


ব্রতীন দাস, রাজগঞ্জ: ৪০ শতাংশ কমিশন না দিলে বিল পেমেন্ট হত না। রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে এমনই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ করলেন স্থানীয় ঠিকাদাররা। সেইসঙ্গে প্রশান্ত পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হতেই তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলল রাজগঞ্জের মানুষ।
শুধু সরকারি প্রকল্পের কাজে দুর্নীতি নয়, বালি মাফিয়াদের সঙ্গেও প্রশান্তর আঁতাতের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, কারবারিরা ঠিকমতো ‘ভাগ’ না দিলে প্রশান্ত বর্মন নিজেই রাত-বিরেতে বালির ট্রাক ও ডাম্পার ধরতে হানা দিতেন। ডাম্পার চালককে পাকড়াও করে মারধর করতেন। এসব করে নিজেকে ‘দাবাং’ বিডিও হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও আসলে এর পিছনে ছিল ভয় দেখিয়ে বালি মাফিয়াদের কাছ থেকে ভাগ-বাটোয়ারা আদায়। এমনই দাবি স্থানীয় বিজেপি কর্মীদের। তিস্তা নদী থেকে বালি পাচারের টাকা প্রশান্তর হাত দিয়ে তৃণমূল নেতাদের কাছেও পৌঁছত বলে অভিযোগ তাঁদের।
গত জানুয়ারি মাসে প্রশান্তকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও আড়ালে থেকে তিনি লোকজনকে হুমকি দিয়ে আসছিলেন, এমনটাই দাবি স্থানীয়দের। স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের ঘটনায় পুলিশের খাতায় ‘পলাতক’ থাকলেও বিধানসভা নির্বাচনে আগে দিব্যি রাজগঞ্জে ঘুরে বেরিয়েছেন প্রশান্ত। এমনকী হুমকি দিয়েছেন, রাজগঞ্জের বিডিও হয়েই শীঘ্রই ফিরে আসবেন তিনি। যাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন, তাঁদের তখন ‘দেখে নেবেন’। এমনটাই বলছেন এলাকার বাসিন্দারা।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, কথায় কথায় প্রভাবশালীরে নাম বলে শাসাতেন প্রশান্ত। একে-ওকে ফোন করে নিজের প্রভাব জাহিরের চেষ্টা করতেন। সরাসরি হুমকি দিতেন, তাঁর কথা না শুনলে জেলে পুরে দেবেন। যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, কেউ তাঁকে কিছু করতে পারবেন না। রাজগঞ্জের বিডিও থাকাকালীন প্রশান্তর চেম্বারে মোবাইল নিয়ে ঢোকা নিষিদ্ধ ছিল।
অভিযোগ, সন্ধ্যার পর প্রায়ই রাজগঞ্জ বিডিও অফিসে ‘আসর’ জমত। নিজের পছন্দের কিছু ঠিকাদারকে নিয়ে রাত পর্যন্ত সেই আসর চালাতেন খোদ প্রশান্ত। স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনের ঘটনায় নাম জড়ানোয় চেয়ার থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরও গত চারমাস ধরে বিডিও অফিসের চেম্বারের বাইরে থেকে তাঁর নেমপ্লেট সরেনি। এতেই স্পষ্ট, পদে না থাকলেও রাজগঞ্জ ব্লক প্রশাসনের অন্দরে প্রশান্ত বর্মনের প্রভাব অটুট ছিল। অবশেষে দু’দিন আগে জলপাইগুড়ির জেলাশাসক সন্দীপকুমার ঘোষের নির্দেশে ওই নেমপ্লেট সরানো হয় বলে বিডিও অফিস সূত্রে খবর।
মঙ্গলবার রাজগঞ্জ বিডিও অফিসে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ঠিকাদার দিলীপ দাস বলেন, কমিশন ছাড়া কিছু বুঝতেন না প্রশান্ত বর্মন। বাইরের কিছু ঠিকাদার নিয়ে এসেছিলেন তিনি। তাঁদের সঙ্গে নিয়েই ঘুরতেন। তাঁরাই কাজ পেতেন। এলাকার ঠিকাদাররা যদিও বা কখনও কোনো কাজ পেতেন, বিডিও প্রশান্ত বর্মনকে কমিশন না দিলে বিল ছাড়া হত না। আমারও অনেক টাকার বিল আটকে দেন তিনি। আজও সেই টাকা পাইনি। ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন চাইতেন। প্রশান্তর আমলে কাজ না করেও বহু টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ দিলীপের।
বিজেপির জেলা কমিটির সদস্য দেবাশিস দে’র তোপ, প্রশান্ত বর্মন বহু দুর্নীতিতে যুক্ত। বালি পাচারকারীদের সঙ্গেও যোগসাজশ ছিল তাঁর। তোলা না দিলে বালির ডাম্পার আটক করে চালককে মারধর করতেন। চেষ্টা করতেন নিজেকে ‘হিরো’ হিসাবে তুলে ধরার। আসলে এসবের পিছনে ছিল অবৈধ কারবারের ভাগ-বাটোয়ারা।