Bartaman Logo
১৮ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

অযোধ্যার পাদদেশে মুরুগুমা গ্রাম

অযোধ্যার পাদদেশে মুরুগুমা গ্রাম প্রকৃতির মাঝে শান্তি খুঁজে পাওয়ার জায়গা। এখানে রয়েছে মনোরম জলাধার ও পাহাড়ের দৃশ্য। বিস্তারিত পড়ুন।

অযোধ্যার পাদদেশে  মুরুগুমা গ্রাম
  • ১৮ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শহরের কোলাহল থেকে পালিয়ে যদি কাছেপিঠে এমন কোথাও ছুটি কাটানোর সুযোগ পাওয়া যায়, যেখানে শান্ত, সুন্দর গ্রাম্য প্রকৃতির মাঝে অপেক্ষা করে থাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তা, তা হলে কেমন হয়? যেখানে দৃশ্যপট জুড়ে থাকে পান্না সবুজ জলরাশি এবং বন-পাহাড়ের প্যানোরমিক ভিউ। পুরুলিয়া জেলায় পাহাড়ের কোলে সুন্দর এক জলাধার, তার ধারে ছবির মতো ছোট্ট গ্রাম মুরুগুমা। অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে একটি জলাধারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই পর্যটনস্থল। বাঁধটি সাহারজোর নদীর ওপর অবস্থিত। স্থানীয় লোকজনের মতে ‘মুরুগুমা’ শব্দের অর্থ ময়ূরদের বাড়ি। অবসর যাপনের জন্যই মুরুগুমার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটাতে অনেকে বেছে নিচ্ছেন পুরুলিয়ার এই গ্রামটিকে। জায়গাটা খুব বেশি হোটেল বা রিসর্টের দখলে চলে যায়নি, তাই প্রকৃতি এখানে এখনও বেহিসেবি। 

