সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) নিয়ে এখন সরগরম জাতীয় রাজনীতি। নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করেছে একাধিক বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক দল। এরমধ্যেই বাংলার শাসকদলের বাড়তি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে ‘বহিরাগত’দের নাম তোলার হিড়িক! তখনও এসআইআর নিয়ে এভাবে মাতামাতি শুরু হয়নি। নির্বাচন কমিশনের কাছে ভুয়ো ভোটার নিয়ে সরব হয়েছিল তৃণমূল। অভিযোগ ছিল, মহারাষ্ট্র ও দিল্লিতে রাতারাতি ভিন রাজ্যের ভোটাররা নাম তুলে নির্বাচনের ফলাফলই বদলে দিয়েছে। বাংলাতেও রাজনৈতিক যুদ্ধে এঁটে উঠতে না পেরে সেই চেষ্টা চলছে। স্বয়ং দলনেত্রীর নির্দেশে ‘ভুয়ো ভোটার’ খুঁজতে নেমেছিলেন তৃণমূলের নেতা, মন্ত্রীরা। তবে, এসআইআর বিতর্ক মাথাচাড়া দেওয়ায় সেটা এখন ঠান্ডাঘরে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, তৃণমূলের আশঙ্কা কি সত্যি? অন্তত, নতুন ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্তিকরণের আবেদনের যে পরিসংখ্যান নির্বাচন কমিশন সামনে এনেছে তা দেখে রাজনৈতিক মহল মনে করছে, বাংলার ঘাসফুল শিবিরের আশঙ্কা অমূলক নয়। অতিরিক্ত জেলাশাসক (সাধারণ) সুবাসিনী ই বলেন, ‘সর্বদলীয় বৈঠক হয়েছে। বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছেন। সেগুলি আমরা তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেব।’
সোমবার আসানসোল জেলাশাসক অফিসে ছিল সর্বদলীয় বৈঠক। সেখানেই ভোটার তালিকায় নাম তোলা, নাম বাদ দেওয়া এবং ভোটার তালিকা নাম স্থানান্তরের কত আবেদন জমা পড়েছে, তার পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। সেখানে দেখা গিয়েছে, ১২ জানুয়ারির পর থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত জেলার ভোটার তালিকায় নতুন করে নাম তোলার জন্য আবেদন জমা পড়েছে ২৪ হাজার ৬৭৪টি। তারমধ্যে আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে ২২ হাজার ৯৩৯টির। আবেদন গৃহীত হয়েছে মাত্র ১১ হাজার ৯৭৯টি। অর্থাৎ, ১০ হাজার ৯৬০টি নাম তোলার আবেদন বাতিল হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হল, এই বাতিলের দলে কারা? উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রশাসনিকস্তরে উঠে আসছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গিয়েছে, নাম তুলতে আবেদনকারী যে ঠিকানা দিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট বিএলও গিয়ে সেই ঠিকানার কোনও অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছেন না। তাঁকে শুনানিতে অংশ নিতে চারবার নোটিস করা হলেও একবারের জন্যও হাজির হননি। পদবি দেখে তাঁদের ভিনরাজ্যের বাসিন্দা বলে ধারণা করা হচ্ছে। বয়স পেরিয়ে যাওয়া ভিনরাজ্যের বহু মহিলাও জেলায় নতুন ভোটার হতে চেয়ে আবেদন করছেন। বৈবাহিক সম্পর্কের সূত্রে এখানে আসা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও তার কোনও বৈধ প্রমাণ দিতে পারছেন না। তাই, ভোটার তালিকার কারচুপি চেষ্টার জল্পনা বেড়েই চলেছে। অনেকে আবার বয়সের প্রমাণপত্র দিতে পারেননি। অনেকে ঠিকানার প্রমাণপত্রও দিতে পারছেন না। স্বাভাবিক কারণেই বাতিলদের তালিকা নিয়ে ধোঁয়াশা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।
এদিকে, স্থান পরিবর্তনের জন্য ফর্ম ৮ জমা করতে হয়। সেই ফর্ম জমা হওয়ার হিড়িকও বেশ ভালোই। ছ’মাসে এক্ষেত্রে আবেদন জমা পড়েছে ৫৩ হাজার ৮৯২টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৯ হাজার ৮২৩। এর মধ্যে গৃহীত আবেদনের সংখ্যা মাত্র ৩১ হাজার ৬২২। অর্থাৎ, প্রচুর ভুয়ো আবেদন যে জমা পড়েছিল তা এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ভুয়ো আবেদনও নজরে এসেছে প্রশাসনের। যদিও প্রশাসনের একটি অংশের দাবি, বেশিরভাগ আবেদনই এসেছে অনলাইনের মাধ্যমে। কিছু ক্ষেত্রে সাইবার কাফের কর্মীর ভুলেও আবেদন বাতিল হচ্ছে।
সর্বদলীয় বৈঠকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধি আকাশ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির পক্ষে আমাদের দল বরাবরই সরব। আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি, কোনওভাবেই যেন ভিনরাজ্যের ভোটাররা জালিয়াতি করে এখানে নাম না তোলেন। দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে বিজেপি ঠিক এমনই কৌশল নিয়েছিল।’ বিজেপির প্রতিনিধি প্রশান্ত চক্রবর্তী বলেন, ‘একটা নির্দিষ্ট অভিযোগ তৃণমূল কমিশনকে জমা করুক। এসআইআর নিয়ে তৃণমূল এখন বেকায়দায়। তাই ভুলভাল বকছে।’