Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

মহাকাশে নরকের দরজা

আকাশগঙ্গার নিকটবর্তী ছায়াপথ গ্যালাক্সি এম৮৭। এই ছায়াপথেই রয়েছে একটি ব্ল্যাকহোল! এই কৃষ্ণগহ্বর নাকি পৃথিবীকে গ্রাস করতে পারে! তাই বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘নরকের দরজা’।

মহাকাশে নরকের দরজা
  • ২ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০

আকাশগঙ্গার নিকটবর্তী ছায়াপথ গ্যালাক্সি এম৮৭। এই ছায়াপথেই রয়েছে একটি ব্ল্যাকহোল! এই কৃষ্ণগহ্বর নাকি পৃথিবীকে গ্রাস করতে পারে! তাই বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘নরকের দরজা’কী এই ব্ল্যাকহোল জানালেন কল্যাণকুমার দে।

Advertisement

রহস্যে ভরা এই মহাবিশ্ব। প্রকৃতি আর মহাকাশের একাধিক রহস্য উন্মোচনে দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। নতুন কিছু আবিষ্কার হলে তা নিয়ে গোটা বিশ্বে হইচই পড়ে যায়। সম্প্রতি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার হাবল স্পেস টেলিস্কোপের নজরে ধরা পড়েছে এক অতিকায় ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর। যা রয়েছে আমাদের ছায়াপথ আকাশগঙ্গার নিকবর্তী এক ছায়াপথেই। ছায়াপথটির নাম গ্যালাক্সি এম৮৭ বা মেসিয়ার৮৭। মহাবিশ্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে একটি এম৮৭। 
মহাবিশ্বের রহস্য সমাধানের জন্যই আমেরিকান স্পেস এজেন্সি নাসা কাজ করছে। ব্রহ্মাণ্ডের অনেক রহস্যই সমাধান করেছেন নাসার বিজ্ঞানীরা। বহুদিন ধরেই এই ছায়াপথ ঘিরে আগ্রহ তুঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আলোকবর্ষ, ইংরেজিতে বলে ‘লাইট ইয়ার’, এটি একটি দৈর্ঘ্য পরিমাপের একক। যা দিয়ে জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত দূরত্ব মাপা হয়। আলো এক বছরে যত দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকে বোঝানো হয়। এক আলোকবর্ষ সমান ৯৪৬ হাজার কোটি কিলোমিটার (শূন্যস্থানে আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার)। এম৮৭ ছায়াপথে রয়েছে ১০০ বিলিয়ন (১ বিলিয়ন সমান ১০০ কোটি) নক্ষত্র। এই ছায়াপথের কেন্দ্রে রয়েছে প্রবল এক্সরশ্মি, তেজস্ক্রিয় বিকিরণের উৎস। একে অনেক বিজ্ঞানীরা কসমিক পাওয়ার হাউস বলেছেন। 
সেখানেই অবস্থিত একটি বিশাল ব্ল্যাকহোল, যার ভর আমাদের সূর্যের ভরের তুলনায় ২.৬ বিলিয়ন গুণ বেশি। অর্থাৎ এর ভিতরে সেঁধিয়ে যেতে পারে ২৬০ কোটি পৃথিবী! এই বিশাল ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব প্রথম হদিশ পান ১৯৭৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির প্রয়াত মহাকাশবিজ্ঞানী পিটার ইয়ুং। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিশাল ডিম্বাকার গ্যালাক্সি এম৮৭ এর কেন্দ্রে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের হাতেনাতে প্রমাণও পেয়েছেন। এর ছবি নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে তোলা হয়েছে। ছবিগুলো দেখায়, যে এম৮৭ এর কেন্দ্রে একটি মহাকর্ষ ক্ষেত্র রয়েছে, যা একটি বিশালাকৃতি ব্ল্যাকহোলের প্রমাণ। এর বিশাল আকার ও মহাজাগতিক রহস্যময়তার কারণে বিজ্ঞানীরা একে ‘নরকের দরজা’ নামে অভিহিত করেছেন। এটাই নাকি আগামী দিনে গিলে খাবে পৃথিবীকে! আর তাতেই ভয়ে কেঁপে উঠছেন নাসার বিজ্ঞানীরা। তবে না, গ্যালাক্সি এম৮৭ এর ব্ল্যাকহোলটি এই  মুহূর্তেই পৃথিবীকে গ্রাস করবে না। কারণ, এটি পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, প্রায় ৫ কোটি ৫০ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। 
