সংবাদদাতা, লালবাগ: নিউ প্যালেস সংলগ্ন ভাগীরথীর ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা। এখন অফ সিজনে পর্যটকের দেখা নেই। হাজারদুয়ারি সহ সাবেক নবাব নগরীর দর্শনীয় স্থানগুলি শুনশান। দিনভর ঠায় বসে থেকে প্রায়শই খালি হাতে বাড়ি ফিরে যেতে হচ্ছে পর্যটন নির্ভর নৌকার মাঝিদের। রুজি রোজগারে টান পড়ায় চরম আর্থিক অনটনের মধ্যে দিন কাটছে তাঁদের। এই পরিস্থিতিতে সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে মাঝিদের একাংশ দিনমজুর, সব্জি বিক্রি বা ভাড়ায় টোটো চালাচ্ছেন। বয়সের ভারে শারীরিকভাবে কিছুটা অক্ষম মাঝিরা চাঁদি ফাটা রোদেই পর্যটকদের অপেক্ষায় দিনভর ঠায় বসে থাকছেন। দিনের শেষে কেউ ৫০ টাকা, কেউ ৩০ টাকা আবার কেউবা খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন। মাঝিদের দাবি, টোটো চালু হওয়ার পর থেকেই তাঁদের রোজগারে টান পড়তে শুরু করেছে। মরশুমের মাস দুয়েক বাদে বছরের বাকি সময় ভাগ্যের হাতে নিজেদের সঁপে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই দিন আনা দিন খাওয়া ওই মানুষগুলির। সাবেক নবাবি তালুক মুর্শিদাবাদে রয়েছে নবাব ও তৎকালীন জমিদারদের একাধিক স্থাপত্য ও ভাস্কর্য নির্দশন। এখানে দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরে দেখতে প্রায় সারা বছর পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। পর্যটকদের দর্শনীয় স্থানগুলি ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য রয়েছে নবাবি ইতিহাসের ধারক ও বাহক দুই শতাধিক ঘোড়ায় টানা টাঙ্গা। তবে নদীপথে নবাবি স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন হাজারদুয়ারি প্যালেস এবং পার্শ্ববর্তী নিউ প্যালেসের নৈসর্গিক দৃশ্য চাক্ষুষ করানোর পাশাপাশি ভাগীরথীর পশ্চিমপাড়ে খোসবাগে নিয়ে যাওয়ার জন্য রয়েছে ৪৫টি নৌকা।
হাজারদুয়ারি নৌকা পরিবহণ সমবায় সমিতি অধীনে নৌকার মাঝিদের জীবন-জীবিকা নবাবের শহরের পর্যটনের উপর নির্ভরশীল। মাঝিরা বলেন, টোটো চালু হওয়ার পর থেকে দুঃসময়ের শুরু। আগে সারা বছর শাক-ভাতের পয়সাটা রোজগার হলেও শীতের মরশুমে ভালো রোজগার হতো। এখন টোটোর বাড়বাড়ন্তে শীতের মরশুমেও রোজগার নেই। অন্য সময় তো বসে থেকেই কাটাতে হয়।
সুনীল রায়, রবীন্দ্রনাথ হালদাররা চার দশকের বেশি সময় ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। হাজারদুয়ারি প্যালেস সংলগ্ন ভাগীরথীর পাড়ে নৌকায় বসে ষাটোর্ধ্ব সুনীল রায় একরাশ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, টোটোর বাজার দখলের আগে শীতের মরশুমের দুই মাসে ২৫-৩০ হাজার টাকা করে রোজগার হতো। বছরের অন্য মাসগুলিতে মন্দ হতো না। কিন্তু গত এক দশক ধরে শীতের মরশুমে টেনেটুনে ৮-১০ হাজার টাকা রোজগার হয়।
রবীন্দ্রনাথ হালদার বলেন, মার্চ মাস থেকে একপ্রকার বসেই দিন কাটছে। কোনওদিন টেনেটুনে ৫০ টাকা হচ্ছে তো, কোনদিন হচ্ছে না। অল্প বয়সিরা অনেকেই বাধ্য হয়ে অফ সিজনে অন্য কাজ করছেন। কয়েকজন পাকাপাকিভাবে অন্য পেশায় চলে গেছেন। বয়স পঁয়ষট্টি পেরিয়েছে। শারীরিকভাবে আগের মতো সক্ষম নই। তাই বাধ্য হয়েই এই পেশায় রয়ে গিয়েছি। জানি না, এভাবে আর কতদিন টিকে থাকতে পারব। বাবার হাত ধরে এই পেশায় এসেছেন ষষ্ঠী হালদার।
তিনি বলেন, অন্য বছর এই সময় টুকটাক রোজগার হয়। কিন্তু এবছর গত একমাস থেকে সারা দিনের শেষে চায়ের খরচটাও উঠছে না। রেশনের চালটা পাচ্ছি, তাই দু’ মুঠো জুটে যাচ্ছে। পর্যটক না আসার জন্য লালবাগের নিউ প্যালেসের ঘাটে নৌকা সারিবদ্ধভাবে রাখা আছে। -নিজস্ব চিত্র