Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শূন্যের মূল্য একদিন টের পাবেন মোদিজি

শূন্যের কোনও দাম নেই। অন্তত নরেন্দ্র মোদির সরকারের কাছে তো নেই-ই।

শূন্যের মূল্য একদিন টের পাবেন মোদিজি
  • ১৯ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: শূন্যের কোনও দাম নেই। অন্তত নরেন্দ্র মোদির সরকারের কাছে তো নেই-ই। বছরে দু’কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন মোদি। তাতে ১১ বছরে ২২ কোটি বেকারের চাকরি হওয়ার কথা। কিন্তু দিয়েছেন কত? ২২ লক্ষ। দু’টি শূন্য বাদ। তাতেও জল মেশানোর অভিযোগ। তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রমোশন পাওয়া ১০ লক্ষের নাম। ‘জল’ বাদ দিলে প্রকৃত সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়ায় ১২ লক্ষ। ভাষণের সঙ্গে বাস্তবের ফারাক ৯৯ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতির এক শতাংশও পূরণ করতে পারেনি কেন্দ্রের সরকার। শুধু প্রতিশ্রুতি পূরণেই ব্যর্থ নয়, বাংলায় ১০০ দিনের কাজ বন্ধ করে দিয়ে গরিবের পেটে মারা হচ্ছে লাথি। তাই বাংলায় কথা বললেও লাভ হবে না। কারণ ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই এমন গোঁসাইকে বাঙালি পছন্দ করে না। 

Advertisement

মোদি সরকারের ১১ বছরে চাকরির এই পরিসংখ্যানটা কোনও বিরোধী শিবিরের নয়। সম্প্রতি দিল্লিতে ‘পার্সোনেল, পাবলিক গ্রিভান্স এবং আইন ও বিচারবিভাগীয়’ সংসদীয় কমিটির বৈঠক হয়। সেখানে প্রথমে ২২লক্ষ চাকরি দেওয়ার দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু, তার মধ্যে পদোন্নতির নিয়োগপত্র পেয়েছেন ৭ লক্ষ ৮০ হাজার। আর দু’লক্ষ পদে নিয়োগ শুরু হয়েছে। তাই নরেন্দ্র মোদির আমলে ‘ফ্রেস রিক্রুটমেন্টে’র সংখ্যাটা ১২ লক্ষের কাছাকাছি। তারজন্য ‘রোজগার মেলা’ হয়েছে ১৬বার। এটাকে মোদি ভক্তরা অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকারের সাফল্য এবং অভিনব কর্মসূচি বলে দাবি করতেই পারেন। 
এর আগে কংগ্রেস, জনতা, এমনকী অটলবিহারী বাজপেয়ির আমলে লক্ষ লক্ষ চাকরি হয়েছে। কিন্তু কোনও প্রধানমন্ত্রী কোম্পানির সিইও-র মতো চাকরি প্রার্থীদের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেননি। তাঁরা মনে করতেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারের কর্তব্য। আর সেই কাজের জন্য আলাদা করে কোনও কৃতিত্ব দাবি করা যায় না। কিন্তু মোদিজি সেটা করেন। কারণ তাঁর সরকারের স্ট্র্যাটেজি, কাজ কম আওয়াজ বেশি। সেই আওয়াজ সপ্তমে তোলার লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রী শুরু করেছেন বাংলায় ডেলি প্যাসেঞ্জারি। 
‘খানেওয়ালেকো খানে কা বাহানা চাহিয়ে’ কথাটি জনপ্রিয় হয়েছে একটি কোম্পানি তাদের প্রোডাক্ট বিক্রির বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করায়। তবে, দিল্লি বিজেপির জন্য এটাই চরম বাস্তব। বছর ঘুরলেই বাংলার নির্বাচন। তাই ঘনঘন এ রাজ্যে আসার বাহানা খুঁজছে দিল্লি বিজেপি। কিছুদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী উত্তরবঙ্গে এসেছিলেন ‘অপারেশন সিন্দুরে’র সাফল্যের কৃতিত্ব দাবি করতে। মাস ঘুরতে না ঘুরতেই ফের বাংলায়। এবার দুর্গাপুরে। উপলক্ষ, বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন এবং শিলান্যাস। প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই যে কোনও সময় দেশের যে কোনও প্রান্তে যেতে পারেন। বাংলাতেও আসতে পারেন। কিন্তু, বাংলায় আসাটা কি একটু ঘনঘন হয়ে যাচ্ছে না? 
