Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

জয়নগরের মোয়া

প্রায় তিরিশ বছর পর আজ আবার বারুইপুরে এলেন নিখিলেশ চক্রবর্তী। নিখিলেশবাবু স্বনামধন্য শিশু-সাহিত্যিক। উনি ছোটোদের জন্য মজার মজার গল্প, উপন্যাস লেখেন।

জয়নগরের মোয়া
  • ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়: প্রায় তিরিশ বছর পর আজ আবার বারুইপুরে এলেন নিখিলেশ চক্রবর্তী। নিখিলেশবাবু স্বনামধন্য শিশু-সাহিত্যিক। উনি ছোটোদের জন্য মজার মজার গল্প, উপন্যাস লেখেন। নামী নামী পত্রপত্রিকায় ওঁর লেখা সেইসব গল্প উপন্যাস ছাপা হয়। আর শুধু ছোটোরাই নয়, বড়োরাও নিখিলেশবাবুর লেখা পড়ে বেশ মজা পায়। তবে এখন আর মজার গল্প লিখতে নিখিলেশবাবুর তেমন ভালো লাগে না। প্রায়ই মনে হয় সেই কবে থেকে একই ধরনের গল্প লিখে যাচ্ছেন, এবার একটু লেখার ধরনটা পাল্টানো উচিত। নিখিলেশবাবুর খুব ইচ্ছা এবার একটা হাড় হিম করা ভূতের গল্প লিখবেন। তবে লিখব লিখব করেও এখনও পর্যন্ত ভূতের গল্পটা আর লিখে উঠতে পারেননি। তার কারণ, উনি নিজে কখনও ভূত দেখেননি। আর ভূত-প্রেতে তেমন বিশ্বাসও করেন না। তাই একটু চিন্তায় আছেন। ভূতের গল্পটা ঠিকঠাক লিখতে পারবেন তো?

