Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ফার্স্ট বয়দের থেকে টুকে আর কতদিন?

আসলে যেসব জায়গায় আমাদের সরকার আমেরিকা এবং চীনের নীতিনির্ধারকদের থেকে টুকতে পারছেন সেইসব জায়গাতেই তাঁরা বিশদ ব্যাখ্যানে যেতে দুবার ভাবছেন না।

ফার্স্ট বয়দের থেকে টুকে আর কতদিন?
  • ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: ভূ-রাজনীতি হোক কী অর্থনীতি, মোদি জমানায় আইডিয়ার দৈন্য চোখে পড়ার মতন। দূরদর্শিতার অভাবে যখন সাধারণ মানুষের হাতে টাকা তুলে দেওয়া দরকার ছিল, তখন সরকার যথেচ্ছ টাকা বিলিয়েছেন কর্পোরেটের হাতে। আবার যখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পুঁজির জন্য সরকারের দোরে হত্যে দিতে পড়েছিল, নরেন্দ্র এবং নির্মলারা তখন বেঙ্গালুরুর কতিপয় স্টার্টআপের সাফল্যের কুমিরছানা দেখিয়ে চলেছিলেন।

Advertisement

ফল হয়েছে এই যে চীন তো দূরস্থান, তুলনামূলকভাবে নতুন মুখ ভিয়েতনামের সঙ্গেও ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এঁটে উঠতে পারছে না। ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পপতিদের জন্য নির্মলা দশ হাজার কোটি টাকার ফান্ড ঘোষণা করেছেন—কোনো সন্দেহ নেই বিজেপির আইটি-সেল এই নিয়ে সামনের বছর জুড়ে ঢক্কানিনাদ চালাবে। ভালো খবর এই যে, এবারে অন্তত স্কিল, ট্রেনিং এইসব শব্দের মধ্যে অনর্থক না জড়িয়ে সরকার সরাসরি ঘোষণা করেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পুঁজির পথ সুগম করা হবে। খারাপ খবর এই যে, এই ঘোষণাটুকুই সার, সমস্যার গভীরে গিয়ে সরকার কতটা ভেবেছে তার কোনো দিশা নেই বাজেটে।

ভারতের জাতীয় সম্পদের মাত্র ১ শতাংশ আসে বিদেশি বিনিয়োগের হাত ধরে। এই কঠিন অবস্থায়, বেসরকারি পুঁজি যদি ক্ষুদ্র শিল্পে না আসে তাহলে সরকার কি নিজে সেই দায়িত্ব নেবে? আবার উত্তর ও মধ্য ভারত জুড়ে বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ধুঁকছে উষ্ণায়নের হেতু। সেই ব্যাপারেই-বা নির্মলারা কী ভেবেছেন? বাজেটে যথারীতি কোনো উত্তর নেই।

এদিকে যে দূষিত বাতাস সারাবছর আম-ভারতীয়ের জীবনকে দুর্বিষহ করে রেখেছে, তার বিরুদ্ধে লড়ার জন্যও আমাদের হাতে বিশেষ পুঁজি নেই। কারণ এবছরের বাজেটে নির্মলা দূষণখাতে খরচ কমিয়ে ধরেছেন। সার্বিকভাবেও ‘ক্লাইমেট ক্রাইসিস’ নিয়ে যৎসামান্য বাজেট রেখেছেন নরেন্দ্র এবং নির্মলা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেখানো পথ ধরেই। ফলে পীযূষ গোয়েলরা যতই আক্ষেপ করুন কেন তরুণ প্রজন্ম নতুন, মানবমুখী শিল্পের সন্ধান দিচ্ছে, সরকার নিজেই যদি বাজেটে তাঁদের উৎসাহিত করার বিন্দুমাত্র জায়গা না রাখে তাহলে গিগ-শ্রম ছাড়া হাতে আর থাকেই-বা কী!

তরুণ প্রজন্মের প্রসঙ্গে ‘বর্তমান’ পত্রিকার পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে, ভারতবর্ষের এই মুহূর্তে অন্যতম বড়ো অর্থনৈতিক সমস্যা হল বেকারি। এবং এআই যে কী ভবিষ্যৎ লিখছে, তা আমরা কেউই জানি না। প্রখ্যাত অস্ট্রিয়ান অর্থনীতিবিদ শুমপিটারের তত্ত্ব অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন’ এর পথ ধরে চলছে কি না আমরা এখনো জানি না। শুধু এইটুকুই জানি ‘ক্রিয়েশন’ যদি ঘটেও তার আগে ধ্বংসলীলার পরিমাণটি নেহাত কম হবে না। এবং তার প্রভাব সবার আগে এসে পড়বে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপর। উন্নত দেশগুলি যখন এই প্রসঙ্গে চিন্তাভাবনা করছে সবার হাতে টাকা তুলে দেওয়া যায় কি না। নির্মলা এবছরের বাজেটে জানিয়েছেন, সরকার একটি কমিটি গঠন করছে এই সমস্যা খতিয়ে দেখার জন্য। আবারও সেই একই ভুল—কমিটি আদৌ কী করবে, কবে করবে, কেউ জানে না। অথচ সফটওয়্যার ডেভেলপার থেকে শুরু করে মার্কেটিং এগজিকিউটিভ, কর্পোরেট উকিল থেকে শুরু করে প্রচ্ছদশিল্পী, প্রত্যেকের চাকরির উপরেই এআই থাবা বসাতে শুরু করেছে বা শীঘ্রই করবে।

