Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

নবদ্বীপে দুঃস্থদের খাওয়ানো চলছে আজও

নবদ্বীপে দুঃস্থদের খাওয়ানো চলছে আজও
  • ১০ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
সংবাদদাতা, মায়াপুর: নবদ্বীপ রেলওয়ে রিক্রিয়েশন ক্লাবের মাঠের এক কোণে বকুল গাছের ছায়ায় লাইন দিয়ে বসে খাচ্ছেন অনেক ভবঘুরে, নিরাশ্রয়, সহায় সম্বলহীন মানুষ। কেউ অসুস্থ, কেউবা শারীরিক প্রতিবন্ধী, কারও আবার মাথার ওপর ছাদটুকুও নেই। লকডাউনের সময় থেকে এইসব অসহায় মানুষগুলোর কথা ভেবে এগিয়ে আসেন কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা, পেশায় চরমাজদিয়া ডাকঘরের পোস্টমাস্টার রাজু পাত্র। নবদ্বীপ মুখ্য ডাকঘরের প্রাক্তন ক্যান্টিনকর্মী সঞ্জয় দে-কে সঙ্গে নিয়ে নিজ উদ্যোগে এদের মুখে প্রতিদিন দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়া শুরু করেন। রাজুবাবু জানান, করোনার সময় এই মানুষগুলো কী খাবে সেই চিন্তা থেকেই প্রথম শুরু। ভেবেছিলাম, করোনা মিটে গেলে বন্ধ করে দেব। কিন্তু সেই থেকে এখনও চলছে। তারপর থেকে অনেক সহৃদয় মানুষ জানতে পেরে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। একেক দিন এক একজন পালা করে তাঁদের খাওয়ান।
Advertisement
এর জন্য সর্বনিম্ন ১৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। সেই মতো নিরামিষ সবজি-ভাত থেকে ডিম-ভাত, মাছ-ভাত বা মাংস-ভাত সবরকম খাবারের মেনু ঠিক করা আছে। রাজুবাবু নিজে সবসময় এখানে আসতে না পারেন না। তাঁকে এই কাজে সহায়তা করেন নবদ্বীপের সঞ্জয়বাবু। দেয়ারাপাড়া ঘাট রোডের বাসিন্দা সঞ্জয়বাবু জানালেন, বিগত ৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে খাওয়ানো চলছে। আমার বাড়ির লোকজনই রান্না করেন। তারপর সেই খাবার ট্রলিতে চাপিয়ে এখানে এনে দেওয়া হয়। প্রত্যেকদিন ১০০ জনের খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। পাশেই দাঁড়িয়ে খাবার বিতরণ করছিলেন কৃষ্ণনগরের বাসিন্দা সুস্মিতা দত্ত ঘোষ। আজ তাঁর পালা। তিনি বলেন, এঁদের এই উদ্যোগের কথা জানতে পারি লকডাউনের সময়। তখন থেকেই আমি এঁদের সঙ্গে যুক্ত। বছরে ৩ বার এখানে খাওয়াই। আজ আমার বাবার বাৎসরিক কাজ। তাই মাছ ভাত খাওয়াচ্ছি। আবার খাওয়াব ছেলের জন্মদিনে। এই অসহায় মানুষগুলোর মুখে খাবার তুলে দিতে পেরে ভীষণ আনন্দ লাগে। সেই জন্যই কৃষ্ণনগর থেকে এখানে আসা।
মাঠে সকলের সঙ্গে বসে খাচ্ছিলেন দাঁইহাটের যুবক মুকুল চক্রবর্তী। তিনি বলেন, প্যারালাইসিস হয়ে যাওয়ায় কাজ করতে পারি না। বাড়িতে বলে দিয়েছে, বসিয়ে খাওয়াতে পারবে না। তারপর থেকে নবদ্বীপ ধাম স্টেশনেই থাকি। আগে জানতাম না এখানে খাওয়ানো হয়। অনেকের কাছে জানতে পেরে ১০-১২ দিন হল এখানে খাচ্ছি। প্রায় একই অবস্থা নবদ্বীপের তেঘড়িপাড়া ষষ্ঠীতলার বাসিন্দা বছর সত্তরের বিনোদ দেবনাথেরও। বাড়িতে তাঁর স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ সকলেই আছেন। বললেন, ছেলেদের আর কী দোষ দেব? আমার বউই আমাকে দেখে না। রেললাইনের পাশের ঝুপড়িতে থাকা অশীতিপর বৃদ্ধা গীতা সরকার বলেন, প্রায় দু’বছর হল এখানে খাচ্ছি। আগে লোকের বাড়িতে রান্নার কাজ করতাম। অসুস্থ হওয়ায় কাজ চলে যায়। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে কোনওরকমে দিন চলছে। মাঝে মধ্যে ভিক্ষাও করি। এখন তাড়াতাড়ি ওপরে চলে যেতে পারলে বাঁচি। রাজুবাবু আরও বলেন, আমাদের কোনও সংগঠন নেই। আমি শুধু মনিটরিং করলেও এক্ষেত্রে সঞ্জয়ের অবদান অনেক বেশি। বিগত ৪ বছর ১০৮ দিনের মধ্যে একটা দিনও বাদ যায়নি। এর আগে ১০০০ দিন পূর্ণ হওয়ায় আমরা নবদ্বীপ শহরে এক রক্তদান কর্মসূচিও করেছিলাম। এছাড়া কৃষ্ণনগরেও রেললাইনের পাশের বস্তিতে সপ্তাহে একদিন ১৫০ বাচ্চাকে আমরা খাওয়াই। সঞ্জয়বাবুর আক্ষেপ, আগে আরও অনেক মানুষ আমাদের সাহায্য করতেন। ধীরে ধীরে তাঁদের অনেকেই আর এখানে আসেন না। যদি আরও অনেকে এগিয়ে আসেন তাহলে খুবই উপকার হয়।
সম্পর্কিত সংবাদ