রাহুলের চ্যালেঞ্জ গিলতে পারছেন না মোদি!
  • ৮ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: ‘ডারো মাত’! রাহুল গান্ধীর মুখে আচমকাই কথাটা বড্ড চেনা এই বাংলায়। মাত্র ৬-৭ মাস আগে এই বঙ্গের পরিবর্তনের ভোটে ‘ভয় আউট ভরসা ইন’ স্লোগান দিয়েই শাসক তৃণমূলের পাকা ঘুঁটি কেঁচে দিয়েছিলেন মোদি-অমিত শাহ জুটি। দোসর ভুলে ভরা বিতর্কিত এসআইআর। সেই ভোট আইনি হোক কিংবা বেআইনি, মানতেই হবে কমিশনের সৌজন্যে আস্থা অর্জন করেছিলেন রাজ্যবাসীর। সেটাই ছিল তাঁদের অভূতপূর্ব সাফল্যের মিশেলে এ রাজ্যেকে ডবল ইঞ্জিনে পরিণত করার নির্ভেজাল খতিয়ান। মনে হয়েছিল, গেরুয়া দল, সংগঠন এবং সংঘ পরিবারের ভারতজোড়া বিস্তারের যুগলবন্দির পথে যাবতীয় বাধা বুঝি আপাতত উধাও। দাক্ষিণাত্য বিজয় বাদে আর কিছুই তো অজেয় রইল না গেরুয়া শক্তির। কিন্তু রাজনীতি শুধু সম্ভাবনার শিল্পই নয়, চমক আর অঘটনেরও নির্মম ফলিত বিজ্ঞান। আচমকা কখন কোথায় উলটো বাঁক নেয় সর্বশক্তিমানেরও তা অজানা। অদৃষ্টের এমনই পরিহাস, বছর ঘোরার আগেই সেই ‘ভয় পেও না’ স্লোগানের লক্ষ্য এখন অপ্রতিরোধ্য ১১২ ইঞ্চির মোদিজি স্বয়ং। বুমেরাং বোধহয় একেই বলে!

Advertisement

বিরোধীরা বুক ফুলিয়ে মুখের উপর শাসককে বলছে, ভয় পাবেন না, ভাবতে পারেন! আর ১২ বছরের একচ্ছত্র শাসক জাত খুইয়ে রাজপথে গণতন্ত্র বাঁচাও যাত্রায় শামিল। মুখোমুখি যেকোনো স্থানে পছন্দের বিচারক নিয়েও বিতর্কে বসতে অনীহা (বিরোধীদের কথায় পড়ুন ‘ভয়’!) কেন? এতদিন যাঁদের রাষ্ট্রবিরোধী বলে গাল দিয়েছেন সেই নেতাই পালটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ছেন, পাঁচ মিনিটে দেশদ্রোহী প্রমাণ করে ছেড়ে দেবে আপনাকে। শাসকের প্রবল হৃৎকম্প শুরুর পরিস্থিতি। শুধু আপনি নন জেন জি আর ককরোচদের আতঙ্ক যে গোটা সরকারটাকে তাড়া করছে শয়নে স্বপনে জাগরণে, তা বেশ বুঝতে পারছি। স্থান কাল পাত্র ভেদে বাংলা জয়ের তুরুপের তাসই আজ বিজেপির বিরুদ্ধে কংগ্রেস থুড়ি সম্মিলিত বিরোধীদের মারণাস্ত্র। রাজনীতির এই ওঠাপড়ার খেলায় ভয় আর ভরসা স্থান বদল করে অহরহ। এ আমাদের  খুব জানা অঙ্ক।  