সুখেন বিশ্বাস: শীতের সিগনেচার। নলেন গুড় বঙ্গজীবনের অন্যতম রঙ্গ। একে অনেকে আবার নতুন গুড়ও বলেন। যখন হেমন্ত ঋতু হালকা শীতের আমেজ ছড়িয়ে দেয় বাঙালির আকাশে-বাতাসে, শীতের বারান্দায় মানুষজন যখন রোদ্দুরে পিঠ ঠেকায়, তখনই মাটির কলসিতে বাজারে আসে নলেন গুড়। শীতের খেজুর রস বা নতুন গুড়ের মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে বাঙালির আর এক ছেলেবেলা। খেজুর রস দেখতে অনেকটা হালকা সোনালি রঙের। তা জ্বালিয়ে তৈরি হয় বাদামি রঙের গুড়। অনেকে মধুর সঙ্গে তুলনা করলেও স্বাদে ও গন্ধে নলেন অতুলনীয়।
গুড় নাকি প্রথম আবিষ্কৃত হয় মেসোপটেমিয়ায়! কিন্তু গুড়ের রানির বাস আমাদের এই বাংলায়। মোট তিন ধরনের গুড় পাওয়া যায়— আখের গুড়, তালের গুড় ও খেজুরের গুড়। এর মধ্যে খেজুর গুড়ের রমরমা শীতকালজুড়ে। হেমন্তের শেষ দিকে নলেন গুড়ের দেখা পাওয়া যায়, বসন্তের প্রথম দিকেও কিছুটা মেলে। তবে শীত যেন বাঙালির নলেন ঋতু। এখন অবশ্য বিশেষ পদ্ধতিতে সারা বছরই নলেনের তৈরি মিষ্টি কমবেশি পাওয়া যায়। কিন্তু সেটা তেমন সুস্বাদু নয়। কারণ, বাংলায় কুয়াশামাখা শীতের সঙ্গে খেজুর রস আর খেজুর গুড় সেই কবে থেকে মিলেমিশে একাকার। এবার অবশ্য জানুয়ারিতেই হাড়কাঁপানো শীত উধাও! শিউলিদের মুখ ভার। মাঘ মাসে বাঘ কেন, বিড়ালকে কাবু করার মতোও ঠান্ডা পড়ছে না। ফলে রসও নেই, নলেন গুড় তো দূরঅস্ত।
• খেজুর গুড়ের নাম ‘নলেন গুড়’ কেন? এ প্রশ্ন অনেকের মনেই ঘোরাফেরা করে। অনেকের মতে ‘নলেন’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে। অন্য মতে, এটি দ্রাবিড় শব্দ ‘নরকু’ থেকে জাত। ‘নরকু’ অর্থে ছেদন করা। গাছ ছেদন করে রস, তা জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি হয় বলে এটি ‘নলেন’। আবার অনেকে বলেন, নলেন শব্দটি এসেছে ব্রজবুলি ভাষার ‘নওল’ থেকে। ‘নওল’ শব্দের অর্থ ‘নতুন’। তাই নলেন গুড়কে অনেকে নতুন গুড়ও বলেন। সাধারণত খেজুর গাছে ‘বাঁশের নল’ বা ‘খিল’ লাগিয়ে রস সংগ্রহ করে, তা জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় গুড়। বাঁশের ‘নল’ থেকেই ‘নলেন’ শব্দটা এসেছে বলেও অনেকে মনে করেন। শিউলিরা (রস সংগ্রহকারী) গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য প্রথমেই খেজুর গাছের কিছুটা চেঁচে দেয়। অতঃপর নরুন দিয়ে ফুটো করে চুইয়ে চুইয়ে মাটির হাঁড়িতে রস সংগ্রহ করে। ‘নলেন’ শব্দটি ‘নরুন’ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে বলে অনেকের অভিমত। তবে কোন মতটি সঠিক, হলফ করে বলা যায় না!
• খেজুর রস শীত-সকালের প্রাণমধু। এখনও গ্রামগঞ্জে শীতকাতুরে বাঙালিরা শুধুমাত্র রস খাওয়ার জন্য ঘুম থেকে তড়িঘড়ি উঠে পড়ে। জেগে ওঠে গোটা পাড়া। রাস্তাজুড়ে চলে রসের তুফান। পুজোর পরপর হেমন্ত এলেই শিউলিরা খেজুর গাছ কাটা শুরু করে। মরা-আধমরা পাতা কেটে গাছ পরিষ্কার করাকে বলা হয় গাছ ঝোড়া। বিরাম দিয়ে কয়েকদিনের মাথায় রসের জায়গা চাঁচা হয়। এক বছর গাছের যেদিকে চাঁচা হয়, পরের বছর ঠিক উলটো দিকে। অজান্তেই গাছে নেমে আসে এক অপার সৌন্দর্য। দূর থেকে মনে হয় গাছটি এক দণ্ডায়মান মানুষ। চাঁচার শেষ পর্যায়ে গাছে বসে নলি। অবশেষে নলি বেয়ে একটু একটু রস পড়তে শুরু করে। অল্প সময়েই রসে টইটম্বুর হয়ে ওঠে মাটির ভাঁড়গুলি। আগেই সেগুলি জীবাণুমুক্ত করা হয় রোদে শুকিয়ে, শেষে খড়ের আগুনে তাপ দিয়ে।
গাছের বয়সের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে রসের। বুড়ো গাছে অল্প রস, তেজি গাছে (অল্পবয়সি গাছ) বেশি রস। তবে পুরোটাই নির্ভর করে ভালো আবহাওয়ার উপর। রোদ ঝলমলে আবহাওয়ায় রস উৎপাদন বেশি হয়। কিন্তু আকাশে মেঘ জমলে টকে যায় রস। ঠিক যেন ‘কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে, তোমারে দেখিতে দেয় না...’। প্রথম দিনের রসকে বলা হয় ‘নলেন রস’। পরের দিনের রসটি ‘ঝার’ বা ‘দো-কাটের রস’ নামে পরিচিত। তৃতীয় আর চতুর্থ দিনেরগুলি যথাক্রমে ‘নিমঝরা’ ও ‘ওলা’ নামে পরিচিত। তিন থেকে চারদিন রস সংগ্রহের পরে খেজুর গাছকে দিন তিনেক বিশ্রাম দেয় শিউলিরা। আবার চেঁচে নল ঢুকিয়ে রস সংগ্রহের পালা। গাছ জিরোনো বা গাছকে বিশ্রাম দেওয়ার পর যে রস পাওয়া যায়, সেটিই সর্বোৎকৃষ্ট রস। এটি ‘জিরেন কাঠের রস’ নামে পরিচিত। শীত-সন্ধ্যা বা শীত-সকালে এই রসে চুমুক দেওয়ার মজাই আলাদা। কেউ কেউ তো এক লহমায় দু-তিন গ্লাস পর্যন্ত খেয়ে নেয়।
• এ কথা কারও অজানা নয় যে, সবচেয়ে অযত্নে-অবহেলায় বেড়ে ওঠা গাছের নাম—খেজুর গাছ। এই গাছের রসকে অনেকে বলেন মধুর রস। যেন মধুবৃক্ষে মধুরস। ডাক্তারি শাস্ত্রে বলা হয়েছে, নলেন গুড় উচ্চ ক্যালরিযুক্ত। কিন্তু চিনির থেকে ক্যালরি কম। নিশ্চিত-রূপে তা চিনির বিকল্প। মানবদেহে গুড় শুধু তাপমাত্রা উৎপাদনই করে না, তাপমাত্রাকে ধরেও রাখে। নলেন গুড়ে আয়রন, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, কপার, জিঙ্ক, ভিটামিন বি-সি সবই আছে। হজমে সহায়ক। কারণ, হজমে সাহায্যকারী এনজাইমের শক্তিকে বাড়িয়ে দেয় নলেন গুড়। অ্যান্টি-ফ্যাটের পাশাপাশি সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি ইত্যাদিতে ভালো। দুধ-ভাতের সঙ্গে ঝোলা গুড়ের স্বাদ এককথায় অনন্য। গুড় মাখিয়ে পাউরুটি খাওয়ার চল হাল আমলে হলেও হাতরুটি, মুড়ি, লুচি, পরোটা, সরুচাকুলি ইত্যাদি ঝোলা গুড়ে ডুবিয়ে খাওয়ার মজাটাই আলাদা।
