Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

‘যোগ্য কারও চাকরি যাবে না’, আশ্বাস মমতার, আপাতত বহাল রাখার আর্জি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে পর্ষদও

‘যোগ্য কারও চাকরি যাবে না’, আশ্বাস মমতার, আপাতত বহাল রাখার আর্জি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে পর্ষদও
  • ৮ এপ্রিল, ২০২৫ ১৫:০৪
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চাকরি বাতিল হয়েছে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর। সঙ্কটে পড়া ‘যোগ্য’ প্রার্থীরা সোমবার আগ্রাসী মেজাজে চাইছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ঠিক তা-ই হল। নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে চাকরি বাঁচানোর বরাভয় থেকে শুরু করে তথাকথিত ‘চাকরিখোর’দের প্রতি তীব্র আক্রমণ—সবই উঠে এল তাঁর গলায়। কোনও রাখঢাক না রেখে তিনি বলে দিলেন, ‘আমি বেঁচে থাকতে কেউ আপনাদের চাকরি কেড়ে নিতে পারবে না। যোগ্য কারও চাকরি যাবে না। কাল থেকে স্কুলে যান, বাকিটা আমরা বুঝে নেব।’ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কলজের জোর বেড়ে গেল এসব আশ্বাসবাণীতেই। ঝুলে পড়া কাঁধ অনেকটাই উঁচু করে স্টেডিয়াম থেকে বেরলেন তাঁরা।

Advertisement

এসব যে স্রেফ কথার কথা নয়, তার প্রমাণ এদিনই মিলেছে। সরকারের সবুজ সঙ্কেত পেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানিয়েছে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ। যতদিন না নতুন নিয়োগ হচ্ছে বা অন্তত এই শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের যাতে বরখাস্ত না করা হয়, সেই আপিল করা হয়েছে। পর্ষদের যুক্তি, এমনটা না হলে ভেঙে পড়বে শিক্ষাব্যবস্থা। আর তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পড়ুয়ারাই। স্বয়ং মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ, শিক্ষাসচিব বিনোদ কুমার এবং আইনজ্ঞদের নিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স। ‘যোগ্য’দের চাকরি বাঁচাতে সমান্তরালভাবে রাজ্য সরকার যে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে, সেখানে নজরদারি চালাবে তারা।
এদিন স্টেডিয়াম ঘিরে ছিল পুলিসের নিশ্ছিদ্র প্রহরা। যদিও বাইরে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের একাংশ গোলমাল বাঁধায়। মুখ্যমন্ত্রীর সভায় যোগ দিতে যাওয়া শিক্ষকদের প্রবেশপত্র কেড়ে নেওয়া, হেনস্তা ইত্যাদি চলে। তবে, খানিকক্ষণের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিস। সভাতেও এঁদের কেউ কেউ ফাঁকতালে ঢুকে পড়ে গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করেন। সেই চেষ্টা সফল হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী এবং দায়িত্বে থাকা পুলিস কর্মী-আধিকারিকরা ঠান্ডা মাথায় তা সামাল দেন। এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একদিকে যেমন শিক্ষকদের আশ্বাস দেন, তেমনই চাকরি বাতিলের নির্দেশের জন্য কাঠগড়ায় তোলেন বিজেপি এমপি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যদের। কখনও নাম নিয়ে, কখনও নাম না নিয়ে বিদ্ধ করেন তাঁদের। সমালোচনায় উদ্ধৃত করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতাও। তিনি আরও বলেন, ‘সরকার কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেবে না। যোগ্যদের চাকরি ফেরানোই আমাদের অগ্রাধিকার। পরে আদালতের চোখে অযোগ্যদের বক্তব্যও শোনা হবে। দু’মাসের মধ্যে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব।’
গোটা বিষয়টিতে সুপ্রিম কোর্টের যে কোনও ভুল নেই, তা এদিন বারবার বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, ‘একটা শ্রেণি’ একনাগাড়ে রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাজ করে গিয়েছে। বিচারের মূল নীতি মনে করিয়ে মমতা বলেন, ‘হাজার হাজার দোষী ছাড়া পেলেও একজন নিরপরাধ যেন শাস্তি না পান, এটাই জেনে এসেছি। তাহলে যাঁরা নিয়ম মেনে চাকরি পেয়েছেন, তাঁদের চাকরি কেন বাতিল করা হল?’ হাততালির ঝড় ওঠে গোটা স্টেডিয়ামে। চাকরি বাতিল হওয়া শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের আপাতত স্কুলে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে অনুরোধ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাতে প্রথমে আপত্তি ওঠে স্টেডিয়াম জুড়ে। যদিও, বক্তব্যের মূল বিষয়টি বুঝে ওঠার পর শিক্ষকরা শান্ত হন। মঞ্চে উপস্থিত মেহবুব, সঙ্গীতাদের মতো আন্দোলনকারীরা অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন, কোনও পরীক্ষা নয়। সরাসরি চাকরিতে ফিরতে চান তাঁরা। কারণ, তাঁরা যোগ্য।
স্টেডিয়াম ছেড়ে বেরনোর সময় মুর্শিদাবাদের নিমগ্রাম বেলুড়ি হাইস্কুলের শিক্ষক দেবাশিস দত্ত বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন। কাল থেকে স্কুলে যেতে বলেছেন। ভেবেছিলাম, যোগ্য হলেও এখনই আমাদের চাকরি চলে যাবে। সেই ভাবনা থেকে সরে আসছি। আমরা স্কুলে যাব। আইনি বিষয় বুঝি না। তবে আমরা সন্তুষ্ট।’ হাওড়ার আমতা হাইস্কুলের শিক্ষিকা নৈঋতা ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা চাকরিহারা। আমাদের মনের যা অবস্থা তাতে যেটুকু আশা দিচ্ছেন, তাতেই সন্তুষ্ট হচ্ছি।’ হুগলির তারকেশ্বরের একটি স্কুলের শিক্ষিকা রুমি বিশ্বাস বলেন, ‘উনি আমাদের খানিকটা আশ্বস্ত করেছেন। দু’মাস স্কুলে যেতে বলেছেন। আমরা তাই করব। পুরো সংবিধান বিরোধী রায় হয়েছে। এছাড়া তো আমাদের কিছু করারও নেই।’
এদিন বিকেলে কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক বৈঠক করে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের একটি সংগঠন। তারা উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ থেকে উদ্ধার করা টেট ওএমআরের মিরর কপির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নিজেদের যোগ্য বলেও দাবি করে। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের জন্য অতিরিক্ত শূন্যপদ (সুপারনিউমেরারি পোস্ট) তৈরি করেছিল রাজ্য সরকার। আজ, মঙ্গলবার সেই সংক্রান্ত মামলার রায় দিতে পারে সুপ্রিম কোর্ট। শিক্ষামহলের আশঙ্কা, আরও একটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে চলেছে সরকার।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