Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কোনো ধর্ম, ভাষা অশ্রদ্ধার নয়

ঐতিহাসিক কাল থেকেই বাংলা সারা দুনিয়ার আকর্ষণের কেন্দ্রে। বাংলার সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে লুটেরা, পর্যটক থেকে শাসক অনেকেই।

কোনো ধর্ম, ভাষা অশ্রদ্ধার নয়
  • ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ঐতিহাসিক কাল থেকেই বাংলা সারা দুনিয়ার আকর্ষণের কেন্দ্রে। বাংলার সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে লুটেরা, পর্যটক থেকে শাসক অনেকেই। তাদের মধ্যে আরব, মধ্যপ্রাচ্য, দূর প্রাচ্য থেকে ইউরোপ—অনেক অঞ্চলের লোকজন ছিল। এইভাবে নানাসময়ে বাংলায় শাসন ক্ষমতা কায়েম করেছিল মুসলিমরা এবং ইংরেজ, ফরাসি প্রভৃতি জাতি। আবার বেশকিছু জাতি পা বাড়িয়েও এই পাণ্ডববর্জিত দেশে পৌঁছাতে পারেনি। অন্যদিকে, একদল বিদেশি লোক এখানে এসেও ফিরে গিয়েছিল নিজ নিজ মুলুকে। তারা এসেছিল হয়তো শুধুই লুণ্ঠনের মতলবে অথবা অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে পারেনি কিংবা বাংলাকে বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি তাদের পক্ষে। ইংরেজ বণিকের হাত ধরে ভারতবর্ষে ইংল্যান্ডের রানির শাসনের পত্তন হয়েছিল বাংলাতেই। কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। সেই সূত্রে সারা বাংলায় আধুনিক শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল। ভারতবর্ষে রেনেসাঁর ধারকবাহক হয়ে উঠেছিল এই অঞ্চল। গোটা উপমহাদেশে যারাই আলোকপ্রাপ্ত হতে চেয়েছে তারা ছুটে এসেছে এখানে। সব ধরনের মানুষকে আপন করে নিতে বাংলা কার্পণ্য করেনি। কলকাতা হয়ে উঠেছিল মিনি ভারতবর্ষ। সারা বাংলা হয়ে উঠেছিল তামাম দুনিয়ার ক্ষুদ্ররূপ। নানা দেশের এবং দেশের নানা অঞ্চলের মানুষকে হৃদয়ে জায়গা দিয়েছিল বাংলা। বাংলার কবিই শিখিয়েছেন ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এবং ‘দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে’। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের যে নীতিতে ভারত সুন্দর ও সংহত হতে পেরেছে, তা বাংলারই মর্মবাণী। 

