শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: ভিড়ে ঠাসা লোকাল ট্রেনের কামরায় বাদুড়ঝোলা হয়ে যাতায়াত নিত্যদিনের ছবি। অধিকাংশ দিনই ট্রেন চলে না সময়মতো। চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় নিত্যযাত্রীদের। কিন্তু এসব সমস্যা যেন রেল কর্তৃপক্ষের কাছে ‘অপ্রাসঙ্গিক’! সোমবার রাতে হাবড়া স্টেশনে রেলের উচ্ছেদ অভিযানে ভাঙা দোকানের ধ্বংসস্তূপ থেকে অসহায় মানুষের কান্নার শব্দ শোনা গেল। আর মঙ্গলবার স্থানীয়দের একটাই প্রশ্ন বড়ো হয়ে দেখা দিল— ট্রেনের অনিয়ম বা যাত্রীদের সমস্যা দেখার সময় নেই, কিন্তু গরিবের পেটে লাথি মারার বেলাতেই কি ডবল ইঞ্জিনের সব তৎপরতা?
সোমবার রাতের অন্ধকারে হাবড়া স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় হঠাৎই নামে রেলের বুলডোজার। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে পসরা সাজিয়ে ব্যবসা করতেন কয়েকশো মানুষ। চোখের নিমেষে গুঁড়িয়ে যায় তাদের রুজি-রোজগারের সম্বল। চারিদিকে এখন ধংসস্তূপ।
ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন সামগ্রী। খাঁ খাঁ করছে স্টেশনের চারপাশ। এই গরমে পানীয় জল পাওয়াও মুশকিল স্টেশনের আশপাশে। বেলাগাম উচ্ছেদের পর ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ ও হতাশা ফুটে বেরচ্ছে। তেমনই একজন সুবল সাহা। তিনি বলছিলেন, ‘ট্রেন সময়ে আসে না। ভিড়ে মানুষের দমবন্ধ হয়ে আসে। সেসব রেল দেখতে পায় না। আমাদের দোকানগুলিই কি তবে রেলের উন্নয়নের পথে একমাত্র কাঁটা? গরিবের পেটে লাথি মারাটাই কি উন্নয়নের একমাত্র লক্ষ্য?’ এভাবে একের পর এক স্টেশনে উচ্ছেদের কারণে যত মানুষ উপার্জন হারাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অপরাধ জগতে নাম লেখালে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই বলে মন্তব্য করলেন এক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী। আরেক ব্যবসায়ী রাজা সাহা বলছেন, ‘বনগাঁ লাইনে ট্রেনের ভিড় সম্পর্কে সবাই জানে। সেদিকে রেলের নজর নেই। যত চাপ আমাদের উপর। এটাই তাহলে ডবল ইঞ্জিনের স্বাদ?’ প্রবীণ বিক্রেতা আনন্দ দাস বললেন, ‘কী আর করা যাবে? সব শেষ।’ এরপরেই তাঁর সংযোজন, ‘রাতে দূরপাল্লার ট্রেন থেকে নেমে কোনো যাত্রী অসুস্থ হলে বা বিপদে পড়লে আমরাই ছিলাম ভরসা। রাতে যাত্রীদের সমস্যা হলে তো আমরাই থাকতাম। আজ এই জায়গাটা খালি করে দিয়ে কাল রাতে কোনো মানুষ বিপদে পড়লে কী হবে?’
এই উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের আঁচও লেগেছে। ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, বিজেপি শাসিত সরকার তৃণমূলকে ‘ওয়ার্নিং’ দিয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, তৃণমূল নয় এই ‘ওয়ার্নিং’ আসলে এই অসহায় মানুষগুলির জন্যই ছিল! মঙ্গলবার সকালে হাবড়া স্টেশন সংলগ্ন এলাকার চেহারা কার্যত পরিত্যক্ত জমির। ভাঙা টিন, কাঠের টুকরো আর ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়েছে শত শত মানুষের বেঁচে থাকার রসদ। নিত্যাযাত্রীদের দীর্ঘদিনের পরিচিত দোকানগুলির আর কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই প্রশ্ন উঠছে, উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ কি আদৌ কোনো সুরাহা করবে? নাকি কেবলই বাড়বে বেকারত্ব? উত্তর খুঁজছে হাবড়া।