কিন্তু বাস্তব হচ্ছে, এই প্রথম ‘পাপ্পু’ রাহুলের আন্দোলনের অভিঘাতে মোদি জমানাকে কেমন নড়বড়ে ডিফেনসিভ লাগছে। প্রথমটায় বিশেষ পাত্তা না দিলেও শিক্ষামন্ত্রীকে হারাতে হয়েছে গত জুলাই মাসে, এসআইআর এবং ভোট চুরির ঘূর্ণিল আবর্তে বিশ্বাসযোগ্যতায় ক্ষত তৈরি হয়েছে নির্বাচন কমিশনের। যার দায় এড়াতে পারে না গডফাদার সরকারও। চোট পৌঁছেছে ভাবমূর্তিতে। কমিশনের শীর্ষ পদে কর্মরত এবং প্রাক্তন কর্তারা পর্যন্ত বলছেন যেভাবে বাংলায় ভোট হয়েছে তা আইনসম্মত নয়। নির্বাচন কমিশনের কাজ নাম যোগ করা, লক্ষ লক্ষ ভোটারকে বাদ দেওয়ার কুনাট্য আগাগোড়া নীতিবিরুদ্ধ। এভাবে বিশেষ সম্প্রদায় ও মানুষের ভোট কাড়া মানে তো আসলে জনগণের বিশ্বাস, সংবিধান ও লোকতন্ত্রের সঙ্গেই গদ্দারি! সব মিলিয়ে উত্তরপ্রদেশ এবং পাঞ্জাবের গুরুত্বপূর্ণ ভোটের আগে যথেষ্ট উদ্বেগে শাসক শিবির। দেওয়ালির পর যা ক্লাইমাক্সে পৌঁছাবে নিঃসন্দেহে। শাসক ধাক্কা খেলে বদলে যাবে ক্ষমতার জ্যামিতি।
এটা আজ প্রমাণিত সত্য যে মূলত বাংলা দখলের জন্যই এসআইআর, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির অবতারণা। প্রায় ১ কোটি নাম বাদ দিয়ে ভোটের অনেক আগেই ভোট শেষ করে দেওয়ার হিংস্র কৌশল। জ্ঞানেশ কুমার, সীমা খান্নাদের বাড়বাড়ন্তের পিছনে কে? শেষে লক্ষ্যপূরণ হলেও ৪ মে’র ঐতিহাসিক পালাবদলের পরও বাংলা ভয়হীন আস্থার স্বর্গ হয়নি। তোলাবাজি, দুর্নীতি, দল ভাঙাভাঙির ত্র্যহস্পর্শে একশো শতাংশ ‘ভরসা’র মৃগয়াভূমি প্রতিষ্ঠিত হয়নি ৬ মাসে। বরং ডাকাত ও লুটেরারাই দিব্যি রং বদলে দল পালটে বহাল তবিয়তে। এই  কুনাট্য বাংলার পরিবর্তনকামীদের মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। সব পালাবদলই সময়ের ফেরে না পাওয়ার হতাশায় পর্যবসিত হয় কালের নিয়মে। ৭৭-এর আশা ৩৪ বছর পর এগারোর দুরাশায় পর্যবসিত, তারই পুনরাবৃত্তি ছাব্বিশে তৃণমূল বিদায়ে। দেখা যাক সিঙ্গুরে অশোক লেল্যান্ডকে এনে নিদেনপক্ষে সান্ত্বনা পুরস্কারটা রাজ্যবাসীর কপালে জোটে কি না! পালাবদলের উচ্ছ্বাস প্রতিবারই এত কম সময়ে ফিকে হয়ে গেলে মানুষ কিন্তু সেই পুরানো কাহবতেই আশ্রয় নেবে, যে যায় লঙ্কায় সেই হয়...!