• শীত মরশুমি অতিথি। কিন্তু চিরদিনই বাঙালির গুড়সম্রাট নলেন। তাই বাঙালির প্রবাদ-প্রবচনেও ঢুকে পড়েছে নলেন গুড়। প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য না হয়ে প্রশংসা পেলে অবলীলায় মানুষ বলে থাকে, ‘ওরে বেশি নলেন দিস না।’ নলেন যে এখানে অতিমাত্রায় প্রশংসিত, তা বলার অপেক্ষা থাকে না। ‘নলেন’ শব্দটি না থেকেও অনেক প্রবাদ-প্রবচনে জায়গা করে নিয়েছে ‘গুড়’ শব্দটি। যেমন ‘সে গুড়ে বালি’। অর্থ বৃথা আশা বা আশায় আশাহীনতা। অন্যদিক থেকে নলেন গুড়ে দেদার ভেজাল মেশানোর বিষয়টির সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছে প্রবাদ-প্রবচনটি। বেশি লাভ পেতে বা বেশি গুড় পেতে চিনি বা হাইড্রোজ মেশানোর প্রক্রিয়াটি এখন আকছার দেখা যাচ্ছে গ্রামবাংলায়। বিভিন্ন রাসায়নিক দিয়ে তৈরি বস্তুতে নলেনের এসেন্স মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে ‘খাঁটি নলেন গুড়’(!)। এটি যে আসলেই ভেজাল, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। হাটে গিয়ে গুড়ের ব্যাপারীরা ভেজালের সন্ধান পেয়ে কখনও কখনও বলে ওঠে ‘সে গুড়ে বালি’।
শুধু সমাজ জীবনেই নয়, বাঙালির রাজনৈতিক জীবনেও চলছে গুড়কীর্তন। বহু প্রচেষ্টার ফলাফল নষ্ট হয়ে গেলে আমরা অনায়াসে বলে উঠি ‘লাভের গুড় পিঁপড়েয় খায়’। আবার প্রাচুর্যের আধিক্য বোঝাতে সকলেই বলে থাকে ‘যত গুড় তত মিষ্টি’। এখন তো রাজনৈতিক পরিসরে, শুধু রাজনৈতিক কেন বলব গোটা সমাজে ভাইরাল হয়েছে ‘নকুলদানা’, ‘গুড়বাতাসা’ ইত্যাদি শব্দবন্ধ।
• নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘রস’ গল্পটির কথা মনে আছে? খেজুর রস থেকে নলেন গুড় তৈরি নিয়ে জীবনের গল্প লিখেছিলেন মিত্তির মশাই। গুড় তৈরির অভিজ্ঞতার জন্যে মোতালেফ মিয়াঁ, বিচ্ছেদ হওয়া প্রাক্তন স্ত্রী মাজু খাতুনের দরজায় ছুটে যায়। কারণ, নতুন বউ ফুলবানু গুড় তৈরিতে অপটু। তাই মাজুই ভরসা। ফলে নতুন গুড়ের গন্ধে দূর-দূরান্ত থেকে খরিদ্দার আসে মোতালেফের কাছে। পরবর্তীকালে গল্পটা সামনে রেখে হিন্দিতে তৈরি হয়েছিল ‘সওদাগর’। যেখানে অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন, নূতন, পদ্মা খান্না প্রমুখ। সুকুমার রায়ের ছড়া ‘ভালরে ভাল’-এর কয়েকটি পঙ্ক্তি এ বিষয়ে প্রণিধানযোগ্য: ‘শিমুল তুলো ধুন্তে ভাল,/ ঠান্ডা জলে নাইতে ভাল,/ কিন্তু সবার চাইতে ভাল—/ পাঁউরুটি আর ঝোলা গুড়।’ হাসির লেখক তারাপদ রায় নলেন গুড় নিয়ে লিখেছেন ‘র্যাডিশ উইথ মোলাসেস’ গল্পে। কুচি কুচি মুলোয় নলেন গুড় মাখিয়ে কাচের প্লেটে রেখে বলেছিলেন এ খাবার ‘র্যাডিশ উইথ মোলাসেস-এ বেঙ্গলি ডেলিকসি’। ‘খেজুর গুড়ের সন্দেশ’ নামে একটি গল্পও লিখেছেন তিনি।