নির্বাচন এলে শিলান্যাস এবং উদ্বোধনের ঘটা বাড়ে। জনতার সামনে ‘গাজর’ ঝুলিয়ে ভোট নেওয়াটা রাজনীতির পুরনো কৌশল। সেই সিস্টেম মেনেই প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় আসা শুরু হয়েছে। তিনি দুর্গাপুরে এসে বেশ কয়েকটি প্রকল্পের শিলান্যাস করেছেন। আর এমন দু’টি রেলওয়ে ওভারব্রিজের সূচনা করেছেন, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসেই মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের কাজের উদ্বোধন সাধারণত স্থানীয় সাংসদ বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের মন্ত্রীরা করেন। সেই হিসেবে রেলমন্ত্রী বা জাতীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রীর উদ্বোধন করার কথা। কিন্তু, করলেন মোদি। কারণ তিনি শুধু দেশবাসীকে নয়, নিজের দলকেও বার্তা দিতে চাইছেন, আসমুদ্র হিমাচলে বিজেপির একটাই মুখ। নরেন্দ্র মোদি। তাই রামমন্দির বা সংসদ ভবন হোক কিংবা রেলওয়ে ওভারব্রিজ, সবেরই উদ্বোধক তিনিই।
রাজনীতিতে ইস্যু একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ঠিকমতো ইস্যু তৈরি করে তা আম জনতাকে খাওয়াতে পারলেই কেল্লা ফতে। তখন ইস্যু হয়ে যায় ‘গেম চেঞ্জার’। ২০১৪ সালে সুইসব্যাঙ্কের কালাধন ফিরিয়ে এনে প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ও আচ্ছে দিনের স্বপ্ন। ২০১৯ সালে বালাকোটে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। দেশবাসী ভেসেছিল জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগে। ২০২৪ সালে মোদিজি ‘ভগবান’ সাজতে গিয়েছিলেন। কিন্তু মানুষকে খাওয়াতে পারেননি। তাই বিরোধীদের দুর্বলতায় মোদিজি ক্ষমতায় বসেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর সরকার হয়ে গিয়েছে ‘ক্রাচ’ নির্ভর। তার একটি ঠেকনা নীতীশ কুমারের সমাজবাদী পার্টি। 
দিল্লি বিজেপি খুব ভালো করেই জানে, আসন্ন বিহার বিধানসভা ভোটে নীতীশ-বিজেপি জোট সরকারের পতন ঘটলে তার আঁচ গিয়ে লাগবে মোদি সরকারের গায়ে। এমনিতেই ‘পাল্টুরাম’ হিসেবে নীতীশ কুমারের যথেষ্ট সুনাম আছে। বিহার বিধানসভায় বিজেপির চেয়ে নীতীশ কুমারের দলের আসন সংখ্যা অনেক কম। তা সত্ত্বেও নীতীশই মুখ্যমন্ত্রী। বিজেপি তাঁকে ‘সোনার শিকল’ দিয়ে বেঁধে রেখেছে। বিহারে লালুর দল ক্ষমতায় এলে সেই শিকল ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তাই কি বিপুল সংখ্যক বিরোধী ভোটারের নাম বাদ দিয়ে নীতীশকে ক্ষমতায় ফেরানোর জন্যই ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’?