Advertisement

ট্রেন থেকে নেমে বারুইপুর স্টেশনে দাঁড়িয়ে এইসব কথাই ভাবছিলেন নিখিলেশবাবু, এমন সময় দেখলেন ওঁর ছোটোবেলার বন্ধু তথাগত সেন হন্তদন্ত হয়ে ওঁর দিকে এগিয়ে আসছেন। উনি বারুইপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক। নিখিলেশবাবুও এক সময় এই স্কুলে পড়তেন। নিখিলেশবাবু তথাগত সেনের ক্লাসমেট ছিলেন। আগামী কাল স্কুলের প্রতিষ্ঠা-দিবস। সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ। তাই একটা অনুষ্ঠান করে প্রতিষ্ঠা-দিবস উদ্‌যাপন করা হবে। নিখিলেশবাবু সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হয়ে এসেছেন। প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা এখনকার ছাত্রদের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন। অনুষ্ঠানের দায়িত্বে আছেন তথাগত সেন। তাঁরই অনুরোধে নিখিলেশবাবু একদিন আগে বারুইপুরে এসে পৌঁছেছেন। আজ সন্ধেবেলা দুই বন্ধু মিলে পুরনো দিনের অনেক গল্প করবেন।
তথাগত সেন আজ একাই আছেন বাড়িতে। পরিবারের সবাই বিয়েবাড়ি উপলক্ষে লক্ষ্মীকান্তপুর গিয়েছে। উনি স্কুলের অনুষ্ঠানের জন্য যেতে পারেননি। কাল বিকেলে যাবেন।
ঠিক হয়েছিল মাছের ঝোল, ভাত খেয়ে খানিক দিবানিদ্রা দেওয়ার পর দুই বন্ধু মিলে একটু বেড়াতে বেরবেন। নিখিলেশবাবুর খুব ইচ্ছা পুরানো জায়গাগুলোকে একবার নতুন করে দেখার। কিন্তু বিধি বাম। সেজেগুজে বেড়াতে বের হবেন, এমন সময় স্কুলের দু’জন শিক্ষক এসে হাজির। তথাগত সেনের সঙ্গে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে অলোচনা করবেন।
এখন শীতের শুরু। এই সময় মফস্‌স঩লে একটু তাড়াতাড়ি সন্ধে নামে। একেই সবকিছু পাল্টে গিয়েছে, তার ওপর অন্ধকার হয়ে গেলে পুরনো জায়গাগুলোকে আর চেনাই যাবে না। তাই আর অপেক্ষা না করে নিখিলেশবাবু একাই বেরিয়ে পড়লেন। রাসমাঠ, আনন্দময়ী মায়ের মন্দির, চৈতন্যদেবের চরণচিহ্ন রেখে যাওয়া মহাপ্রভুতলা দেখে নিখিলেশবাবু যখন সদাব্রত ঘাটের দিকে যাচ্ছেন, তখন অন্ধকার নামতে শুরু করেছে।
‘নীলু, এই নীলু’ ডাক শুনে নিখিলেশবাবু পিছন ফিরে তাকালেন। নীলু নামে তো এখন আর কেউই ওঁকে ডাকে না। বারুইপুর স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুরা এই নামে ডাকত।
‘বিশু! তুই এখানে!’ নিখিলেশবাবু অবাক হয়ে দেখলেন আবছা অন্ধকারে ওঁর স্কুলের বন্ধু বিশ্বনাথ দাঁড়িয়ে রয়েছে। এত বছর পরেও বিশ্বনাথের চেহারা খুব একটা পাল্টায়নি। তাই একবার দেখেই নিখিলেশবাবু পুরানো বন্ধুকে চিনতে পেরেছেন।
একগাল হেসে বিশু বলল, ‘চল, সেই আগের মতো ঘাটের ধারে গিয়ে বসি।’
নিখিলেশবাবু অন্ধকার নামার আগেই ফিরে যেতেন। কিন্তু এতদিন পর পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা, একটু গল্পগাছা না করলে চলে। তাই বিশুর সঙ্গে ঘাটের সিঁড়িতে বসে পড়লেন। এই জায়গাটা বেশ নির্জন। আশপাশে কোনও মানুষজন নেই। নিখিলেশবাবুর গা-টা একটু ছমছম করে উঠল।
দুই বন্ধু মিলে বেশ খানিকক্ষণ গল্প করলেন। স্কুলের সেইসব স্মৃতি, সে কি আর ভোলা যায়!
অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে দেখে নিখিলেশবাবু বললেন, ‘আজ উঠি রে। কাল স্কুলে আসছিস তো? তখন আবার বাকি গল্প করা যাবে।’
বিশু কোনও জবাব না দিয়ে ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট বাক্স বের করল। মিষ্টির বাক্স। নিখিলেশবাবুর হাতে দিয়ে বলল, ‘তোর মনে আছে নীলু, আমি তোকে জয়নগরের মোয়া খাওয়াব বলেছিলাম। কিন্তু তুই হঠাৎ করে স্কুলে আসা বন্ধ করে দিলি। তোর সঙ্গে আর দেখা হল না। তোকে জয়নগরের মোয়াও খাওয়ানো হল না। তাই আজ তোর জন্য দুটো মোয়া নিয়ে এসেছি। তুই আমার সামনে খেয়ে যা।’
নিখিলেশবাবুর মনে পড়ল, তখন শীতের সময় বারুইপুরে অনেক মোয়ার দোকান বসত। দোকানের ওপর বড়ো বড়ো করে লেখা থাকত জয়নগরের মোয়া। উনি একদিন টিফিনে মোয়া নিয়ে গিয়েছিলেন। বিশু খেয়ে বলেছিল, ‘দুর, দুর, এটা জয়নগরের মোয়া নয়। জয়নগরের মোয়ার টেস্টই আলাদা। আমার মামারবাড়ি জয়নগরে। আমি একদিন তোকে জয়নগরের মোয়া খাওয়াব। আসল জয়নগরের মোয়া।’
