প্রীতম দাশগুপ্ত: ২২ জুন, ২০২৩। মার্কিন সফরে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। হোয়াইট হাউসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে একযোগে প্রেস কনফারেন্স করছেন। বিশ্বের ইতিহাসে এই ঘটনাকে নিঃসন্দেহে অতি বিরল আখ্যা দেওয়া যায়। কেন? হোয়াইট হাউসের এক কর্তাই সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে জানিয়েছিল, এটি বড়ো বিষয়, কারণ মোদি ভারতে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার জন্য পরিচিত। সেই সাংবাদিক সম্মেলনে সাবরিনা সিদ্দিকি নামে ওয়াল স্ট্রিট পত্রিকার এক তরুণী সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, ভারতে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে আপনার সরকার বিমাতৃসুলভ আচরণ করে বলে অভিযোগ। তিনি আরও বলেছিলেন, অভিযোগ ওঠে, আপনার সরকার বিরুদ্ধ মতের কণ্ঠরোধ করে। মুসলিম এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের অধিকার উন্নত করতে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় আপনার সরকার কী পদক্ষেপ নেবে? মোদি সরাসরি সাবরিনার প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়েছিলেন। তবুও তিনি একটি উত্তর দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী উত্তর দিলে কী হবে? তাঁর ভক্তকুল এরপরই সমাজমাধ্যমে ট্রোল করতে শুরু করেন সাবরিনাকে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে ওঠে যে হোয়াইট হাউসের তৎকালীন প্রেস সেক্রেটারি ক্যারিন জিন পিয়ের বলেন, আমরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। কোনো সাংবাদিককে হয়রান করা কিংবা তাঁকে ভয় দেখানোর প্রচেষ্টার তীব্র নিন্দা করি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও জানায়, একজন রিপোর্টারকে এ ধরনের হয়রান করা গ্রহণযোগ্য নয়।
১৮ মে, ২০২৬। নরওয়ে সফরে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানকার প্রধানমন্ত্রী জোনাস গার স্টোরের সঙ্গে প্রেস ব্রিফিংয়ে হাজির মোদি। দুই রাষ্ট্রনেতাই তাঁদের বিবৃতি দিয়েছেন। সেই সময়ই বেমক্কা প্রশ্ন ছুড়ে দেন নরওয়ের দাগসাভিসেন পত্রিকার তরুণী সাংবাদিক হেলে লিং। খুবই ছোট্ট প্রশ্ন। কিন্তু প্রভাব বিশাল। বলেন, আপনি কেন সাংবাদিকদের প্রশ্ন নেন না? পাত্তাই দেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এমন ভাব করেন যেন তিনি এসব শোনেনইনি। বিবৃতি শেষ করে রওনা দেন। পিছন পিছন গিয়ে ফের প্রশ্ন করেন ওই তরুণী। একবারও ঘুরে দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি প্রধানমন্ত্রী। পরে এক্স হ্যান্ডলে ওই তরুণী লেখেন, নরওয়েতে বিদেশি নেতারা এলে সাধারণত সংবাদমাধ্যম কয়েকটি প্রশ্ন করার সুযোগ পায়। খুব বেশি নয়, কিন্তু কিছু প্রশ্ন। আজ মোদির ক্ষেত্রে তা হয়নি। ব্যাস, শুরু হয়ে যায় ট্রোল। এবার ভক্তকুল ওই তরুণীকে গুপ্তচর, বিদেশি আগাছা হিসাবে চিহ্নিত করা শুরু করে। মোদির আগে শেষবার নরওয়ে সফর করেছিলেন ১৯৮৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তিনি তো দিব্যি সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন। সাংবাদিকদের চোখা চোখা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। মোদির পূর্বসূরি মনমোহন সিংকে তো বিজেপি বরাবর মৌনী-মোহন বলত। কিন্তু দেশেই হোক বা বিদেশ—তিনি সাংবাদিক সম্মেলন এড়িয়ে গিয়েছেন এমন নজির নেই। তাহলে মোদিজি কেন কোনো প্রশ্ন নয়, তত্ত্বে অটল! তাঁর দলের পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী অটলজিরও তো এমন রেকর্ড নেই। তাহলে মোদিজি কেন কোনো প্রশ্ন নয় নীতিতে চলেন? একটা যুক্তি তাঁর আছে। সেটা হল মিডিয়া নিরপেক্ষ নয়। সাংবাদিকরা তাঁদের ব্যক্তি মত আর আদর্শ অনুসারে চলেন।
