বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: মূল্যবৃদ্ধি, সাড়া না দেওয়া উৎপাদন ক্ষেত্র, তারপরও কর্পোরেট ট্যাক্সে বিপুল ছাড়। এই পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদি সরকারের রাজস্ব ভরার দায় এবং দায়িত্ব কার? সেই আম আদমির। চলতি অর্থবর্ষ, অর্থাৎ ২০২৫-২৬ সালের জন্য ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়ে ছাড় ঘোষণা করেছে কেন্দ্র। চাকরিজীবীদের জন্য সেই অঙ্কটাই ১২ লক্ষ ৭৫ হাজার। তারপরও আম জনতা কীভাবে ‘রক্ষাকর্তা’ হয়ে উঠবে? ছাড় ঘোষণার সময় অর্থমন্ত্রকই তো দাবি করেছিল, এর ফলে নাকি কেন্দ্রের এক লক্ষ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হবে। এখন অবশ্য সেই সরকারই মনে করছে, সাধারণ মানুষের পক্ষেই তা সম্ভব। প্রথমত, প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত জিএসটি আদায় বাড়িয়ে (তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছে স্টেট ব্যাঙ্কের রিপোর্ট)। আর দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত আয়করে।
গত কয়েকটি অর্থবর্ষে একটি পরিসংখ্যানই কিন্তু স্পষ্ট— কর্পোরেটের তুলনায় ব্যক্তিগত আয়করের ক্ষেত্রে আদায় বেশি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, চলতি অর্থবর্ষের ক্ষেত্রেও তেমনই আশা করছে কেন্দ্র! এবার আয়করের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ২৫ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা। আর এর মধ্যে আম জনতার আয়কর বাবদ আদায়ের টার্গেট ১৩ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি! অথচ কর্পোরেট কর বাবদ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা? ১০ লক্ষ ৮২ হাজার কোটি টাকা। আয়কর দপ্তরের কর্তারা বলছেন, এমনিতেই দেশে শিল্পের হার ততটা ভালো নয়। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শিল্প সংস্থাগুলি কতটা আয় বাড়াতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। সেই কারণেই সাধারণ মানুষের কাঁধে বন্দুক রেখে কর-বৈতরণী পেরতে চাইছে কেন্দ্র।
বিগত কয়েক বছর ধরেই দেশে কর্পোরেট কর আদায়কে ছাপিয়ে গিয়েছে ব্যক্তিগত আয়করের অঙ্ক। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে কর্পোরেট বা ব্যবসা থেকে আদায় হওয়া করের তুলনায় সাধারণ মানুষের থেকে প্রাপ্ত আয়কর প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকা বেশি ছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সেই পার্থক্য বেড়ে ১ লক্ষ ৯৬ হাজার কোটিতে পৌঁছয়। চলতি বছরে যে লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে, তাতে সেই ফারাক আরও বেড়ে ২ লক্ষ ৭৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানোর কথা।
আয়কর দপ্তরের কর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, গত অর্থবর্ষের তুলনায় এবার কর্পোরেট ট্যাক্স আদায় বাড়াতে হবে ৯৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সাধারণ মানুষের থেকে আদায় বাড়াতে হবে ১ লক্ষ ৭৭ হাজার কোটি। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে চলতি আর্থিক বছরে কর্পোরেট কর বাবদ আদায়ের টার্গেট দেওয়া হয়েছে ৩০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আম জনতার থেকে আদায় করতে হবে ৩৮ হাজার ৮০০ কোটি। অর্থাৎ এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা বেশি আয়কর আদায় করতে হবে পশ্চিমবঙ্গে।
আয়করে বিপুল ছাড় সত্ত্বেও কীভাবে আসবে এই টাকা? এর জন্য একাধিক পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কর্তাদের। প্রথমেই বলা হয়েছে, সার্চ এবং সার্ভে বাড়াতে হবে প্রতিটি রাজ্যে। অর্থাৎ আয়কর তল্লাশিতে জোর দেওয়া হবে বছরভর। আরও বেশি সংখ্যক মানুষ যাতে আয়করের আওতায় আসেন, তা নিশ্চিত করতে হবে কর্তাদের। তা কীভাবে সম্ভব? কলকাতায় আয়কর ভবনের এক কর্তার কথায়, ‘আমাদের বলা হয়েছে, ব্যাঙ্ক, অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জমি-বাড়ি রেজিস্ট্রেশন অফিসের মতো যেসব প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের লেনদেন হয়, সেগুলির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আরও নিবিড় করতে হবে। তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় বসতে হবে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলি যাতে নিয়মিত আমাদের তথ্য সরবরাহ করে, তার জন্য আইন আছে। কিন্তু তারপরও বহু ক্ষেত্রেই তথ্য এসে পৌঁছয় না। সেই তথ্যই আমাদের কর আদায় বাড়াতে সাহায্য করে। আমরা সেই কাজটিই করব।