নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: সাতসকালে হাসপাতালের ওয়ার্ড বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়ায় ঢেকে যায় চারপাশ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে মায়েদের মধ্যে। সিউড়ি সদর হাসপাতালের পুরাতন বিল্ডিংয়ের শিশু বিভাগে মোবাইল বিস্ফোরণকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার চরম উত্তেজনা ছড়ায়। কোলের শিশুকে নিয়ে মায়েরা ওয়ার্ড থেকে দ্রুত বাইরে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁদের আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়, যখন দেখেন ওয়ার্ডের গেটে বাইরে থেকে তালা দেওয়া। বের হওয়ার আরও উপায় নেই। ভাগ্যক্রমে মোবাইল বিস্ফোরণ থেকে আগুন আর অন্যত্র ছড়ায়নি। তবে, বিপদের মুহূর্তে ‘খাঁচায় বন্দি’ দশা দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন রোগীর পরিজনেরা। প্রশ্ন উঠছে, বড়সড় অগ্নিকাণ্ড ঘটলে এই শিশুদের প্রাণ বাঁচানোর দায়িত্ব কে নিত?
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বিস্ফোরণ হওয়া ফোনটি শিশু বিভাগের এক রোগীর মায়ের। মঙ্গলবার সকালে শিশুটির বেডের বালিশের উপর মোবাইলটি রাখা ছিল। সূত্রের খবর, ফোনটি সেই সময় চার্জে বসানো ছিল। হঠাৎই মোবাইলটি থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখে তড়িঘড়ি সেটি মেঝেয় ছুঁড়ে ফেলেন ওই শিশু রোগীর মা। মেঝেতে পড়তেই সশব্দে ফেটে যায় ফোনটি। উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের তীব্রতায় চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওয়ার্ডে থাকা অক্সিজেনের পাইপলাইন, অক্সিজেন সিলিন্ডারের কথা মাথায় আসতেই শিউরে ওঠেন সকলে। কোনোক্রমে জ্বলন্ত ফোনটি দূরে সরিয়ে দেওয়ায় বড় অগ্নিকাণ্ড এড়ানো সম্ভব হয়েছে ঠিকই, কিন্তু হাসপাতালের অব্যবস্থা ও সচেতনতা নিয়ে উঠেছে একগুচ্ছ প্রশ্ন। বাঁশরার আর্জিনা বিবির মতো অভিভাবকরা আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে বলছিলেন, সবাই তো পুড়ে মরে যেতাম, কেউ বাঁচতাম না। বাথরুমে থাকা অবস্থায় চিৎকার চেঁচামেচি শুনে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন প্রতিমা বাগ, কিন্তু সদর দরজায় তালা থাকায় অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তাঁকে। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে রাতে ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ রাখা হলেও, সাত সকালেও কেন সেই তালা খোলা হয়নি, তা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোগীর পরিজনেরা। প্রশ্ন উঠছে, জরুরি পরিস্থিতিতে যেখানে এক-এক সেকেন্ড মূল্যবান, সেখানে কেন তৎক্ষণাৎ চাবি হাতে কর্মীদের দেখা মিলল না? এ বিষয়ে হাসপাতালের ফেসিলিটি ম্যানেজার দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায় অবশ্য জানান, ওয়ার্ডে শিশুদের সঙ্গে কোনও পুরুষ থাকতে পারেন না। একমাত্র শিশুর মায়েরাই থাকেন। তাঁদের গোপনীয়তা ও সুরক্ষার খাতিরেই গেটে তালা লাগানো থাকে। ঘটনার পরেই সিকিউরিটি ও পুলিশ কর্মীরা ছুটে এসে তালা খুলে দেন। তৎপর হয়ে ওয়ার্ড ফাঁকা করে দেন। খুব দ্রুততার সঙ্গেই পরিস্থিতির মোকাবিলা হয়েছে। আমাদের দিক থেকে কোনো ত্রুটি ছিল না। তবে, এই দুর্ঘটনার দায় তিনি ঠেলেছেন পরিজনদের অসচেতনতার দিকেই। তাঁর দাবি, ওয়ার্ডের ভিতর মোবাইল চার্জ দিতে বারবার বারণ করা হয় রোগীদের। এমনকি, ওয়ার্ডের দেওয়ালে এসংক্রান্ত নির্দেশিকাও লেখা আছে। আমরা মাঝেমধ্যেই অভিযানও চালাই। মোবাইল চার্জ দেওয়া আছে দেখতে পেলে ফোন কেড়ে পর্যন্ত নেওয়া হয়। কিন্তু তারপরেও রোগী কিংবা রোগীর পরিজনরা শোধরান না। নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে আনেন। • এই মোবাইলটিতেই বিস্ফোরণ হয়। -নিজস্ব চিত্র