নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর: মুর্শিদাবাদ জেলায় বাল্যবিবাহ বন্ধের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছে গজধরপাড়া হাইস্কুলের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী মনিজা খাতুন। গত একমাসে ছ’টি বিয়ে আটকেছে সে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন এলাকায় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্যরা এসে বাল্যবিবাহ রোধের প্রচার করেন। তা দেখে উৎসাহিত হয়েছিল মনিজা। নিজেও বাল্যবিবাহ বন্ধ করার তৎপরতা শুরু করে। তখনই ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দু’-একজনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে মনিজা। গত তিন বছরে ২০টির বেশি বিয়ে আটকিয়ে মনিজা এখন নাবালিকা বিয়ে বন্ধের মুখ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসন এই কাজের জন্য তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মনিজার এখন লক্ষ্য, গ্রামের কোনও মেয়ের যেন ১৮ বছরের আগে বিয়ে না হয়। সেই বিষয়ে সে নিজেই নজরদারি করছে। পাশাপাশি, বিদ্যালয়ে নিজের বান্ধবীদের সাহস জুগিয়ে বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য কাজ করছে মনিজা। বিয়ে বন্ধ করতে গিয়ে হুমকি জুটছে। তবুও সাহসে ভর করে এগিয়ে চলেছে সে। স্কুলের কোনও ছাত্রীর বাড়িতে বিয়ের সম্বন্ধ এলে কিংবা দেখাশোনা শুরু হলে মনিজা খবর পেয়ে যায়। সেই খবর খুব সন্তর্পণে পৌঁছে দেয় জেলা প্রশাসনের কাছে। পুলিস উপযুক্ত পদক্ষেপ করে বিয়ে আটকায়।
মনিজা বলে, গত একমাসে ছ’টা বিয়ে আটকেছি। স্কুলে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বান্ধবীদের কাছ থেকেই জানতে পেরেছি, তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বাড়িতে মা-বাবার চাপে অনেকেই কিছু বলতে পারে না। কিন্তু, স্কুলে এসে আমার কাছে তারা গোটা বিষয়টি খুলে বলে। আমাদের স্কুলে প্রায় ১২০জন পড়ুয়া একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। তারা নিজেদের সমস্যার কথা বলে। আবার কোথাও কোনও খবর পেলে আমাকে এসে জানায়। আমি তৎপরতার সঙ্গে আরও কিছু তথ্য জোগাড় করি। তারপর চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটিকে জানিয়ে দিই। প্রথমদিকে টোল-ফ্রি নম্বরে ফোন করেও বেশ কয়েকটা বিয়ে আটকেছি। এখন জেলা প্রশাসন অত্যন্ত তৎপর। আমার দেওয়া তথ্য পেলেই তৎক্ষণাৎ কড়া পদক্ষেপ করে।
কিন্তু, বিদ্যালয় ও গ্রামের কয়েকশো ছাত্রীর মধ্যে কার বিয়ের আয়োজন হচ্ছে, তা কীভাবে খুঁজে বের করা সম্ভব? মনিজা বলে, আমাদের স্কুলে বা কোনও কোচিংয়ে যদি এক সপ্তাহ কেউ না আসে, তখনই এলাকায় খবর নিতে থাকি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিয়ের কথাবার্তা শুরু হতেই বিদ্যালয় বিমুখ হয়ে যায় ছাত্রীরা। তখন একটু খোঁজ নিলেই ঠিক জানতে পেরে যাই, কোথায় কার সঙ্গে বিয়ের যোগাযোগ হচ্ছে।
বহরমপুরের গজধরপাড়ার গাকুন্দা গ্রামের বাসিন্দা মনিজার বাবা পেশায় দিনমজুর। মা গৃহবধূ। দাদা পড়াশোনা শেষ করে যখন যা কাজ পায়, তাই করে। অভাবের সংসারে মনিজার মত দৃষ্টিভঙ্গি কতজনের থাকে! ডিস্ট্রিক্ট চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির চেয়ারপার্সন সোমা ভৌমিক বলেন, মনিজার মতো অনেক মেয়েই আজ আমাদের উদাহরণ। প্রত্যন্ত গ্রামে থেকে প্রতিদিন অভাবের সঙ্গে লড়াই করেও তারা এটুকু বুঝে গিয়েছে যে, অল্পবয়সে বিয়ে হলে কত সমস্যা হতে পারে। নাবালিকা বিয়ে বন্ধের জন্য মনিজা অসম্ভব ভালো কাজ করছে। -নিজস্ব চিত্র