নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানিয়েছেন, যে উদ্দেশ্যে ব্যাংক জাতীয়করণ করা হয়েছিল, তা সাধিত হয়নি। পাশাপাশি ব্যাংক বেসরকারিকরণের পক্ষে সওয়াল করে তিনি বলেছেন, ব্যাংক বেসরকারিকরণ মানেই দেশের সামগ্রিক আর্থিক বিকাশ বন্ধ হয়ে যাবে, এমন মতামত দেওয়া হয়। কিন্তু তার কোনও সারবত্তা নেই। যে কোনও ব্যাংকের দক্ষ পরিচালন পর্ষদ সব কাজই সুষ্ঠুভাবে করতে পারে।
অর্থমন্ত্রীর ওই মতামতের তীব্র সমালোচনা করেছে ব্যাংককর্মী ও অফিসারদের সংগঠনগুলি। তাদের বক্তব্য, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলির মাধ্যমেই দেশের প্রত্যন্ত মানুষের কাছে পৌঁছেছে ব্যাংক। মিলেছে সুষ্ঠু পরিষেবা। অন্যদিকে কর্পোরেট সংস্থার ঋণ শোধ না করার চাপও সহ্য করতে হয়েছে এই ব্যাংকগুলিকে। ব্যাংক বেসরকারিকরণের পথ আরও প্রশস্ত করতেই কেন্দ্রীয় সরকার এমন অদ্ভুত যুক্তি খাড়া করেছে, দাবি তাঁদের।
অল ইন্ডিয়া ব্যাংক অফিসার্স কনফেডারেশনের রাজ্য সম্পাদক শুভজ্যোতি চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, যখন ব্যাংক জাতীয়করণ করা হয়, তখন যে রাজনৈতিক দল সংসদে বিরোধিতা করেছিল, তারাই এখন ক্ষমতায়। তাদের থেকে এটাই কাঙ্খিত। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভুমিকা অস্বীকার করা যাবে না। মজার বিষয়, যখন কোনও বেসরকারি ব্যাংক বিপদে পড়েছে, তাকে উদ্ধার করার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিকেই এগিয়ে আসতে হচ্ছে কেন্দ্রের নির্দেশে। কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে এবং ব্যাংক বেসরকারিকরণের বিরোধিতায় আমরা রাস্তায় নামব।
অল ইন্ডিয়া ব্যাংক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি রাজেন নাগরের কথায়, কৃষি এবং এমএসএমই শিল্পক্ষেত্রে আর্থিক জোগানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলি যে মূল চালিকাশক্তি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও এই ব্যাংকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বেসরকারি ব্যাংকগুলি দেশের প্রান্তিক মানুষের স্বার্থে কী ভূমিকা নিয়েছে? বুধবার জয়পুরে কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ব্যাংক বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আন্দোলনে নামব আমরা।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তাঁকে প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছে ‘ব্যাংক বাঁচাও দেশ বাঁচাও’ মঞ্চ। তাদের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকার বারবার চেষ্টা চালিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিকে কমজোরি করতে। কিন্তু তারপরও মোট আমানত ও ঋণের ৬০ শতাংশই দখলে রেখেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলি। গ্রামগুলিতে যে ব্যাংকিং পরিষেবা মিলছে, তার ৯০ শতাংশই দিচ্ছে এই ব্যাংকগুলিই। ৫৩ কোটিরও বেশি জনধন অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিতে। তার ৩১ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে খোলা হয়েছে। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী জীবন জ্যোতি বিমা যোজনা, প্রধানমন্ত্রী মুদ্রা যোজনার মতো সরকারি প্রকল্পগুলিরও মূল কান্ডারি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, দাবি ওই মঞ্চের। সংগঠনটির দাবি, নরেন্দ্র মোদির আমলে ২০১৫-’১৬ থেকে ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলি ১৬ লক্ষ ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ তাদের হিসেবের খাতা থেকে ছেঁটে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলি ছেঁটেছে প্রায় ১২ লক্ষ ৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ। আশ্চর্যের বিষয়, যে ঋণ ছাঁটাই করা হয়েছে, তার মধ্যে বড় কর্পোরেট সংস্থার অংশ ৯ লক্ষ ২৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অতি ক্ষমতা সম্পন্ন কর্পোরেটরাই ঋণ পরিশোধ না করার সাহস দেখিয়েছে। মোদ্দা কথা, মোদি সরকারের আমলে শিল্পজগতের যে রাঘববোয়ালরা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে, তা পরিশোধ না করার সুযোগ পেয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এক ব্যাংককর্তার কথায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিকে কর্পোরেট সংস্থাগুলির আর্থিক ঝুলি ভরাতে এক প্রকার বাধ্য করা হয়েছে। এরপরও যদি সরকারপক্ষ দাবি করে তাদের অভিষ্ট পূরণ হয়নি, তাহলে তার চেয়ে হাস্যকর আর কিছু হতে পারে না।