বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: বাংলায় সন্তান প্রসবের পদ্ধতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন শুরু হল। সুস্থ, নীরোগ ও যথেষ্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় পুষ্ট সন্তানের লক্ষ্যে রাজ্যে শুরু হল নতুন পদ্ধতিতে প্রসব। এই ধরনের ডেলিভারিতে সন্তান প্রসবের সঙ্গে সঙ্গে আম্বিলিক্যাল কর্ড বা নাড়ি ছিন্ন করা হচ্ছে না। ছিন্ন বা ক্ল্যাম্পিং করা হচ্ছে তখনই, যখন গর্ভের ফুল বা প্লাসেন্টা স্বাভাবিক নিয়মে বেরিয়ে আসছে। প্রচলিত পদ্ধতির থেকে অন্তত ৪-৫ মিনিট পর। প্রসবের পর থেকে নাড়ি কাটার আগে পর্যন্ত সন্তানকে ওই অবস্থাতেই মায়ের সংস্পর্শে ও উষ্ণতায় রাখা হচ্ছে।
চিত্তরঞ্জন সেবাসদনে প্রায় ৪০০ প্রসূতির উপর এনিয়ে দীর্ঘ সমীক্ষা হয়েছে। মেডিক্যাল কলেজের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা এখনও পর্যন্ত সিজারিয়ান ও নর্মাল মিলিয়ে নতুন পদ্ধতিতে ৫০টি প্রসব সম্পূর্ণ করেছেন। ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালের চিকিৎসকরা গত চারদিন ধরে এই পদ্ধতিতে প্রসব শুরু করে দিয়েছেন। পিজি হাসপাতালেও একই পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় স্তরের খ্যাতিসম্পন্ন সদ্যোজাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যদপ্তরের উপদেষ্টা ডাঃ অরুণ সিং বলেন, ‘এটিই সহজাত, স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক পদ্ধতি। এতে সদ্যোজাতের শরীরে রক্ত সঞ্চালন বেশি হয়। সে অক্সিজেন বেশি পায়। হার্টের গতি ঠিক থাকে। অনেক বেশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন হয়। আমেরিকান জার্নাল অব পেরিনেটোলজি, ইউরোপিয়ান জার্নাল অব অবস্টেটিকস অ্যান্ড গাইনেকোলজি সহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য জার্নালের সমীক্ষায় তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত।’
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, নাড়ি কিছুক্ষণ বাদে কাটলে ততক্ষণে সন্তান মায়ের শরীর থেকে অন্তত ৮০ মিলিলিটার রক্ত বেশি পায়। বেশি পায় অক্সিজেন এবং পুষ্টিরসও। পাশাপাশি এটাও ঘটনা, সময়ের আগের সন্তান, বাচ্চার শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকলে, সঙ্গে সঙ্গে না কাঁদা শিশু অথবা ব্লু বেবিদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া উচিত নয়। কাদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি মানা হবে, কাদের জন্য নয়, তার সুস্পষ্ট দিগনির্দেশ থাকা উচিত। প্রচলিত পথের পথিক স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দেরি করে নাড়ি কাটলে প্রসূতিদের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে। যদিও এখনও পর্যন্ত একটিও এমন ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন মেডিক্যালের স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ রামপ্রসাদ দে। তাহলে নয়া পদ্ধতিতে প্রসব করা হচ্ছিল না কেন এতদিন? স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানিয়েছেন, প্রাইভেটে সময় আর টাকা সমার্থক। নতুন পদ্ধতি মানলে সিজারে অন্তত ৫-১০ মিনিট বেশি সময় যাবে। ব্যস্ত গাইনেকোলজিস্টদের অত সময় কোথায়!
বিশিষ্ট স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুভাষ বিশ্বাস বলেন, ‘নয়া পদ্ধতিতেই বরাবর প্রসব করে এসেছি। কমবেশি ৩-৫ মিনিট পর নাড়ি কেটেছি। এতে সন্তানের অ্যানিমিয়া হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত কম থাকে। সে সব দিক থেকে প্রচলিত পদ্ধতিতে হওয়া সন্তানদের থেকে বেশি সুস্থ, সবল ও বুদ্ধিমান হয়।’ প্রফেসর ডাঃ নারায়ণ জানা বলেন, ‘নাড়ি যত বেশিক্ষণ সংযুক্ত থাকবে, ততটাই উপকার সন্তানের। তবে এনিয়ে আরও বড় সমীক্ষার দরকার আছে।’ নিজস্ব চিত্র