Advertisement

ইংরেজের শাসন একসময় চরম শোষণে রূপান্তরিত হয়েছিল। ক্রমে ইংরেজের শাসন-শোষণের অবসানই হয়ে ওঠে একমাত্র কাম্য। ব্রিটিশ বিরোধী সেই ভয়ংকর লড়াই সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে বাংলা পিছপা হয়নি। তার জন্য চরম মূল্যই দিতে হয়েছিল বাংলা ও বাঙালিকে। বহু বঙ্গসন্তান রক্ত দিয়েছেন, কারারুদ্ধ হয়েছেন, দ্বীপান্তরের যন্ত্রণা ভোগ করেছেন, রুটিরুজি কেরিয়ার জলাঞ্জলি গিয়েছে তাঁদের, এমনকি বাংলার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল কৃত্রিম মন্বন্তর পর্যন্ত! বাংলার যন্ত্রণা এটুকুতেই শেষ হয়নি। বাংলার মানচিত্র নিয়ে বারবার পরীক্ষানিরীক্ষা করেছে ইংরেজ। ভারতের স্বাধীনতালাভের শর্ত হিসেবেও দ্বিখণ্ডিত হয়েছে বাংলা। আর এখানেই বাংলার পরিতাপ, আমাদের অবদান এই দেশ, উপমহাদেশ স্বীকার করেনি। খণ্ডিত বাংলাকেও কি স্বস্তি দিয়েছে কায়েমি স্বার্থ? পূর্ববঙ্গের (পূর্ব পাকিস্তান) উপর উর্দু আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়ারও ষড়যন্ত্র করেছিলেন জিন্না। তার বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী লড়াই করেন বাহান্নর ভাষা বিপ্লবীরা। ২১ ফেব্রুয়ারির সেই ঐতিহাসিক সংগ্রামই নস্যাৎ করে দিয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে, ইসলামের জিগিরে পাকিস্তান সৃষ্টির তত্ত্ব। শুধু পূর্ববঙ্গই-বা কেন, বাংলা ও বাঙালির বিরোধিতায় স্বাধীন ভারতে চ্যাম্পিয়নের নাম অসম। সেখানে বিপুল সংখ্যক বাংলাভাষী মানুষের মাতৃভাষার অধিকার কেড়ে নিতে অতিসক্রিয় ছিল ওই রাজ্য। তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়েই বাঙালিকে রক্ত দিতে হয়েছে। ১৯৬১ সালের ১৯ মে বরাকর উপত্যকায় ১১ জন ভাষা সৈনিক শহিদ হন। দিনটি উচ্চারিত হয় অমর একুশের পাশে রেখেই। অসমের কুৎসিততম মুখ দেখেছি আমরা তাদের ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলনের সময়। অসম দ্বিতীয়বার দাঁত নখ দেখিয়েছে এনআরসি পর্বে। বাঙালি তার মায়ের ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে মানভূমেও। 
সারা পৃথিবীতে কমবেশি ৩০ কোটি মানুষের মুখের ভাষা বাংলা। বাংলাদেশের প্রায় সকলেই বাংলাভাষী। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যের প্রধান ভাষা বাংলা। এছাড়া অসম, ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা, আন্দামান এবং আরো নানা অঞ্চলে বাংলাভাষীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বাংলাভাষীরাই ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষাগোষ্ঠী—হিন্দির পরেই। তাসত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের বাইরে গেলেই বাঙালি এবং বাংলাভাষীদের কটাক্ষ শুনতে হচ্ছে। তাঁদের দেগে দেওয়া হচ্ছে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘বিদেশি’ বলে। এই অবাঞ্ছিত কাণ্ড বিজেপি/এনডিএ শাসিত রাজ্যগুলিতেই বেশি। বাংলাভাষী মানুষ কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক নিগ্রহেরও শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ। এই বিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে রাজপথে। বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে সংসদেও। কিন্তু এখনো এই অমানবিকতা বন্ধ হয়নি। তাই শনিবার ভাষা দিবসের মঞ্চ থেকে প্রতিবাদ জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর তর্জনী উঁচু ছিল মোদি সরকার এবং বিজেপির বিরুদ্ধে। এসব তিনি বরদাস্ত করবেন না বলেও সাফ জানিয়ে দেন। বাংলাভাষী বা বাঙালিদের হেনস্তা করার আগে ভাবা উচিত, পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু লক্ষ লক্ষ ভিন রাজ্যের মানুষ শান্তিতে বসবাস করেন। কেউ আছেন শিক্ষা/প্রশিক্ষণের প্রয়োজনে। কিছু মানুষ চাকরি/ব্যবসা করেন। আত্মীয়তার সম্পর্কেও আবদ্ধ বহুজন। ঘৃণা কিন্তু সংক্রামক। সেটা বাংলায় সংক্রামিত হলে তার ফল কারো জন্যই ভালো হবে না। শান্তিপ্রিয় বাঙালির ধৈর্যের পরীক্ষা না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ‘কোনো ধর্ম ও ভাষা অশ্রদ্ধার নয়’—শ্রেষ্ঠ ভারতসন্তান স্বামী বিবেকানন্দের এই নির্দেশই মেনে চলা দরকার সকলের। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