আত্মশুদ্ধি দরকার
  • ৮ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সৌজন্যে অবশেষে জানা গেল, ‘অ্যাবসেন্ট’ বা ‘অনুপস্থিত’ মানে ‘অনুপ্রবেশকারী’! এটাকে একপ্রকার আবিষ্কারও বলা যায়! ২০২৫-এর জুন মাসে দেশে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর অনেক আগে থেকেই বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করে আসছেন, এদেশের ভোটার তালিকা অনুপ্রবেশকারীতে ভরে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, এই ‘ঘুষপেটিয়াদের’ জন্য সীমান্তবর্তী রাজ্য ও জেলাগুলির জনবিন্যাস বদলে গিয়েছে। দেশের মাটি, জল, কর্মসংস্থানে ভাগ বসাচ্ছে এই বেআইনি অনুপ্রবেশকারীরা। প্রধানমন্ত্রীর চোখ দিয়ে বিজেপির নানা মাপের নেতারাও কোটি কোটি বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা খুঁজে পেয়েছেন। এই কোটি কোটি বিদেশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতেই শুরু হয়েছে এসআইআর। অমিত শাহের ভাষায়, এই অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকায় ‘ডিটেক্ট’ করে ‘ডিলিট’ ও ‘ডিপোর্ট’ করা হবে। দেশে এসআইআর-এর কাজ এখনও শেষ হয়নি। কিন্তু ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলে বিরোধীদের দাবি, এ পর্যন্ত ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এর মধ্যে ৬.১৫ কোটি ভোটারের ঠিকানা বদল হয়েছে। একাধিক জায়গায় ভোটার ছিলেন ১ কোটি। প্রায় ৩ কোটি ভোটার মারা গিয়েছেন। বাকি প্রায় ৩ কোটি ভোটারের কোনো হদিশ পাওয়া যায়নি। নির্বাচন কমিশনের ভাষায়, এরা ‘অ্যাবসেন্ট’ বা ‘অনুপস্থিত’। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বোধহয় এই অনুপস্থিত ভোটারদের ‘বাংলাদেশি’ অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করে ফের দেশছাড়া করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন! 

Advertisement

একজন জনপ্রতিনিধি বা মন্ত্রীর কাছে দেশবাসী আশা করে, তিনি সরকারি নথি, তথ্যের উপর ভিত্তি করে কথা বলবেন। কিন্তু শাহদের পাঠশালায় বোধহয় অন্যরকম কিছু শেখানো হয়। একথা বলার কারণ, প্রথমত, বিদেশি চিহ্নিতকরণের কোনো এক্তিয়ারই নেই নির্বাচন কমিশনের। কোনো ব্যক্তিকে বিদেশি বলে সন্দেহ হলে তাঁর বা তাঁদের নাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে পাঠায় কমিশন। মন্ত্রকেরও একইরকম সন্দেহ হলে তা পাঠিয়ে দেয় ফরেনার্স ট্রাইবুনালে। তারা সন্দেহভাজনকে নোটিস দিয়ে প্রমাণ দাখিল করতে বলে এবং তার ভিত্তিতে রায় দেয়। সেই রায় অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে না গেলে তিনি বিচার পেতে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। অমিত শাহের দাবি মানলে ধরে নিতে হবে, এই তিন কোটি ‘অনুপস্থিত’ ভোটার দীর্ঘ পদ্ধতিগত পথ পেরিয়ে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসাবে শনাক্ত হয়েছেন। কিন্তু ঘটনা হল, এমন কোনো কিছুই হয়নি। দ্বিতীয়ত, অনুপ্রবেশ নিয়ে তথ্য জানার অধিকার আইনে এক প্রশ্নের জবাবে গত ২৩ জানুয়ারি অমিত শাহের মন্ত্রক জানায়, অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্তকরণ, গ্রেপ্তার ও নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে তাদের কাছে নেই। তৃতীয়ত, দেশের বেশিরভাগ রাজ্যে এসআইআর হওয়ার পরে কত অনুপ্রবেশকারী পাওয়া গেল, তার কোনো তথ্য সরকারিভাবে দেয়নি নির্বাচন কমিশন। বরং এটা দেখা তাদের কাজ নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে জ্ঞানেশ কুমারের কমিশন। চতুর্থত, সম্প্রতি কর্ণাটক, ঝাড়খণ্ড, কেরলম, মেঘালয়, গোয়া ও মিজোরামে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যে জানা গিয়েছে, এই ছ’টি রাজ্য মিলিয়ে মাত্র ১৬৪০ জনকে বিদেশি বলে চিহ্নিত করা গিয়েছে। এদের অধিকাংশই নেপালের বাসিন্দা। তাই প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে তিন কোটি অনুপ্রবেশকারী এবং তাঁরা বাংলাদেশি—এই জল মেশানো মনগড়া আজগুবি তথ্য পেলেন কোথায় অমিত শাহ? প্রত্যাশিতভাবেই তার জবাব মেলেনি এখনও। 
এর চেয়েও বড়ো প্রশ্ন হল, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য মেনে নিলে জাতীয় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের আর একদিনও কি পদে থাকা উচিত? শাহ যে ‘অনুপস্থিত’ তিন কোটি ভোটারকে ইতিমধ্যে ‘বাংলাদেশি’ অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা সহ বাদ যাওয়া সব ভোটারেরই নতুন করে ভোটার তালিকায় নাম তোলার সুযোগ করে দিতে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে কমিশন। তাহলে মানে দাঁড়াল, চিহ্নিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা ভারতের ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য আবার সুযোগ পাবেন! যাঁর ইস্তফার দাবিতে গোটা দেশের বহু মানুষ সোচ্চার, সেই জ্ঞানেশ কুমারের এই নতুন সিদ্ধান্তের মধ্যে অমিত শাহের দাবিকে ‘এলেবেলে’ বলে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হল কি না, সেই চর্চা শুরু হয়েছে। অনুপ্রবেশকারী প্রশ্নে একটা কথা বলতেই হয়, সনাতনী হিন্দু ধর্মে আত্মশুদ্ধির নিশ্চয়ই সুযোগ রয়েছে। ক্ষমতায় যত দিন রয়েছেন, তার মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি সেই চেষ্টাটা চালিয়ে যান, তাহলে তাঁর নিজের তো বটেই, দেশেরও মঙ্গল।