাদের শিকারের উপর নিঃশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। তারা প্রাথমিকভাবে ইঁদুর এবং খরগোশের মতো ছোট প্রাণী শিকার করে। আমাদের দেশে সাদা বর্ণের লক্ষ্মী পেঁচা ও ধূসর বর্ণের পেঁচা দেখতে পাওয়া যায়।
শুধু এই ক’টি প্রাণীই নয়, অন্ধকার নামলে বাঘ, চিতাবাঘ, হায়নার মতো বহু প্রাণী সক্রিয় হয়ে ওঠে। গোটা জঙ্গল যেন জেগে ওঠে। রাতের জঙ্গল সত্যিই বৈচিত্র্যপূর্ণ।