Bartaman Logo
৩ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

চিৎশক্তি

চিৎশক্তি আত্মস্বরূপের অন্তরঙ্গ শক্তি। আনন্দশক্তিও তাই; কিন্তু এমন একটি স্থিতি আছে যেখানে চিৎশক্তিও আত্মস্বরূপে সমরসভাবে বিরাজ করে বলিয়া তাহার প্রাধান্য লক্ষিত হয় না।

চিৎশক্তি
  • ৩ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

চিৎশক্তি আত্মস্বরূপের অন্তরঙ্গ শক্তি। আনন্দশক্তিও তাই; কিন্তু এমন একটি স্থিতি আছে যেখানে চিৎশক্তিও আত্মস্বরূপে সমরসভাবে বিরাজ করে বলিয়া তাহার প্রাধান্য লক্ষিত হয় না। কিন্তু সৃষ্টির পূর্ব্বে এই চিৎশক্তি ক্রিয়াত্মক রূপ ধারণ করে, অর্থাৎ চিৎস্বরূপে অক্ষুণ্ণ সাম্য থাকা সত্বেও চিৎশক্তি যেন উদ্রিক্ত হইয়া মহামায়াকে ক্ষুব্ধ করে। মহামায়া কুণ্ডলিনী বা বিন্দুরূপে বিশ্বের মূল উপাদান স্বরূপে অব্যক্ত রহিয়াছে। উহা আছে কি নাই তাহার কোন নিদর্শন নাই, কারণ উহা অব্যক্ত। কিন্তু পরমেশ্বরের স্বাতন্ত্র্যরূপা চিৎশক্তি ক্রিয়ারূপে প্রবলতা ধারণ করিলে বিন্দু ক্ষুদ্ধ হয়। তখন ঐ ক্ষুব্ধ বিন্দু হইতে নাদ ও জ্যোতির স্ফুরণ হয়। বস্তুতঃ নাদ ও জ্যোতি নিত্য বলিয়া এক হিসাবে বিন্দুক্ষোভের পূর্ব্ব হইতেই বিদ্যমান। তখনকার ঐ জ্যোতি পরম প্রকাশরূপে এবং নাদ পরনাদরূপে কোন কোন স্থানে বর্ণিত হইয়া থাকে। বিশ্বের দৃষ্টি অনুসারে ