রাজদীপ গোস্বামী, মেদিনীপুর: ‘অফিসে মিষ্টি ও খাদ্যবস্তু নিয়ে প্রবেশ নিষেধ।’ অফিস বলতে মেদিনীপুরের বিধায়ক শংকর গুছাইতের কার্যালয়। ঢোকার মুখে একটি পোস্টার সাঁটানো। তাতে বড়ো বড়ো হরফে লেখা এই কয়েকটি কথা। কিন্তু, বিধায়কের কার্যালয়ে এমন সতর্কবার্তা কেন? পালাবদলের পর বিজেপি বিধায়কদের মনজয় করতে নানা মহল থেকেই চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ঠিকাদার থেকে ব্যবসায়ীরা অনবরত আসছেন। নতুন বিধায়কের সঙ্গে দেখা করছেন। সঙ্গে কিছু সুপারিশও। তবে, খালি হাতে কি আর দেখা করা যায়? মূলত, এমন ভাবনা থেকেই প্যাকেট প্যাকেট মিষ্টি, ইলিশ মাছ, কচি পাঁঠার মাংস নিয়ে বিধায়কের দরবারে হাজির হচ্ছেন। এমন ‘ভালোবাসা’র ঠেলায় অতিষ্ঠ শংকর। তাই, তিনি কার্যালয়ে ঢোকার মুখে সাঁটিয়ে দিয়েছেন সতর্কীকরণ বার্তা। আসলে, বিধায়ক আন্তরিকভাবেই চান না, পূর্বতন জমানার সংস্কৃতি পরিবর্তনের পরও বহাল থাকুক।
বিধায়কের কার্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোটে ল্যান্ড স্লাইড ভিকট্রির পর বহু মানুষ শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন। সবার হাতেই ছিল মিষ্টির প্যাকেট। সময়ের সঙ্গে উপহারের উপকরণও বদলাতে থাকে। তালিকায় ঠাঁই পায় বড়ো সাইজের ইলিশ, পাঁঠার মাংসসহ একাধিক খাদ্যসামগ্রী। অভিযোগ, এইসব উপঢৌকন বিধায়কের হাতে তুলে দেওয়ার পরই বিভিন্ন কাজের সুপারিশ পেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। তা নিয়ে রীতিমতো বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে শংকরকে।
বিষয়টি মানছেন বিধায়কের কার্যালয়ের ডিজিটাল ডেস্কের দায়িত্বে থাকা অপরূপ বকশি ও সৌমেন পয়ড়্যা। দুজনেই ঘরোয়া আলাপচারিতায় বলছিলেন,‘বিধায়ক কার্যালয়ে বহু লোক নানা খাদ্য সামগ্রী নিয়ে আসছেন। বারণ করলেও কেউই শুনছেন না। সেগুলি দিয়ে যে যার স্বার্থে সুপারিশের আরজি রাখছেন। এতে জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। তাই এখন কেউ মিষ্টিসহ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী নিয়ে এলে সোজা বাড়ির পথ দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’
জেলার অন্যান্য বিধায়ক কার্যালয়েও একই ছবি। এমনই এক কার্যালয়ের কর্মীর কথায়, ‘ভোটে জয়ের পর থেকে শুভেচ্ছাবার্তার সঙ্গে মিষ্টির প্যাকেট আসছিল। সেটা তাও মেনে নেওয়া যায়। পরে দেখছি কেউ দু-হাজার টাকা কেজি দরের ইলিশ, খাসির মাংস, বিদেশি বিস্কুট, বাজারের বাছাই করা চিংড়ি নিয়ে আসছেন!’ প্রবীণ জেলাবাসীদের অনেকেই মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বাম জমানায় বিধায়কদের কার্যালয়ে এভাবে মিষ্টি, মাছ, মাংস, ড্রাইফ্রুটস নিয়ে ঢোকার সাহস কেউই দেখাতেন না। তা বলে কি আর ঠিকাদার, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁদের সখ্য ছিল না? ব্যতিক্রম যে একেবারেই ছিল না তা নয়। বিধায়কদের কার্যালয়ে উপঢৌকন সংস্কৃতির চল তৃণমূল জমানা থেকেই। সেটাই এবার ভাঙতে চাইছেন মেদিনীপুরের বিধায়ক শংকর। তিনি বলছিলেন, ‘আমার কাজ মানুষকে পরিষেবা দেওয়া। বিনিময়ে চাই আশীর্বাদ। কার্যালয়ে কেউ মিষ্টির প্যাকেট বা খাদ্যসামগ্রী নিয়ে এলে প্রচণ্ড অস্বস্তিবোধ করি।’ শালবনির বিধায়ক বিমান মাহাতও বলছিলেন,‘আমার কার্যালয়েও অনেকে খাবার-দাবার নিয়ে আসছেন। তাঁদের পাত্তা দিচ্ছি না। এসব বরদাস্ত করা হবে না।’