২২ রাজ্য জয়, টানা আড়াই টার্ম প্রধানমন্ত্রীর আসন অলংকৃত করার পরও মোদিজির মনে আজ অনিশ্চয়তার সুদীর্ঘ ট্র্যাজেডি। এটা মানতেই হবে বিজেপি আজ শুধু সংখ্যার হিসাবে বৃহত্তম দলই নয়, দেশের সবচেয়ে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি। একমাত্র দাক্ষিণাত্য ছাড়া উত্তর, পূর্ব, পশ্চিম সর্বত্রই সে নিরঙ্কুশ। তবু প্যাঁচে পড়ে সর্বশক্তি দিয়ে ড্যামেজ কন্ট্রোলে মরিয়া দল ও সরকার। বুঝতে পারছেন, যতই ইভিএমে কমল খেলুক, কোথাও একটা ক্ষয় বাসা বেঁধেছে। ভরসা সরছে। দ্রুত তা মোকাবিলা করতে না পারলে সর্বনাশ! একেই কি বলে বুমেরাং হওয়া! আন্দোলন দেখলেই পাকিস্তানের চর, রাষ্ট্রবিরোধী, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী কিংবা দিমাগি নকশাল বলে দেগে দেওয়ার বাজার চলতি গেরুয়া ন্যারেটিভ বহুল ব্যবহারে আর কাজ করছে না। এই প্রথম বিরোধী দলনেতা সংসদের বাইরে মুখোমুখি বিতর্কের চ্যালেঞ্জই শুধু ছোড়েননি, যুক্তিতর্কের সভায় আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতকে বিচারকের ভূমিকায় বসানোর প্রস্তাব দিতেও কসুর করেননি। সম্মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, গত একযুগ যিনি আশ্চর্য দাপটে দেশ শাসন করেছেন, নেহরুর রেকর্ড ভাঙার স্পর্ধা দেখিয়েছেন তাঁকে পাঁচ মিনিটে তাঁরই পাতা ফাঁদে ফেলে ‘দেশবিরোধী’ প্রমাণ করার হিম্মত রাজীবপুত্র দেখাচ্ছেন কোন সাহসে? সত্য মিথ্যা যাই হোক, অভিযোগের সারবত্তা থাকুক কিংবা নাই থাক, রাজনীতিতে সাহস আর আত্মবিশ্বাসটাই সব। হঠাৎই রাহুল গান্ধীর আচরণ, ব্যক্তিত্ব এবং বক্তব্যে সেই ঝাঁঝ। ঠিক নতুন ধার দেওয়া কৃপাণের মতো লকলকে দেখাচ্ছে। সামনে পড়লেই আড়াআড়ি দু-আধখান! 
এই চাপেরই নিট ফল, ১২ বছরে প্রথমবার সরকারকে উৎসব মরশুমেও রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। অস্বস্তিতে ফেলছে শাসক দল বিজেপিকে। লোকতন্ত্র বাঁচাও ও অরাজকতা হটাও কর্মসূচিতে একইদিনে অমিত শাহ সভা করছেন হায়দরাবাদে আর সর্বভারতীয় সভাপতি দুপুর বিকেল বক্তব্য রাখছেন ভাগলপুর ও কলকাতায়। দল ঘোষণা করেছে, দেওয়ালি গেলেই উত্তরপ্রদেশে মোদিজিসহ বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব ঝাঁপিয়ে পড়বে সর্বশক্তি নিয়ে। পাঞ্জাবে অপারেশন লোটাসও সেই উদ্দেশ্যেই। কাশ্মীরে শাসক ন্যাশনাল কনফারেন্সেও বিদ্রোহ দানা বাঁধছে বিজেপির মদতে। এর থেকেই অনুমান করতে বাধা নেই, তির ঠিক জায়গায় গিয়ে লেগেছে। তাই রামলীলার বিশাল জনসভাকে মুখে ফ্লপ বলেও অস্বস্তি ঢাকতে পারছেন না বিজেপি হাইকমান্ড। উদ্বেগ তাড়া করছে গোটা দলটাকে। মারমুখী রাহুল বলছেন, ‘মোদিজি, দেশকে মিথ্যা বলা বন্ধ করুন। আপনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বিদেশি সাহায্যে, প্রধানমন্ত্রী পদে আসীনও রয়েছেন বিদেশি সাহায্যে। এমন বিস্ফোরক নজিরবিহীন আক্রমণ দু’দিন আগেও কিন্তু অভাবনীয় ছিল। হঠাৎ কোন আত্মবিশ্বাস থেকে এতটা মেরুদণ্ড সোজা রাহুলের। মোদি সরকার যে বিদেশি শক্তির কথায় চলছে, অর্থনীতিও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বাইরের দেশের কথায়, তার ভাণ্ডাফোঁড় করার সদর্প হুমকি দেওয়ার নৈতিক সাহস আসছে কোথা থেকে যদি শাসকের কোনো অনাচার না থেকে থাকে!
