Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

নন্দন মেলার প্রথম দিনে সেকালের স্মৃতিতে ডুব রবি-অনুরাগী রবীন্দ্রনাথের

লোকে বলে, আশিতে আসিও না। আর রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘সবাই আশিতে আসিও। শর্ত শুধু একটাই—হৃদয়ে রেখো সৃষ্টি সুখের উল্লাস। আর অবশ্যই নন্দন।’

নন্দন মেলার প্রথম দিনে সেকালের স্মৃতিতে ডুব রবি-অনুরাগী রবীন্দ্রনাথের
  • ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পিনাকী ধোলে, বোলপুর: লোকে বলে, আশিতে আসিও না। আর রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘সবাই আশিতে আসিও। শর্ত শুধু একটাই—হৃদয়ে রেখো সৃষ্টি সুখের উল্লাস। আর অবশ্যই নন্দন।’ 

Advertisement

‘নন্দন’-এর শাস্ত্রীয় অর্থ দেবরাজ ইন্দ্রের উদ্যান। সেখানে সর্বসুখের কোনও খামতি নেই। আর জীবনে সুখ মানে বয়সের ভার কেবল সংখ্যায় বদলে যায়। তার সঙ্গে যদি কেউ সৃষ্টির আনন্দে মেতে থাকেন, তা হলে তিনি হয়ে যান ‘চিরযুবা’। শান্তিনিকেতন যেমন অর্ধশত বর্ষ ধরে দেখে আসছে রবীন্দ্রনাথ দে’কে। আশিতে এসেও তিনি বৃদ্ধ নন! 
সময়টা ১৯৭৩ সাল। বিশ্বভারতীর রবি-ঐতিহ্য কলাভবনে পথচলা শুরু ‘নন্দন মেলা’র। তখন রবীন্দ্রনাথ বছর পঁচিশের তরতাজা যুবক। মনেপ্রাণে রবীন্দ্রপ্রেমী। গুনগুন করে রবিগান গাইতেন, আঁকতেন। দক্ষ ছিলেন হস্তশিল্পেও। কাঠের উপর দুর্দান্ত সব কারুকাজ করতেন ছেলেবেলা থেকেই। রবীন্দ্রভূমে এমন মেলার খবর পেয়ে অগোছালো ঘরে যা কিছু শিল্পকর্ম ছিল তা ঝুলিতে ভরে চলে এসেছিলেন কলাভবনে। মেদিনীপুরের গড়বেতা থেকে সেই যাত্রা শুরু। তারপর চরৈবেতি চরৈবেতি মন্ত্রে দিক্ষীত হয়ে নিরবচ্ছিন্ন গতি তাঁর। এক বছরই শুধু আসতে পারেননি। সেটা ছিল বিয়ের বছর—১৯৭৬ সাল। আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘ভাঙা বছরটা আমাকে রেকর্ড গড়তে দিল না। ছিয়াত্তরের পর আমাকে অবশ্য নন্দনে আসতে দমাতে পারেনি কোনও শক্তি। আসলে, এখানে এলে সঞ্জীবনী সুধা পাই। দিন দুয়েকের সুধা পানে ৩৬৫ দিন বাঁচি।’  
পঁচিশেও এসেছেন নন্দন মেলায়। কিন্তু তিয়াত্তরের মেলা, আজকের সেই মেলা নয়। নিজের সৃষ্টি-সম্পদ সাজাতে সাজাতে আনমনে বলছিলেন, ‘এখন মেলায় জাঁকজমকের পরিধি বেড়েছে। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়েছে। মেলার প্রথমদিনে যাঁদের সঙ্গে বসেছিলাম, তাঁদের আজ অনেকেই নেই। শিল্পের সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু, একটি জিনিসের তফাৎ খুঁজে পাইনি আজও। সেটা হল, নন্দন মেলার প্রাণ। সেই প্রাণের টানেই আমার প্রতিবছর এখানে আসা। বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে মেলার স্মৃতিচারণ আমাকে মুগ্ধ করে।’ 
একদা সরকারি চাকরি করতেন রবীন্দ্রনাথ। ২০০৮ সালে অবসর নেন। পরের বছরই ভর্তি হন বিশ্বভারতীর কলাভবনের স্কাল্পচার ডিপার্টমেন্টে। তারপর থেকেই পুরোদস্তুর ‘নন্দন মেলায়’ নিয়োজিত গোটা বছর। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসারের যাঁতাকল আলগা হয়েছে। এখন সর্বস্ব উজাড় করে দেন নিজের শিল্পকর্মে। নিত্যনতুন সৃষ্টিতে মগ্ন থাকেন তিনি। সেগুলি ঘরে সাজিয়ে অপেক্ষা বছরের শেষ মাসের প্রথম দিনের জন্য। এবারও ১ ও ২ ডিসেম্বর নন্দন মেলা বসেছে। যথারীতি হাজির রবি-অনুরাগী রবীন্দ্রনাথ। 
নন্দন মেলার বয়স এখন ৫২ বছর। ১৯৭২ সালে কলাভবনের প্রথম বর্ষের ছাত্র বীরেন বোরা আমতলা ছাত্রাবাসে এক দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হন। ভর্তি করা হয় স্থানীয় পিয়ারসন মেমোরিয়াল হাসপাতালে। কিন্তু, আঘাত গুরুতর হওয়ায় তাঁকে অন্যত্র নিয়ে যেতে হয়। এই সময় প্রয়োজন পড়ে প্রচুর টাকার। প্রাথমিকভাবে ধারকর্জ করে পরিস্থিতির সামাল দেওয়া হয়। পরে স্থির হয়, ছাত্র-কল্যাণে একটি স্থায়ী তহবিল গড়ে তুলতে হবে। পরের বছরই ভূমিষ্ঠ হয় নন্দন মেলার। গড়বেতার রবীন্দ্রনাথও এলেন ওই বছর থেকে। জীবনের শেষ বছরও কাটাতে চান নন্দন মেলায়। -নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