রাতের মেঘমুক্ত আকাশে তাকালে সাদা মেঘের মতো একটা অস্পষ্ট ঝাপসা দাগ দেখা যায়, যা উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে চলে গিয়েছে। এর নাম ছায়াপথ। আমরা এই ছায়াপথের ভেতরে বাস করি। এর ইংরেজি নাম মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি। বাংলায় বলা হয় আকাশগঙ্গা ছায়াপথ। আমাদের সূর্য-গ্রহ-উপগ্রহ এই ছায়াপথের ভেতর অবস্থান করছে। কিন্তু আমাদের অবস্থান এবং দৃষ্টিশক্তির চেয়ে বিশাল হওয়ায় সম্পূর্ণ ছায়াপথটি আমরা দেখতে পাই না। এটি দেখতে অনেকটা মশা তাড়ানোর কয়েলের মতো।
সূর্য একটি নক্ষত্র। এরকম ১০ মিলিয়ন থেকে ১ ট্রিলিয়ন নক্ষত্র একটি সাধারণ মহাকর্ষীয় কেন্দ্রের চারদিকে ঘূর্ণায়মান থাকে। সেই ব্যবস্থাটি গঠিত হয় অগণিত সংখ্যক তারা, আন্তঃনাক্ষত্রিক গ্যাস ও ধূলিকণা, প্লাজমা এবং প্রচুর পরিমাণে অদৃশ্য বস্তু নিয়ে। মহাকর্ষীয় শক্তি দ্বারা আবদ্ধ মহাজাগতিক এই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাকে বলা হয় ছায়াপথ বা গ্যালাক্সি। গবেষণায় দৃশ্যমান মহাবিশ্বে ২০০ বিলিয়নেরও বেশি ছায়াপথের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। 
বেশিরভাগ ছায়াপথের ব্যাস কয়েকশো আলোকবর্ষ থেকে কয়েক হাজার আলোকবর্ষ এবং পাশাপাশি দু’টি ছায়াপথের মধ্যবর্তী দূরত্ব কয়েক মিলিয়ন আলোকবর্ষ পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত কয়েকটি ছায়াপথ একত্রে লোকাল গ্রুপ অব গ্যালাক্সি গঠন করে মহাকাশে অবস্থান করে।
রাতের আকাশের অগুনতি  উজ্জ্বল, ঝলমলে নক্ষত্র, যাদের দেখে মনে হয় তারা অমর, এভাবেই বুঝি জ্বলছে অনন্তকাল ধরে। তারাও কিন্তু  অনেকটাই মানুষের মতন— তারা জন্মায়, বদলায়, বড় হয়ে ওঠে, আর একদিন হারিয়েও যায়। আর এই হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াতেই কোনও কোনও নক্ষত্র জন্ম দেয় রহস্যময় এই ব্ল্যাকহোলের। একটি তারার মৃত্যু হলে তা থেকে জন্ম নেয় একটি কৃষ্ণগহ্বর। ব্ল্যাকহোল (Black Hole) শব্দটি দ্বারা কিন্তু কোনও গর্ত বোঝায় না। মহাকাশের এক অনন্ত বিস্ময় এই ব্ল্যাকহোল। মহাবিশ্বের এমন কিছু তারকা বা নক্ষত্র আছে, যারা এমন শক্তিশালী মহাকর্ষ বল তৈরি করে যে এটি তার কাছাকাছি চলে আসা যেকোনও বস্তুকে একেবারে টেনে নিয়ে যায়, হোক তা কোনও গ্রহ, ধূমকেতু বা স্পেসক্রাফট, তা-ই ব্ল্যাকহোল।