এমনিতে পরবর্তী ১৯তম লোকসভা ভোট ২০২৯ সালে। ২২টা রাজ্য বিজেপির দখলে। দুই তৃতীয়াংশ নাহলেও রাজ্যসভা ও লোকসভায় শাসকের গরিষ্ঠতাও প্রশ্নাতীত, তবু সেই জুলাই মাস থেকে রাজধানীর বুকে প্রথমে ককরোচ এবং সম্মিলিত বিরোধীদের আন্দোলনের ধাক্কায় সরকারটা ক্রমেই বেকায়দায়। এই চলতি আন্দোলনের প্রথম বলি দেশের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তারপর সামান্য বিরতি দিয়েই এসআইআর ‘জুলুম’-এর নায়ক জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা দাবি ঢেউ তুলেছে। একদা জাতীয় রাজনীতির শান্ত নদীর নিয়ন্ত্রণ আজ কার্যত আরশোলা ও বিরোধীদের হাতে। সরকার ও তার বাজনদার মুখপাত্র নিজেরা আর নতুন কোনো পালটা ন্যারেটিভ হাজির করতে না পেরে শুধু রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের ভোঁতা প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন সকাল সন্ধ্যা। ১২ বছরে এই প্রথম মনে হচ্ছে, খোলস ছেড়ে ‘পাপ্পু’ ক্রমে ‘বাঘ’ হয়ে উঠছেন দ্রুত! কিংবা স্থান পরিবর্তন করছে পাপ্পু আর বাঘ! এই জন্যই বলে, সময় বড়ো বলবান। তার চেয়েও শক্তিশালী সংবিধান, গণতন্ত্র ও ১৪০ কোটি জনগণের! চলমান এই খেলায় আজ যে রাজা, সময়খণ্ডের কালবেলায় নিমেষে সেই সর্বহারা ফকির। নাম নিশান মিটে যায় ক্ষমতার পালাবদলে। ভোটে জিতে ক্ষমতার মধ্যগগন থেকে বিস্মৃতির অতলে পৌঁছায় চোখের পলক পড়ার আগেই। 
না হলে কোন অস্বস্তি থেকে দেশের শাসক লজ্জার মাথা খেয়ে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ অভিযানে নামে? দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি মুখে বলেন গণতন্ত্র ও বিশৃঙ্খলা রুখতে পথে নামছেন, তাহলে তো বলতেই হয় তিনি ওই পদে থাকার নৈতিক অধিকারটাই হারিয়ে ফেলেছেন! পুলিশ, আধাসেনা, র‌্যাফ প্রভৃতি সবই তো আপনার হাতে। তাহলে গণতন্ত্র বাঁচাবে কে? ডবল ইঞ্জিন, ট্রিপল ইঞ্জিন, গত ১২ বছরের ভোটের ফল এত সহজে ভেসে যাবে স্মৃতি উজিয়ে? আর আপনি গণতন্ত্রের কাস্টোডিয়ান ফ্লপ চিত্রনাট্য সাজাবেন পিঠ বাঁচাতে!
সেদিনের বেচারা পাপ্পুই খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। বলছেন, পাঁচ মিনিটেই নাকি প্রমাণ হয়ে যাবে, শাসক নাকি ‘দেশদ্রোহী’। এসআইআর কি শেষে নরেন্দ্র মোদির ওয়াটারলু হতে চলেছে? আমরা বাঙালিরা কিন্তু মোদিজিকে কোথাও যেতে দেব না। আমাদের দুটো লাড্ডুই চাই। ৩১ সালে সোনার বাংলা এবং ৪৭ সালে বিকশিত ভারত! পরীক্ষাটা কিন্তু খুব কঠিন।