সুতপা গুহ, আইজল: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মিজোরামের রাজধানী আইজল। কলকাতা শহরের থেকে প্রায় সাতগুণ ছোট। ছোট্ট এই শহরের সেই সৌন্দর্য বজায় রাখতে প্রশাসন যেমন সচেষ্ট, তেমনই বদ্ধপরিকর মিজোরামবাসীও। রাস্তায় নোংরা ফেলার কথা তাঁরা ভাবতেই পারেন না। সেই সংস্কৃতি মিশে গিয়েছে নতুন প্রজন্মের রক্তে। স্কুল যাওয়ার পথে নোংরা চোখে পড়লে তা তুলে নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দেয় পড়ুয়ারাও। এহেন আইজল শহরের প্রাণকেন্দ্র হল জারকাত, ডারপুই, চানমারির মতো এলাকা। এখানে আড়াই-তিন কিলোমিটার অন্তর এটিএম মিলবে। ভিতরে প্রায় প্রতিটি কাউন্টারে মেশিনের পাশে টাঙানো রয়েছে ছোট্ট একটি ব্যাগ। উপরে লেখা, ‘থ্যাংক ইউ, গুড জব’। ব্যাগগুলো কোনওটা কাপড়ের, কোনওটা বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান দিয়ে তৈরি। ভিতরে রয়েছে একগুচ্ছ এটিএম কার্ড। কিন্তু সেগুলি কার? কেউ জানে না। জানার প্রয়োজনও মনে করেন না বাসিন্দারা। শুধু বোঝেন, তাঁদেরই কোনও সহ নাগরিক হয়তো ভুল করে ফেলে গিয়েছেন সেটা। তাই সেটা সযত্নে সেই এটিএম কাউন্টারে রেখে দেওয়াটাই তাঁদের দায়িত্ব-কর্তব্য। যাতে কার্ডের মালিক পরবর্তীতে এসে সেটা নিয়ে যেতে পারেন। শুধু রাজধানী শহর নয়, তার বাইরে গেলেও একই চিত্র। রাজ্যের অধিকাংশ এটিএম কাউন্টারেই মিলবে এই কার্ড ‘ফেরত দেওয়ার’ ব্যাগ।
মিজোরাম অপরাধমুক্ত রাজ্য নয়। কিন্তু সেই হার জাতীয় গড়ের থেকে অনেকটাই কম। উত্তর-পূর্বের এই রাজ্য যাতে সেই ‘অপরাধমুক্ত’ তকমা অর্জন করতে পারে, সেই চেষ্টাতেই মরিয়া বাসিন্দারা। কারণ তাঁরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, মানসিকতার বদল ঘটলে সব সম্ভব। তাই শুধু এটিএম কার্ড নয়, হেলমেট-গুরুত্বপূর্ণ কাগজ-ব্যাগ এমনকী সব্জি হারিয়ে গেলেও তা তুলে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে আইজলের প্রতিটি প্রান্তে। করোনাকালের পর থেকে এই সংস্কৃতিতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন মিজোরামবাসী। নেপথ্যে ইয়ং মিজোরাম অ্যাসোসিয়েশন এবং স্থানীয়দের প্রচেষ্টা।
এই উদ্যোগকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন ব্যাঙ্ক আধিকারিকরাও। এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের আধিকারিক রিনমোয়া ভেনচ্ছাওয়াং ‘বর্তমান’কে বলেন, ‘ব্যাঙ্কের তরফে এটিএম কাউন্টারে এই ব্যাগগুলো লাগানো হয়নি। শহরের সচেতন নাগরিকরাই এই কাজ করেছেন। এটিএম কার্ডের উপর শুধুমাত্র গ্রাহকের নাম লেখা থাকে। কোনও কোনও কার্ডে আবার সেটাও থাকে না। তাই তা হারিয়ে গেলে ফেরত দেওয়া বেশ কঠিন কাজ। এজন্যই এই উদ্যোগ নিয়েছেন বাসিন্দারা। আমাদের ব্যাঙ্কগুলোতে কার্ড হারানোর অভিযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। কারণ, কোথাও হারিয়েছে সেটা মনে করতে পারলে সেটা ফেরত মিলবেই। এটা মিজোরামে স্বাভাবিক ছবি।’ আইজলের বাসিন্দা আইজ্যাকের মন্তব্য, ‘মিজোদের এই সংস্কৃতি বহু পুরনো। বিভিন্ন বাজার, বাসস্ট্যান্ডে উদ্ধার হওয়া জিনিসপত্র একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা হয়। যাতে সেই ব্যক্তি নিজের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ফিরে পান। আইজলের রাস্তায় আপনি কোনও গাড়ির অবাঞ্চিত হর্ন পর্যন্ত শুনতে পাবেন না। এমনকী সিগনাল লাল থাকলে মন্ত্রীর গাড়িও অপেক্ষা করে আর পাঁচটা গাড়ির মতো।’ ‘মাদক পাচারের ঘাঁটি’ থেকে ‘অপরাধমুক্ত রাজ্য’ গড়তে চায় মিজোরাম।