পদার্থবিজ্ঞানী জন হুইলার এর নাম দেন ‘ব্ল্যাকহোল’। এই তারকাদের অস্বাভাবিক আকার, ভর ও ঘনত্ব থাকে, আর এর জন্যে এই সব নক্ষত্র থেকে নির্গত আলো বাইরে আসতে পারে না। সহজ ভাষায় বলতে গেলে- যখন একটি তারকার জীবনকাল শেষ হয়ে যায়, সেই মুহূর্তে তার অভিকর্ষ শক্তি এতই প্রবল হয় যে, আলো ওখান থেকে বের হতে পারে না। আর এই ঘটনা তখনই ঘটে যখন একটি তারকার জীবনকাল অর্থাৎ তার নির্দিষ্ট জ্বালানি শেষ হয়ে যায়।  তারকাটি পরিণত হয় ব্ল্যাকহোলে। এভাবেই একটি ব্ল্যাকহোলের সৃষ্টি হয়। ১৯১৬ সালে আইনস্টাইন তার ‘জেনারেল রিলেটিভিটি তত্ত্ব’ দিয়ে ধারণা করেন ব্ল্যাকহোল থাকা সম্ভব। আর ১৯৯৪ সালে এসে নভশ্চররা প্রমাণ করেন যে, বাস্তবে ব্ল্যাকহোল আছে।
ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর হল মহাশূন্যের এমন কিছু জায়গা, যেখানে মহাকর্ষ বল আশপাশের সবকিছু টেনে তার কেন্দ্রে নিয়ে যায়। এমনকী আলোও টেনে নেয়। এ জন্যই একে ‘ব্ল্যাক’ বা কৃষ্ণ (কালো) বলে চিহ্নিত করা হয়। কারণ, সেখানে আলো শুধু ঢোকে, বেরয় না। ফলে চোখে দৃশ্যমান হয় না। সামান্য জায়গায় অনেক বেশি পদার্থ ঘনীভূত হয় বলে এর বিরাট আকর্ষণশক্তি থাকে। কোনও বড় তারা (নক্ষত্র) দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে পড়ে নিজের কেন্দ্রে জড়ো হয়ে ব্ল্যাকহোলের উদ্ভব ঘটায়। এ সময় ‘সুপার নোভা’র সৃষ্টি হয়। সুপার নোভা হল মহাশূন্যে নক্ষত্রের বিস্ফোরণ। নক্ষত্রের কিছু অংশ মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। ব্ল্যাকহোল খুব ছোট। সূর্যের সমান বিশাল পদার্থে গঠিত ব্ল্যাকহোল মাত্র কয়েক মাইল চওড়া হতে পারে। ব্ল্যাকহোল ছোট হতে পারে আবার বড়ও হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে ক্ষুদ্রতম ব্ল্যাকহোল একটি পরমাণুর সমান হতে পারে। এই জাতীয় ব্ল্যাকহোলগুলো অনেক ক্ষুদ্র কিন্তু তাদের এক একটার ভর হতে পারে বিশাল কোনও পর্বতের সমান। অন্য এক ধরনের ব্ল্যাকহোলকে বলা হয় ‘স্টেলার’  বা ‘নাক্ষত্রিক’। এর ভর আমাদের সূর্যের ভর এর চেয়েও ২০ গুণ বেশি হতে পারে। প্রশ্ন ওঠে যে, ব্ল্যাকহোল থেকে কোনও আলো বাইরে আসতে না পারায় একে যদি দেখাই না যায়, তাহলে বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাকহোল দেখেন কী করে? এদের দেখার অন্য উপায় আছে। আশপাশের নক্ষত্রমণ্ডলী ও মহাজাগতিক গ্যাসীয় পদার্থের ওপর এর প্রবল মহাকর্ষ বলের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাকহোলের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারেন। ব্ল্যাকহোলে রয়েছে শক্তিশালী মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র। প্রত্যেক ব্ল্যাকহোলের চারদিকে একটি সীমা আছে যেখানে একবার ঢুকলে আর বের হওয়া যায় না। ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি থাকে সেই ভয়ঙ্কর এলাকা ‘ইভেন্ট হরাইজ্‌ন’। যে এলাকার সীমান্ত ছুঁলেই কোনও পদার্থ, এমনকী আলোর কণা ফোটনও আর ব্ল্যাকহোলের জোরালো অভিকর্ষ বলের টান এড়িয়ে বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে, ইভেন্ট হরাইজ্‌ন থেকেই শুরু হয়ে যায় ব্ল্যাকহোলের অতলান্ত অন্ধকারের সাম্রাজ্য। যে সাম্রাজ্যে অস্তিত্বই নেই আলোর। এইভাবেই মহাকাশের মহাবিস্ময় হয়ে বেঁচে আছে ব্ল্যাকহোল। একে নিয়েই চলছে বিজ্ঞানের নিরন্তর চর্চা। আলোকে গিলে খাওয়া এই মহাকাশীয় দানবকে নিয়ে তাই আজও কৌতূহলের শেষ নেই।

সম্পর্কিত সংবাদ