ভারত বিশেষজ্ঞ ফরাসি পলিটিক্যাল অ্যানালিস্ট ক্রিস্টোফ জাফরেলো বলেছেন, মোদি সাংবাদিক সম্মেলন এড়িয়ে চলেন কারণ, তাঁর বক্তব্য এমন এক ভারতের ছবি তুলে ধরে, যার অস্তিত্ব বাস্তবে নেই। তাই এ নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করুক, মোদি তা চান না। এই কারণেই তাঁর ক্ষেত্রে সবটাই ওয়ান ওয়ে। মোদি যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময় ২০০২ সালে দাঙ্গা হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ি মোদিকে রাজধর্ম পালন করতে বলেছিলেন। পরে ২০০৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে করণ থাপারের ওই দাঙ্গা সংক্রান্ত চোখা প্রশ্ন শুনে চার মিনিটের মধ্যেই ইন্টারভিউ ছেড়ে চলে যান মোদি।
২০২৩ সালে গুজরাত দাঙ্গা নিয়ে বিবিসির একটি তথ্যচিত্র মোদি সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। সেখানে ২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদির একটি সাক্ষাৎকারের অংশ দেখানো হয়। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোনো কিছু অন্যভাবে করার কথা তিনি কি মনে করেন? মোদিজির উত্তর ছিল, হ্যাঁ, একটা
জায়গা আরও ভালোভাবে করতে পারতাম। কী বলুন তো? সংবাদমাধ্যমকে কীভাবে সামলাতে হয়।
বিখ্যাত কলামনিস্ট রুচির শর্মা তাঁর বই ডেমোক্র্যাসি অন দ্য রোডে লিখেছেন, ২০০৭ সালে মোদির সঙ্গে বিভিন্ন বিশিষ্ট সাংবাদিকের আলোচনা হচ্ছিল। তাঁদের কঠিন প্রশ্ন শুনে বিরক্ত হয়ে মোদি নৈশভোজ না করে বেরিয়ে যান। আসলে তিনি সংবাদমাধ্যমের তীক্ষ্ণ নজরদারি পছন্দ করেন না। সেই কারণেই হয়তো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই পুরানো ‘ভুল’ করতে চাইছেন না নরেন্দ্র মোদি।
নেদারল্যান্ডস থেকে নরওয়ে গিয়েছিলেন মোদি। নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা কী? মোদি যথারীতি এদেশেও কোনো সাংবাদিক বৈঠক করেননি। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রকের প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ডাচ সংবাদপত্র দ্য ফোকঅসরান্তের প্রতিনিধি আশ্বন্ত নান্দ্রাম। তিনি প্রশ্ন করেন, নেদারল্যান্ডসে এমন সফরের পর সাধারণত দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জন্য উপস্থিত থাকেন। আমি জানতে চাই আজ কেন তা হচ্ছে না?
ঘটনা হল, প্রথমে নেদারল্যান্ডস ও পরে নরওয়েতে বিদেশ মন্ত্রকের তরফে একই ধরনের উত্তর দেওয়া হয়। বিদেশ সচিব (পশ্চিম) সি বি জর্জ যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হল, ভারত কত বড়ো গণতান্ত্রিক দেশ। কেন মোদি সাংবাদিক বৈঠক করেন না? সরাসরি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি বোঝাতে থাকেন, দাবার জন্ম ভারতে। শূন্যর আবিষ্কারও এদেশে। ভারত কোভিডের সময় বহু দেশকে ভ্যাকসিন দিয়েছে। এই সব। তারপরই বুঝিয়েছেন, ভারত গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে নিয়ম করে ভোট হয়। মহিলাদের ভোটাধিকার প্রথম থেকেই রয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