বিশু ছিল ক্লাসের সবচেয়ে ডানপিটে ছেলে। কোনও দিনও পড়া করে আসত না। সারাক্ষণ খালি দৌড়াদৌড়ি আর লাফালাফি। মাস্টারমশাইরা রোজই ওকে বকুনি দিতেন, কান মুলে দিতেন। কিন্তু বিশু কিছুতেই কথা শুনত না। দুষ্টু ছিল বলে কেউ ওকে তেমন পছন্দ করত না। শুধু নিখিলেশবাবুর সঙ্গেই বিশুর বন্ধুত্ব ছিল। নিখিলেশবাবুর বাবার ছিল বদলির চাকরি। কোনও জায়গাতেই বছর তিনেকের বেশি থাকতেন না। তাই নিখিলেশবাবুর বন্ধুর সংখ্যাও বেশ কম ছিল। নতুন জায়গায় গিয়ে বন্ধুত্ব পাতানোর আগেই সেখান থেকে চলে যাওয়ার সময় এসে যেত। তবে বারুইপুরে এসে খুব কম সময়ের মধ্যেই বিশুর সঙ্গে ওঁর বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। তারপর একদিন হঠাৎ করে নিখিলেশবাবুর বাবার ট্রান্সফার অর্ডার এসে গেল। তখন বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে স্কুলে ছুটি পড়ে গিয়েছে। তাই বারুইপুর ছেড়ে যাওয়ার আগে বিশুর সঙ্গে আর দেখা হয়নি। 
‘কী রে, কী ভাবছিস? মোয়া দুটো খা,’ মোয়ার বাক্সটা নিখিলেশবাবুর দিকে এগিয়ে দিয়েছে বিশু। এই ভরসন্ধেবেলায় মোয়া খাওয়ার তেমন ইচ্ছা ছিল না নিখিলেশবাবুর। কিন্তু বন্ধুর কথা কী আর ফেলা যায়! তাই বিশুর দেওয়া মোয়া দুটো টপাটপ খেয়ে নিলেন নিখিলেশবাবু। সত্যি! বিশু মিথ্যে বলেনি, এ মোয়ার স্বাদই আলাদা।
বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় নিখিলেশবাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাল স্কুলে আসছিস তো?’ কিন্তু এবারেও বিশু কোনও জবাব দিল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিখিলেশবাবুকে বলল, ‘তুই অনেকদিন ধরে একটা ভূতের গল্প লেখার প্ল্যান করছিস, কিন্তু কিছুতেই গল্পটা লিখতে পারছিস না!’
বিশুর কথা শুনে নিখিলেশবাবু খুব অবাক হলেন। এই ভূতের গল্প লেখার ব্যাপারটা তো উনি কাউকে ঘুণাক্ষরেও টের পেতে দেননি। তাহলে বিশু জানল কী করে?
‘ভূতের গল্প লিখতে চাইছি, কিন্তু লিখতে পারছি না, এটা তুই জানলি কী করে? আমি তো এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বলিনি’
নিখিলেশবাবুর প্রশ্নের উত্তরে বিশু বলল ‘আমি এমন অনেক কিছুই জানতে পারি যেটা অন্যরা পারে না।’ তারপর একটু থেমে বলল, ‘এবার দেখবি, তুই ঠিক ভূতের গল্প লিখতে পারছিস। আসি।’
রাতে লুচি-মাংস খেতে খেতে নিখিলেশবাবু তথাগত সেনকে বিশুর সঙ্গে দেখা হওয়ার কথাটা বললেন।
‘কার সঙ্গে দেখা হয়েছে বললি? বিশু? মানে আমাদের ক্লাসের বিশ্বনাথ?’ খাওয়া থামিয়ে পরপর তিনটে প্রশ্ন করলেন তথাগত সেন।
নিখিলেশবাবু মাংসের টুকরোয় কামড় দিয়ে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন।
‘কিন্তু ওর সঙ্গে তোর দেখা হবে কী করে? ও তো...।’ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন তথাগত সেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই ঠিক দেখেছিলিস তো?’
‘হ্যাঁ, বিশুই ছিল। আমাকে জয়নগরের মোয়া খাওয়াল।’
‘মোয়া খাওয়াল! কিন্তু বিশু তো অনেকদিন আগে মারা গিয়েছে?’
‘মারা গিয়েছে?’
‘হ্যাঁ, তুই যে বছর বারুইপুর ছেড়ে চলে গেলি, সেই বছরেই। পরীক্ষার পর মামার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে ওর এক মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে বাজি রেখে গাছে চড়ছিল। পা পিছলে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পায়। হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার আগেই সব শেষ।’ তথাগত সেন ম্লান মুখে নিখিলেশবাবুর দিকে তাকালেন।
নিখিলেশবাবুর মনে পড়ল চলে যাওয়ার সময় বিশু বলেছিল ‘এবার দেখবি, তুই ঠিক ভূতের গল্প লিখতে পারছিস।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