Advertisement

এক কাকভোরে আমরা রওনা দিয়েছিলাম মুরুগুমার পথে। কলকাতা থেকে আরামবাগ হয়ে বিষ্ণুপুরকে বাইপাসে রেখে আমরা এগিয়ে চললাম জয়পুরের দিকে। জয়পুর জঙ্গলের ঠিক আগেই বনলতা রিসর্ট। আমরা বিরতি নিলাম প্রাতরাশের জন্য। ব্রেকফাস্ট পর্ব মিটিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিলাম। এরপরই শুরু হল জঙ্গলের মনোরম রাস্তা। জয়পুর জঙ্গল অতিক্রম করে বাঁকুড়াকে পাশে ফেলে আমরা ধরলাম পুরুলিয়া-রাঁচি রোড, গন্তব্য আপাতত বেগুনকোদর উপজাতি গ্রাম, একটানা গাড়ি চালালে মোটামুটি ঘণ্টা দুই-আড়াই সময় লাগে।
বেগুনকোদর বাজার থেকে মুরুগুমার দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। ঝলক দর্শনেই মেলে স্থানীয়দের রোজনামচার ছবি। তাতেই মনে হল গ্রামের গায়ে যেন কিঞ্চিৎ মফস্সলের ছোঁয়া। একটা জায়গায় এসে গাড়ি থামাতে হল, সামনে অনেকটা খাড়াই। অনিশ্চয়তাকে সম্বল করে সাবধানে গাড়িটিকে নিয়ে খাড়াই পথ টপকাতেই মুহূর্তে বদলে গেল প্রকৃতির চিত্রপট। সারপ্রাইজ! গ্রাম ফুঁড়ে রাস্তাটা সোজা উঠে গেছে বাঁধের ওপর। চোখের সামনেই মুরুগুমার স্ফটিক স্বচ্ছ জলরাশি এবং শান্ত টলটলে জলে পাহাড়ের ছবি। চোখের পলকে প্রকৃতির এমন রূপ পরিবর্তনে ধাতস্থ হতে সময় লাগল।
থাকার জায়গা আগে থেকেই বুকিং করা ছিল। জলাশয়কে বাম পাশে ফেলে সামান্য এগিয়েই খুঁজে পাওয়া গেল ‘মুরুগুমা ইকো হাট’। বারান্দায় দাঁড়ালেই চোখের সামনে বাঁধের জলরাশি, পাহাড় আর জঙ্গল। বিকেল চারটের কিছু পরেই বেরিয়ে পড়লাম সানসেট ভিউ পয়েন্ট দেখতে, যার আরেক নাম সুইসাইড পয়েন্ট। তবে এই নামকরণের সঙ্গে ‘আত্মহত্যার’ কোনো প্রত্যক্ষ সংযোগ নেই। পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম ভিউ পয়েন্টের দিকে। এমন মনোমুগ্ধকর জায়গার এমন ভীতিপ্রদ নাম কেন বুঝলাম না। যে টিলার ওপর ভিউ পয়েন্ট, সেটি একেবারেই ন্যাড়া এবং পাথুরে, চারপাশের দৃশ্যপট উন্মুক্ত ও অবারিত। প্রকৃতির সেই শান্ত, ভাবগম্ভীর, রহস্যময় সৌন্দর্য চাক্ষুষ করে বিস্ময়ের সীমা রইল না। যে পথ ধরে আমরা উঠে এসেছি সেই পথটুকু ছাড়া বাকি তিনদিকে গভীর খাদ, জলাধারের জল প্রবেশ করেছে খাদের আনাচকানাচে। মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো সবুজ বনানী। দূরে সারি সারি পাহাড়। পাহাড়গুলোর কোনোটা ঘন সবুজ, কোনোটা আবার বৃক্ষহীন। পুরুলিয়ার রুক্ষ জমিতে যে এমন বিস্ময় লুকিয়ে আছে, না দেখলে বিশ্বাস হয় না। 
পরদিন সকাল ন’টার মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম। মুরুগুমা থেকে ঝালদা হয়ে বাঘমুণ্ডি, সেখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে চড়িদা গ্রাম। রংবেরঙের মুখোশ তৈরির জন্য প্রসিদ্ধ। চড়িদা থেকে অযোধ্যা পাহাড় যাওয়ার পথে দেখে নিলাম মনোরম দুই ড্যাম, খয়রাবেড়া ও তুর্গা। এরপর এগিয়ে চললাম অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে। এই পথেই আছে লহরিয়া শিব মন্দির। মন্দিরের সামনে বিশাল জলাধার, নাম ‘লহরিয়া ড্যাম’। মন্দির দর্শন করে শুরু হল পাহাড়ে ওঠা, গন্তব্য লোয়ার ড্যাম। চোখের সামনেই সবুজ পাহাড় পরিবেষ্টিত লোয়ার ড্যামের শান্ত ঘন নীল জল, পাহাড়ের নীচেই লহরিয়া ড্যাম এবং তার চারপাশে চাষের জমি। লোয়ার ড্যাম থেকে পাহাড় ধরে উপরে উঠলেই আপার ড্যাম। আপার ড্যামে সঞ্চিত জল থেকে টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরি হয়।
দলমা পাহাড় ও পূর্বঘাট পর্বতমালার একটি সম্প্রসারিত অংশ হল অযোধ্যা পাহাড়। পাহাড়ের মাথাটি প্রায় সমতল। এখানে দর্শনীয় কাঠের দুর্গা মন্দির। ঘুটঘুটে অন্ধকার মাটির ঘরে অপূর্ব সুন্দর দুর্গা মূর্তি, সম্ভবত কাঠের তৈরি। দেবীর হাতে একটি প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ। স্থানীয়দের মতে এই প্রদীপ নাকি কখনও নেভে না, যুগ যুগ ধরে প্রদীপ শিখা জ্বলেই যাচ্ছে।
অযোধ্যা পাহাড়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঝরনা বামনী ফলস। এখান থেকে মুরুগুমার দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। পরদিন ফেরার পালা। ঘুম থেকে উঠে বেরলাম মুরুগুমা গ্রাম ঘুরতে, ড্যামের ওপাশে গ্রাম। মাছ ধরা, পরিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ, পশু চরানোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মুরুগুমা ড্যাম। মুরুগুমাকে বিদায় জানিয়ে সকাল দশটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম। 
তনয়া ভট্টাচার্য

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