১৪০ কোটি মানুষের ভারতে সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম বেকারত্ব। সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলিই রাজনীতির কারবারিদের কাছে উৎকৃষ্ট নির্বাচনী পণ্য। এজন্য বিধানসভা, লোকসভাসহ সমস্ত ভোটের আসরে যেসব ইস্যুতে তরজা জমে ওঠে তার শীর্ষে থাকে বেকার সমস্যা। ২০১৩-১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে নরেন্দ্র মোদি বেকারত্ব ইস্যুতেই যুবসমাজের মন জয় করেছিলেন। জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রথমবারের আক্রমণের লক্ষ্য ছিল নেহরু-গান্ধী পরিবার এবং কংগ্রেস সরকার। তাঁর অভিযোগ ছিল, কংগ্রেস সরকারগুলির অকর্মণ্যতার কারণে এবং সদিচ্ছার অভাবেই যুবসমাজের এই দুর্দশা। কেন্দ্রে সরকার গঠনে যুবসমাজের সমর্থন ভিক্ষা করেছিলেন মোদি। তাঁর প্রতিশ্রুতি ছিল, সরকার গড়তে পেলে এই যুবসমাজের প্রত্যেকের হাতে হাতে কাজ দেবেন। তার ফলে এই বেকার বাহিনীই, যারা দেশের ‘বোঝা’ বলে গণ্য হচ্ছে, তারাই হয়ে উঠবে আসল সম্পদ এবং দেশকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কারিগর। পুরো প্রথম দফা পার করার মুখে দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে, ২০১৯-এ এসেও নরেন্দ্র মোদি জানাননি কথার খেলাপের কী কারণ। তবু দেশবাসী তাঁকে আর একটা সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তিনি ফের প্রধানমন্ত্রী হন। দ্বিতীয় দফায় ব্যর্থ প্রধানমন্ত্রীকেও, ২০২৪-এ দেশবাসী সুযোগ দিয়েছে হ্যাটট্রিক করার। কিন্তু এই টানা বারো বছরেও বেকারত্ব ঘোচানো দূর, এক তিল কমাতেও কি পেরেছেন তিনি? এই একটি প্রশ্নে তাঁর পরম ভক্তরাও একবাক্যে স্বীকার করবেন যে, ‘না’। সমস্বরে এটাই বলবেন সকলে, চাকরি প্রদানে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং বেকারদের দিশা দেখাতে দেশের সবচেয়ে ব্যর্থ নেতার নাম নরেন্দ্র মোদি।
মোদিবাবু যতই হোক আমাদের সবার প্রধানমন্ত্রী। তাই বছরে দুই কোটি চাকরির খোঁচা দিয়ে তাঁকে আর লজ্জা দেওয়া ঠিক নয়। কিন্তু দগদগে ক্ষতে মলম দেওয়ার মতো করে তিনি তো আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন: ২০২৪ সালের আগে ১০ লক্ষ নিয়োগের ব্যবস্থা করবেন। গুচ্ছ রোজগার মেলা সাজিয়েও কিছু লাভ হল কি বেকারবাহিনীর? না। বরং নিখাদ সত্য এটাই যে, মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রধানমন্ত্রী ইন্টার্নশিপ যোজনাও। ২০২৫-এর স্বাধীনতা দিবসের ঘোষণা ছিল আরও বড়: আগামী দু’বছরে সাড়ে তিন কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে তাঁর সরকার এক লক্ষ কোটি টাকার প্রকল্প রূপায়ণ করবে। এই প্রচারকে সামনে রেখে বিহার বিধানসভা নির্বাচনে দাঁও মেরেছে বিজেপি জোট। কিন্তু এখনও পর্যন্ত অশ্বডিম্বের অধিক কিছু প্রসব করতে দেখল কি দেশ? দেখা যাক, কোন ছবি আঁকল সিএমআইই: গত মাসে দেশে গড় বেকারত্বের হার ছিল ৬.৯ শতাংশ। সংখ্যাটি ৪.৭ ছিল তার পূর্ববর্তী মাস নভেম্বরে। বৃদ্ধির শতকরা বিচারে দেখা যাচ্ছে, বছর শেষে মাত্র একমাসে কর্মহীনতার হার ৪৬ শতাংশ ছাপিয়ে গিয়েছে! এত বড় দেশটি সত্যিই যে বেকারত্বের জ্বালায় ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে এটাই তো তার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
কিন্তু এই অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি কেন? বিশেষজ্ঞদের সাফ বক্তব্য, স্থায়ী কর্মসংস্থানের দিক থেকে দ্রুত সরে এসেছে মোদি সরকার। তার বদলে গুরুত্ব আরোপ করেছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের উপরে। কী পুরুষ, কী মহিলা উভয় শ্রেণিই এই হতভাগ্যদের দলে। কোপ মারা হয়েছে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে (মনরেগা)। এই প্রকল্পে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ—একাধিক অজুহাতে টানা তিনবছর বঞ্চনা করা হয়েছে গ্রামবাংলার হতদরিদ্র শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে। নভেম্বরে দেশে শহর এবং গ্রামীণ এলাকার বেকারত্বের হারে যে তেমন কোনও ফারাক ছিল না, তার পিছনে মোদির এই ভ্রান্তনীতির ‘অবদান’ যথেষ্ট। মোদির টানা একযুগের শাসনকালে চাকরি বা কাজের সুযোগের বেনজির হাহাকার নিঃসন্দেহে এসব কারণেই। আর কবে গরিব, মধ্যবিত্ত আর বেকারদের বন্ধু হয়ে উঠবেন মোদি?