Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

পুলিসের হাতেই পুলিস খুন! মহানগরে আতঙ্কের বর্ষবরণ, তরুণীর মর্যাদা এবং নিথর বাপি সেন

হিন্দ সিনেমার সামনে ট্রামলাইনের জাল বিছানো রাস্তা। ২০০২ সালের ৩১ ডিসেম্বর। বর্ষবরণের রাত। আর বাপি সেন। কলকাতা পুলিসের ট্রাফিক সার্জেন্ট।

পুলিসের হাতেই পুলিস খুন! মহানগরে আতঙ্কের বর্ষবরণ, তরুণীর মর্যাদা এবং নিথর বাপি সেন
  • ২৫ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিন্দ সিনেমার সামনে ট্রামলাইনের জাল বিছানো রাস্তা। ২০০২ সালের ৩১ ডিসেম্বর। বর্ষবরণের রাত। আর বাপি সেন। কলকাতা পুলিসের ট্রাফিক সার্জেন্ট। বেরিয়েছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। লাল মারুতিটা পার্ক করা ছিল রাসেল স্ট্রিটে। নতুন বছরে পা দিয়ে সাড়ে ১২টা নাগাদ বাড়ি ফিরছিলেন তাঁরা। পার্ক স্ট্রিটে ভালোরকম যানজট। বাপি বন্ধুদের বললেন, ‘ওয়েলিংটন হয়ে স্ট্র্যান্ড রোড ধরে দক্ষিণে ঢোকাই ভালো।’ বাপির বাড়ি পর্ণশ্রীতে। ওয়েলিংটনের কাছে আসতেই বাপির চোখে পড়ল, কী যেন একটা হচ্ছে! গাড়ি চালাচ্ছিলেন অশোক। চোখ কুঁচকে বাপি বললেন, ‘এগিয়ে দাঁড় করা তো!’ বলেই গাড়ি থেকে নামলেন দীর্ঘকায় চেহারার সিভিল ড্রেসের পুলিস। রাস্তার মাঝে একটা ট্যাক্সি দাঁড় করানো। সামনে একটা বাইক। ট্যাক্সির পাঁচ ব্যক্তি বাইকের এক মহিলাকে ঘিরে ধরেছে। চলছে কটূক্তি। ‘অবাঞ্ছিত স্পর্শ’। বাইক চালক ছেলেটিকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল কটূক্তিকারীরা। এক ঝটকায় গণ্ডগোলের সার্কলটার মধ্যে ঢুকে পড়লেন বাপি। পাঁচ ‘দুষ্কৃতী’ আরও তেড়েফুঁড়ে উঠল। মুহূর্তে ঘুসি-লাথি আছড়ে পড়ল বাপি সেনের উপর। প্রত্যাঘাত করলেন তিনিও। তার মধ্যেই দিলেন নিজের পরিচয়... ‘আমি বাপি সেন। টালিগঞ্জ ট্রাফিক গার্ডে সার্জেন্ট।’ ছিটকে এল অশ্লীল গালাগাল। সঙ্গে চাবুকের মতো জবাব, ‘আমরাও পুলিস।’ আর আঘাত। ট্রামলাইনের উপর লুটিয়ে পড়লেন বাপি। তখনও মারের চোট কমল না। উন্মত্তের মতো চলছে মার। বাপির বন্ধুরা ছুটে এসেছেন। গৌতম, অশোক, কানাই, নাজিবুল... প্রত্যেকেই। পাল্টা মারের দাপট প্রচণ্ড। বাপি সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছেন ট্রামলাইনের উপর। লোক বাড়ছে দেখেই ট্যাক্সিতে চেপে চম্পট পাঁচজনের। আর সেই বাইক? নেই। সঙ্গিনীকে পিছনে বসিয়ে ওই মারধরের মাঝেই উধাও। 

Advertisement

বাপিকে তুলেই বন্ধুরা মারুতি ছোটালেন মেডিক্যাল কলেজের দিকে। কানাই ট্যাক্সির নম্বরটি লিখে রেখেছিলেন। কিন্তু বাইকের নম্বর নিলেন না? নেবেন কীভাবে? কখন বাইকটা উধাও হয়ে গিয়েছে, বুঝতেই পারেননি বন্ধুরা। আসলে, সেদিকে নজর দেওয়ার মতো অবস্থাই যে ছিল না। প্রত্যেকের উদ্বেগ কেন্দ্রীভূত ছিল বাপির উপর।
মেডিক্যাল কলেজ থেকে খিদিরপুর এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতাল। আর তারপর সেখানেই মৃত্যু। ৬ জানুয়ারি। মৃত্যু? না... স্রেফ খুন। ট্যাক্সির নম্বর থেকে ঠিকুজি বের হল চালকের। দ্বারভাঙার বাসিন্দা। নাম মধুকান্ত। আগে ট্যাক্সির হদিশ চাই। তল্লাশিতে নামল পুলিস। পাওয়া গেল ট্যাক্সিটা। বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিটে। ট্যাক্সিতেই শুয়ে ছিলেন মধুকান্ত। গড়গড় করে বলে দিলেন অভিযুক্তদের নাম। পাঁচজন। আর পাঁচজনই পুলিস! মধুসূদন চক্রবর্তী, শ্রীদাম বাউরি, পীযূষ গোস্বামী ওরফে গোপাল, শেখরভূষণ গুপ্ত ওরফে ভোলা ও শেখ মুজিবর রহমান। প্রত্যেকেই পুলিস। কলকাতা পুলিসের রিজার্ভ ফোর্সের কনস্টেবল। কোথায় তারা? সামনের বাড়িটার দিকে তাকালেন মধুকান্ত। মেসবাড়ি। অভিযুক্তদের। হানা দিল পুলিস। গ্রেপ্তার মধুসূদন, পীযূষ। কিন্তু পাওয়া গেল না শ্রীদাম, শেখর, আর মুজিবরকে। তারা পরে এসে আত্মসমর্পণ করল আদালতে। কিন্তু তদন্ত কীভাবে হবে? ‘আই উইটনেস’ই তো নেই! তাও কোমর বেঁধে নামল লালবাজার। যাঁর মর্যাদা রক্ষায় বাপি সেনের প্রাণ গেল, তিনি কোথায়? সেকালে সিসি ক্যামেরা মোড়া রাস্তা ছিল না। কলকাতার তত্কালীন পুলিস কমিশনার সুজয় চক্রবর্তী খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেন। এগিয়ে আসতে বললেন শ্লীলতাহানির শিকার সেই মহিলাকে। কারণ, তিনি নেই। কোথাও নেই। নিরুদ্দেশে। লাভ হল না। দেখা দিলেন না ‘নির্যাতিতা’। বাপি সেন খুনের সাক্ষী। 
(চলবে)

সম্পর্কিত সংবাদ