গুড় সংস্কৃতির আদি নিদর্শন পাওয়া যায় শ্রীধরদাস সংকলিত ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ গ্রন্থে। শ্রীধরদাস ছিলেন খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকের রাজা লক্ষ্মণ সেনের অন্যতম সামন্ত বটুদাসের পুত্র। এখানেই হেমন্তের নতুন গুড়ের গন্ধে আমোদিত বাংলার গ্রামের বন্দনার পরিচয় পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় ‘বাঙালির ইতিহাস’ (আদি পর্ব) গ্রন্থে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এছাড়া খেজুরের উল্লেখ পাওয়া যায় ধর্মপালের খালিমপুর লিপিতে। পুরুলিয়ার ঐতিহ্যবাহী ঝুমুর ‘হাঁড়ি বাঁধো মন’ গানে লেখা আছে খেজুর রসের প্রসঙ্গ, ‘খেজুর গাছে হাড়ি বাঁধো মন/ গাছের জোয়ার আসিলে/ ও গাছ কাটো কৌশলে/ কোনার দড়ি ছিঁড়ে যেন পড়ো না তলে।’
• শীতকালে বাঙালির রসনাতৃপ্তির দোসর নলেন গুড়। মিষ্টির দোকানে গুড়ের রসগোল্লার চাহিদা আজও তুঙ্গে। সব ধরনের সন্দেশকে দূরে সরিয়ে একমেবাদ্বিতীয়ম-রূপে বিরাজ করছে ‘নলেন গুড়ের সন্দেশ’। শেষ পাতে একটায় মন ভরে না, অন্তত দুটো তো চাই-ই চাই। কী করে ভুলি নলেন গুড়ের মাখা সন্দেশ বা কাঁচাগোল্লার কথা। শীত-বাঙালির ঐতিহ্যবাহী এ মিষ্টির স্বাদ ও গন্ধ ভুবনজোড়া। শীতের মরশুমে অনেক জায়গায় বোঁদে-জিলিপিও তৈরি হচ্ছে নলেন দিয়ে।
এছাড়াও অসংখ্য মিষ্টি তৈরি হয় নলেন গুড় দিয়ে। যেমন— নলিন চন্দ্র দাস অ্যান্ড সন্সের গুড় মনোহরা, ফেলু মোদকের মোহিনী, সূর্যকুমার মোদকের জলভরা, গিরিশচন্দ্র দে ও নকুড় চন্দ্র নন্দীর গুড়ের মৌসুমি ও জলভরা ইত্যাদি। পাশাপাশি শীত পড়লেই ট্রেন, বাস, দোকান-বাজার সর্বত্র মোয়ার জয়জয়কার। সেটা যদি জয়নগরের হয়, তবে তো কথাই নেই। খই-নলেনে যেমন স্বাদ, তেমনই গন্ধ।
এ তো গেল বাজারের মিষ্টান্নর কথা। যুগ যুগ ধরে গৃহস্থ বাড়িতে নলেন গুড় দিয়ে পিঠেপুলি তৈরি করে আসছেন গৃহিণীরা। ঝোলা গুড় দিয়ে সরা পিঠে বা ভাপা পিঠে খাওয়ার মজাই আলাদা। দুধ পুলি, ভাজা পুলির মূলেও রয়েছে নলেনের স্বাদ ও মনোহরা গন্ধ। পাটিসাপটায় নলেন মেশানো নারকেলের পুর কার না ভালো লাগে! এছাড়াও রস পিঠে, গোকুল পিঠে, ভাজা পিঠে, ঢালা পিঠে, চুষি পিঠে সব জায়গায় নলেন গুড়েরই জয়জয়কার। এরই সঙ্গে বাঙালির রসনাতৃপ্তিতে হাজির নতুন গুড়ের পায়েস। শীত মরশুমে বাঙালি গৃহস্থ বাড়িতে জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, অন্নপ্রাশন হবে কিন্তু পদে গুড়ের পায়েস থাকবে না, এটা হতে পারে না। অঘ্রান সংক্রান্তি, নবান্ন উৎসব, পৌষ সংক্রান্তি সহ বাঙালির শীতকালীন সমস্ত মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানজুড়ে রয়েছে নলেনের স্বাদ ও গন্ধ। রবীন্দ্রনাথ বহুদিন আগেই লিখেছিলেন, ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’ গানটি। তিনি এ গান কেন লিখেছিলেন, সেটা প্রশ্নাতীত। তবে গুড়সম্রাট নলেন নিয়ে বাঙালি খাদ্যরসিকরা মনে মনে হয়তো আওড়ান, ‘...চিরদিন কেন পাই না?’
.......................................................................
লেখক কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক