নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর: দীপাবলির সন্ধ্যায় গোটা শহর আলোয় ভরে উঠলেও, বহরমপুরের দয়াময়ী কালীমন্দির থাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন। মন্দিরের বহিরাংশের চৌহদ্দিতে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও মূল গর্ভগৃহে এখনও মোমবাতির আলোতেই আরাধনা হয় দেবীর। মুর্শিদাবাদ জেলার সদর শহর বহরমপুরের সৈদাবাদে অবস্থিত দয়াময়ী কালীমন্দির। প্রাচীন সৈদাবাদের মধ্যে ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণেন্দু হোতা প্রতিষ্ঠা করেন শিবমন্দির বেষ্টিত এই কালীমন্দির। এই মন্দিরের গর্ভগৃহে বিদ্যুৎ নেই। মোমবাতি ও প্রদীপের আলো জ্বেলেই পুজো চলে সারা বছর। কালীপুজোতে মায়ের প্রসাদে দেওয়া হয় মাছ ও অন্নভোগ।
জানা গিয়েছে, যখন গ্রামেগঞ্জে বিদ্যুৎ পরিষেবা চালু হল, তখন দয়াময়ী কালীবাড়ির পক্ষ থেকেও মূল মন্দিরে বিদ্যুৎ সংযোগের পাকাপাকি ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু সে সময়ে মন্দিরের তৎকালীন সেবাইত স্বপ্নাদেশ পেলেন, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার। না হলে অনর্থ হবে। তারপর থেকে আর কোনও ভাবেই বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা যায়নি। এরপর থেকে সারাবছরই দিনের আলো নিভলে প্রদীপ কিংবা মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় মায়ের সামনে। এমনকী বিশেষ তিথিগুলিতেও মায়ের মন্দির আলোকিত হয় কেবলমাত্র বড় বড় মোমবাতির আলোতেই। পাঁচ-ছয় ফুট লম্বা মোমবাতি জ্বালানো হয় দেবীর সামনে।
মুর্শিদাবাদ জেলার অন্যতম বৃহত্তম চারচালা মন্দির বলে অনেকে মনে করেন এই কালীমন্দিরকে। প্রায় ৪০ ফুট উঁচু এই মন্দিরে প্রবেশপথের সামনের দিকে পোড়ামাটি ও চুন-বালির দু’টি উপাদানের অলংকরণ রয়েছে। টেরাকোটার কাজের অপরূপ সৌন্দর্য এই মন্দিরকে পৃথক করে তুলেছে। মন্দিরের দেওয়ালে ও পিলারের নকশায় পৌরাণিক দেবদেবী, দশাবতার, লঙ্কাযুদ্ধ ও ফুলবাড়ি নকশা আছে। এই মন্দির গড়ে উঠেছে একটি প্রাচীরবেষ্টিত অঙ্গনের মধ্যে বেশ কতগুলি মন্দির নিয়ে। প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার দক্ষিণমুখী এই মন্দির, বঙ্গের জোড়বাংলা স্থাপত্যের আদলে গড়ে উঠেছে। এই মন্দিরের বহিরাংশের থাম, খিলান, মাঝখানের দেওয়াল সহ প্রায় প্রতিটি অংশই টেরাকোটার কাজে সমৃদ্ধ। এছাড়া মন্দিরের ভেতরের দেওয়ালেও রয়েছে নানানরকম ফুলপাতার নকশা। মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশের পরই চোখে পড়ে পুব মুখে ছ’টি, পশ্চিমে ছ’টি এবং উত্তরে একটি-সহ মোট ১৩টি শিবমন্দির। এছাড়াও এই মন্দির চত্বরের পশ্চিম দিকে রয়েছে একচূড়া বিশিষ্ট রাম-সীতা, রাধাকৃষ্ণ, অন্নপূর্ণা, অর্ধনারীশ্বর এবং গ্রহরাজের মন্দির। এই সমস্ত মন্দিরেরই বেশ কয়েকবার সংস্করণ করা হয়েছে। ফলে টেরাকোটার পুরনো কারুকাজগুলি মূল মন্দির ছাড়া আর বাকি কোনও মন্দিরেই চোখে পড়ার জো নেই।
মন্দিরের এক সেবাইত বলেন, সাধারণত শনি, মঙ্গলবার ভক্তের সমাগম হলেও এ মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষ্যে বৈশাখ মাসে বিরাট উৎসব পালন করা হয়। সঙ্গে বিখ্যাত দীপান্বিতা কালীপুজো এবং পৌষকালীর উৎসবে মানুষের জোয়ার নামে।
এখানে ভোগ হিসেবে মা’কে মাছ নিবেদন করার চল আছে। কালীপুজো উপলক্ষ্যে মন্দিরকে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে। রীতি মেনেই শুধু মোমের আলোতেই পুজো করা হবে। দূর দুরান্ত থেকে পুণ্যার্থীরা এখানে আসেন এবং পরদিন মায়ের ভোগ গ্রহণ করেন। -নিজস্ব চিত্র