বিবিসি দুদিন আগে জানিয়েছে, ভারতের পাঁচটি সর্ববৃহৎ আইটি কোম্পানি গতবছরের প্রথম ন’মাসে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় মাত্র ১৭টি বেশি চাকরি তৈরি করতে পেরেছে। হ্যাঁ, লাখ বা হাজার না, নিট লাভ ২ ডিজিটে! মনে রাখা দরকার, ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে শিল্পোৎপাদনের ভূমিকা প্রায় নেই বললেই চলে। ১৪০ কোটি মানুষের দেশ, উপভোক্তা এবং সার্ভিস-দাতাদের হাত ধরেই অর্থনীতির চাকা চলছে। ম্যানুফাকচারিংয়ে বৃদ্ধির হার কংগ্রেসের সময়ের প্রায় অর্ধেক। এদিকে, আইটি এবং অন্যান্য সার্ভিস সেক্টর ধূলিসাৎ হয়ে গেলে অর্থনৈতিক পতন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। ভাবছেন, নির্মলা নিশ্চয় এই ব্যাপারে কিছু বলেছেন? না, একটি কথাও নয়।

আসলে যেসব জায়গায় আমাদের সরকার আমেরিকা এবং চীনের নীতিনির্ধারকদের থেকে টুকতে পারছেন সেইসব জায়গাতেই তাঁরা বিশদ ব্যাখ্যানে যেতে দুবার ভাবছেন না। কিন্তু যে জায়গায় অনুকরণের সুযোগ নেই, সেখানে তাঁদের মুখে স্পিকটি নট। ট্র্যাজিকমেডি এটাই যে, অনুকরণ করতে গিয়ে তাঁরা বাস্তবের সঙ্গেও সম্পর্করহিত হয়ে পড়ছেন। নির্মলা যেমন এবারের বাজেটে ভারতের সেমিকন্ডাকটর মিশন ১.০-কে সফল ঘোষণা করে জানিয়েছেন, এবার শুরু হবে মিশন ২.০ এবং ভারত সেমিকন্ডাকটরের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে।

সমস্যা এই যে, ভারতে সেমিকন্ডাক্টরজনিত গবেষণা এখনো অনেকটা গবেষণাগারের চৌহদ্দিতে আটকে। তাকে একুশ শতকের উপযুক্ত করে তোলার জন্য দরকার অপরিসীম পুঁজি, যা সরকার বা ভারতীয় কোম্পানিদের নেই। দরকার বিদেশি পুঁজি। সেখানেও শুধুই হতাশা। বিশ্বব্যাপী বিদেশি পুঁজির মাত্র ২ শতাংশ ভারতে আসে। এবং তাও থাকবে কি না জানা নেই। তাইওয়ানের একাধিক সেমিকন্ডাকটর কোম্পানি, যারা সর্বার্থেই ‘ওয়ার্ল্ড লিডার’ তারা শেষ কিছু বছরে অনেক উৎসাহ দেখিয়েও শেষমুহূর্তে পিছিয়ে এসেছে ভূ-রাজনৈতিক কারণে। পুতিনের থেকে সস্তায় তেল কিনতে গিয়ে আমেরিকা এবং ইউরোপের চাপে সেমিকন্ডাক্টর ক্ষেত্রে কোনো পুঁজিই ঢোকেনি।

সরকারি বাজেট দেখলে মনে হতে পারে নরেন্দ্র এবং নির্মলারা এসব খবরই রাখেন না। যদিও বিজেপির আমলে কোনো কিছুই অস্বাভাবিক নয়, তাও ধরে নেওয়া যায় সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে তাঁরা মোটের উপর ওয়াকিবহাল। তাহলে আমাদের প্রাপ্তি শূন্য কেন? কারণ ট্রাম্প এবং শি জিনপিংয়ের খাতায় এ নিয়ে কিছু লেখা নেই। আরও একটি কথা বলা দরকার, এই বাজেটে বাংলার যুব শ্রেণির জন্য কোনো সুখবর রাখেননি নির্মলা। অথচ প্রত্যাশা ছিল যে, বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে মোদি সরকার অন্তত এবার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবে।

 লেখক ব্রিটেনের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সের অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