বিহারে ইতিমধ্যেই সাড়ে ৩৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। এখনও নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা পড়া আবেদনের স্ক্রুটিনি হয়নি। পরীক্ষার পর বাতিলের সংখ্যাটা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটাই দেখার। বিরোধীদের দাবি, মহারাষ্ট্রেও একইভাবে লক্ষ লক্ষ ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে জয় হাসিল করেছিল বিজেপি। বিহারেও সেই একই ছক।
঩ছাব্বিশের নির্বাচনের আগে বিজেপি বাংলাভাষীদের উপর রীতিমতো খড়্গহস্ত হয়ে উঠেছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী কাউকে পেলেই অত্যাচার করা হচ্ছে। তাতে বাঙালিরা দমে যাচ্ছে না, উল্টে বাংলা এককাট্টা হচ্ছে। এই সব করে বিজেপি বাঙালি বিদ্বেষী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে। পাশাপাশি আরও একটা মারাত্মক ঘটনা ঘটছে। এতদিন নির্বাচন কমিশন ভোটারদের 
ভোটদানে উৎসাহিত করত। তারজন্য নানান কর্মসূচি নিত। কিন্তু এবার হচ্ছে তার উল্টোটা। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, ভোটার তালিকায় নাম যুক্ত করা নয়, 
বাদ দেওয়াটাই উদ্দেশ্য।
বিহারের পরই বাংলার বিধানসভার ভোট। বাংলাতেও হবে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ। কিন্তু সেই কাজ শুরুর আগেই বঙ্গ বিজেপির নেতারা লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হবে বলে হুঙ্কার ছাড়ছেন। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য শিলিগুড়িতে ঘোষণা করেছেন, ‘এবার বাংলার ভোটার তালিকা থেকে ১৭ লক্ষ ভুয়ো ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হবে।’ 
বিজেপির রাজ্য সভাপতির এই ঘোষণায় প্রশ্ন উঠছে, সংশোধনের কাজ শুরুর আগেই শমীকবাবু কী করে জানলেন, কত নাম বাদ যাবে? বিজেপি বড়জোর এই দাবি করতে পারে, তারা ১৭ লক্ষ ভুয়ো ভোটারকে চিহ্নিত করেছে। সেই তালিকা তারা নির্বাচন কমিশনে দাখিল করবে। কিন্তু তা না বলে শমীকবাবু কত 
নাম বাদ যাবে তা আগাম ঘোষণা করে দিয়েছেন। 
এই দাবি না মিললে বুঝতে হবে, রাজ্য সভাপতির 
পদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফাঁকা আওয়াজ দেওয়ার কাজটা ভালোই রপ্ত করে ফেলেছেন তিনি। আর 
যদি মিলে যায় তাহলে প্রশ্ন উঠবেই অন্য কেন্দ্রীয় এজেন্সির মতো নির্বাচন কমিশনও কি বিজেপির হাতের পুতুল হয়ে গিয়েছে? 
এর আগে কেন্দ্রীয় এজেন্সি কোথায় কার বাড়িতে হানা দেবে, কাকে গ্রেপ্তার করবে, সেকথা বঙ্গ বিজেপির নেতারা আগাম জানিয়ে দিতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মিলেও যেত। এক্ষেত্রেও যদি তেমনটা ঘটে তাহলে বুঝতে হবে, গণতন্ত্রকে কফিনবন্দি করার কাজটা বিজেপি শুরু করে দিয়েছে।
অনেকে বলছেন, এবার দিল্লির অন্য নেতাদের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী একটু বেশিই বাংলায় আসবেন। তার কারণ অবশ্যই একুশের শোচনীয় পরাজয়ের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। গত পাঁচ বছর ধরে নানাভাবে বঞ্চনা করেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দমাতে পারেননি। তাই মরণকামড় দেওয়ার একটা চেষ্টা দিল্লি বিজেপি করবেই। তবে এছাড়া আরও একটি কারণ আছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। তাঁদের বক্তব্য, বয়সের কারণে লালকৃষ্ণ আদবানি, মুরলী মনোহর যোশীর মতো নেতাদেরও অবসর নিতে হয়েছে। এবছর সেপ্টেম্বর মাসে মোদিজির বয়স ৭৫ বছর পূর্ণ হবে। নিন্দুকে বলছে, পঁচাত্তরের গেরো কাটানোর জন্য তিনি আরএসএসের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। কিন্তু কোনও আশ্বাস তিনি জোগাড় করতে পারেননি। তাই তিনি যে এখনও অত্যন্ত সক্রিয়, সেটা দেখানোর ও বোঝানোর বাড়তি তাগিদ অনুভব করছেন। সেই তাগিদ থেকেই ঘনঘন আসছেন বাংলায়। এটা আপাতত চলবে। কারণ যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