ইংরেজিতে একটি কথা আছে, হোয়াটাবাউটারি। এর আভিধানিক অর্থ হল সমালোচনা ঠেকাতে মূল প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে গোলগোল উত্তর দেওয়া। সি বি জর্জের উত্তরকে এককথায় এটাই বলা যায়। নেদারল্যান্ডস বা নরওয়ের মতো দেশে সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব অনেক বেশি। সেখানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়া, তাঁদের প্রশ্নের জবাব দেওয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই অঙ্গ। তাই সেখানকার সাংবাদিকরা কোনো রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী প্রথা মেনে সাংবাদির বৈঠক না করলে অবাক হয়ে যান। তাঁদের প্রশ্নের মুখোমুখি না হলে মনে করেন গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মানা হচ্ছে না। তাই মোদি সাংবাদিকদের এড়াতে চাইলেও তাঁরা ছাড়বেন কেন? হেলে লিংয়ের কথায়, প্রশ্ন করা আমাদের দায়িত্ব। ...আমি যদি প্রশ্ন করতে সাহস না পাই, তাহলে কে পাবে? এডিটরস গিল্ডও মোদির অবস্থানকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়েছে। তাদের আহ্বান, ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনার দায়িত্ব পালনের জন্য সংবাদমাধ্যমকে যেন প্রতিপক্ষ হিসাবে না দেখা হয়।
ভারতেও সংবাদমাধ্যমকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। কিন্তু শেষ ১২ বছরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথা মেনে সাংবাদিক বৈঠক করেছেন, এমন ‘অপবাদ’ তাঁর ঘোর শত্রুরাও দেবেন না। প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রথম প্রেস কনফারেন্সটা মনে আছে? ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পরে ২০১৯ সালের ১৭ মে নয়াদিল্লিতে তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। যেই সাংবাদিক প্রশ্ন ছুড়েছেন, ওমনি পাশে বসা অমিত শাহকে মাইক্রোফোন এগিয়ে দিয়েছেন। একটাও প্রশ্নের উত্তর দেননি। পরবর্তীকালে মিডিয়ার মুখোমুখি তিনি একদম হননি এমন নয়। তবে সেগুলির বেশিটাকেই কার্যত সাজানো বলা যায়। কয়েকটি পেটোয়া সংবাদমাধ্যমে কার্যত গট-আপ ইন্টারভিউ দিয়েছেন। প্রশ্নগুলি সহজ, উত্তরও জানা। যেমন বলেছেন, আমার জন্ম বায়োলজিক্যাল নয়। আমাকে ঈশ্বর প্রেরণ করেছেন ইত্যাদি। কখনো তাঁর মন্ত্রকে আগাম লিখিত প্রশ্ন পাঠাতে হয়, সেগুলি চিহ্নিত করে মন্ত্রক লিখিত উত্তর দেয়। কখনো বা সাজানো ফোটোশ্যুট হয়। এমনকি বিদেশ সফরেও দেখা গিয়েছে, তিনি প্রথা মেনে সাংবাদিক বৈঠক এড়িয়ে গিয়েছেন। আগে থেকে লিখে রাখা যৌথ বিবৃতি দিয়েই দায় সেরেছেন।
সাংবাদিক বৈঠক তো দূর। মোদিজির বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ তো সাংসদরাই করেন। প্রধানমন্ত্রী সংসদে প্রশ্ন এড়িয়ে যান বলে বারবার সরব হয়েছেন বিরোধীরা। কিন্তু তার জন্য পরিস্থিতিতে বদল হয়েছে এমন নয়। মজার কথা হল, গত ১২ বছরে অসংখ্যবার
সংসদ অধিবেশন চলার সময়ই তিনি বিদেশ সফরে গিয়েছেন। শতাংশের একটা মোটামুটি হিসাব ধরলে তাঁর বিদেশ সফরের অন্তত ৮০ শতাংশই হয় সংসদ অধিবেশনের সময়।
মোদিজি সাধারণ গণতান্ত্রিক প্রথা, যেমন অন্য কোনো রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন গ্রহণ করা—এসব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। আমরা সেটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নিচ্ছি। সি বি জর্জ বিদেশের মাটিতে ভারতের গণতন্ত্রের কথা বলেছেন। ভালো কথা। কিন্তু গণতন্ত্র মানে কি শুধুই ভোটাধিকার? গণতন্ত্র মানে কি শুধু ‘কোনো প্রশ্ন’ নয়? গণতন্ত্র মানে জবাবদিহি নয়? সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়? হাজার হাজার মিডিয়া রয়েছে বললেই স্বাধীনতা হয়? ১৮০ দেশের মধ্যে ভারতের স্থান এই নিরিখে এখন ১৫৭। গত বছরের থেকে কয়েক ধাপ নীচে নেমেছে ভারত।
সোনার কেল্লা ছবিতে ফেলুদা চুপ থাকতে বলায় লালমোহনবাবু বারবার আওড়াচ্ছিলেন, কোনো প্রশ্ন নয়। তবুও শেষে একটা মারাত্মক প্রশ্ন করেও ফেলেছিলেন। আর উত্তরটাও দিয়েছিলেন ফেলুদা। আমরা সেই দিন দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।