Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কেন্দ্রীয় বঞ্চনায় নয়া সংযোজন

কেন্দ্রীয় তহবিলের বাস্তবে নিজস্ব উৎস কিছু নেই। তার বিপুল রাজস্ব, সহায়-সম্পদ রাজ্যগুলি থেকেই সংগৃহীত। অর্থাৎ রাজ্যগুলির বলেই বলীয়ান কেন্দ্র।

কেন্দ্রীয় বঞ্চনায় নয়া সংযোজন
  • ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কেন্দ্রীয় তহবিলের বাস্তবে নিজস্ব উৎস কিছু নেই। তার বিপুল রাজস্ব, সহায়-সম্পদ রাজ্যগুলি থেকেই সংগৃহীত। অর্থাৎ রাজ্যগুলির বলেই বলীয়ান কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দেশের প্রয়োজনে ওই অর্থ কেন্দ্র এবং রাজ্যগুলির মধ্যে ভাগাভাগি করেই খরচ করার কথা। অর্থবণ্টনের সূত্র সংবিধানেই বলা রয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সূত্র মানে না, কথার খেলাপ এবং গাজোয়ারি করে। তাতে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাই দুর্বল হয় এবং অর্থ হারায় বহুলাংশে। যেমন জিএসটি ছাড়াও নানাবিধ সেসের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা পশ্চিমবঙ্গ থেকে তুলে নিয়ে যায় কেন্দ্রীয় সরকার। সেই তালিকায় উল্লেখযোগ্য একটি হল পেট্রপণ্য বাবদ সেস। এই সূত্রে প্রতিবছর বাংলা থেকে প্রায় আট থেকে নয় হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় কোষাগারে ঢোকে। সেই টাকার ৯০ শতাংশই এরাজ্যের ফেরত পাওয়ার কথা। বাংলাকে তা ফেরানোর মাধ্যম হল সড়ক পরিকাঠামো উন্নয়ন খাত। কিন্তু কেন্দ্রীয় তথ্যে পরিষ্কার, এক্ষেত্রে খেলাপির নাম মোদি সরকার। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দুবছর যাবৎ এই খাতে নতুন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ স্রেফ শূন্য (০)! ন্যায্য প্রাপ্য থেকে লাগাতার বঞ্চিতই করা হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলাকে। অথচ, একই সময়কালে দেশের তিনটি প্রধান ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্যের জন্য যাকে বলে দরাজ হস্ত মোদি-শাহের সরকার। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সেন্ট্রাল রোড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড বা কেন্দ্রীয় সড়ক পরিকাঠামো তহবিল (সিআরআইএফ) থেকে ইউপি, রাজস্থান ও গুজরাতকে বরাদ্দ করা হয়েছে ৫,২৬৮ কোটি টাকার বেশি। খেয়াল করার মতো বিষয় হল, সিআরআইএফ থেকে বাংলার জন্য শেষবার বরাদ্দ হয়েছিল ২০২২-২৩ সালে। তার পরিমাণ ৯৯৭ কোটি টাকা। বর্ধমানের শিল্পসেতুর জন্য ২০২৪ সালের নভেম্বরে ৩৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রের রিপোর্টে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের জন্য তার কোনও উল্লেখই নেই। মোদি সরকার সজ্ঞানে চোখ বুজে থাকলেও মা-মাটি-মানুষের সরকারের পক্ষে যে তা মানায় না। এই সরকার টানা তিনবার তৈরিই হয়েছে বাংলার সার্বিক উন্নয়নকেই সামনে রেখে। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতি এবং প্রশাসনের ইউএসপি হল কথা দিয়ে

Advertisement

কথা রাখা। কোনোরকম খেলাপ এই সরকারের ট্র্যাডিশন নয়। তাই সীমিত আর্থিক ক্ষমতার মধ্যেও গঙ্গাসাগর সেতু নির্মাণ এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা সম্প্রসারণের কাজের দায়িত্ব নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছে নবান্ন। বেনজির বঞ্চনা রাজ্য প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও মেনে নিতে পারছেন না। নবান্নের কর্তারা বলছেন,  ইউপি, গুজরাত এবং রাজস্থানকে যখন পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে, ঠিক সেইসময় রাজ্যের তরফেও একাধিক প্রকল্পে সিআরআইএফ থেকে অর্থ বরাদ্দের অনুরোধ গিয়েছিল। কিন্তু, কেন্দ্রের একটাই অজুহাত—‘ফান্ডের হাল অত্যন্ত খারাপ।’ এখানেই প্রশ্ন, তাহলে বিপুল অর্থ যাচ্ছে কোথায়? কেন্দ্রের রিপোর্ট বলছে, গত দুবছরে একাধিক রাজ্যের ক্ষেত্রে এই খাতে বরাদ্দ বন্ধ হওয়া দূর, বরং তা বেড়েছে! বরাদ্দ আগের তুলনায় ব্যাপক হারেই বেড়েছে ইউপি, গুজরাত এবং রাজস্থানের মতো ডবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলির বেলা। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ওই তিন রাজ্যের জন্য বরাদ্দ ছিল ২,২৭৬ কোটি, অঙ্কটা আরো বেড়ে ২,৯৯২ কোটি টাকা হয়েছে ২০২৫-২৬ সালে।

অর্থাৎ এটা কেন্দ্রীয় বঞ্চনায় অবশ্যই নয়া সংযোজন, বাংলার বঞ্চনা বৃদ্ধির আরো একটি দৃষ্টান্ত। একশো দিনের কাজ, আবাস যোজনাসহ একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পে বাংলা ধারাবাহিকভাবে বঞ্চনা, বৈষম্যের শিকার। মোদিবাবুদের প্রতিহিংসার রাজনীতিতে এযাবৎ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলার লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষ। একদিকে তাদের প্রাপ্য বিপুল সংখ্যক শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে নিজগৃহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে দারিদ্র্যসীমার নীচের (বিপিএল) অসংখ্য পরিবার। কী শীত, কী গ্রীষ্ম তাদের কাটছে ভাঙা ঘরে কিংবা খোলা আকাশের নীচে। কেন্দ্রের সরকার বাহাদুর সেখানে চেনা এক কিল মারার গোঁসাইয়ের ভূমিকায়। কেন্দ্রীয় সড়ক পরিকাঠামো তহবিল নিয়ে মোদিবাবুদের এই অনাচার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্য প্রশাসনের পক্ষে মুখ বুজে সহ্য করা অসম্ভব। বাংলার ন্যায্য প্রাপ্য দিল্লি থেকে ছিনিয়ে আনতে এক্ষেত্রেও লড়াইয়ে নামবে নবান্ন। তারা সেই নতুন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে বলেই খবর। সত্যিই তো, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র যখন একচক্ষু কিংবা নির্বিকার, তখন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে লড়াই সংগ্রামই একমাত্র বিকল্প। এটাই সাংবিধানিক পথ। সাধারণতন্ত্রের পতাকা উঁচু রাখতে এই লড়াই জরুরি। দেশের প্রতিটি নির্বাচিত রাজ্য সরকারের উচিত, এই প্রশ্নে বাংলার পাশে দাঁড়ানো। কারণ দিল্লি যখন একনায়কের মতোই মাথা তুলতে প্রয়াসী হয় তখন বঞ্চনা, বৈষম্যের আঁচ কোনো একটিমাত্র রাজ্যের গায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা অন্যদেরও দগ্ধ করতে পারে—আজ না-হোক কাল।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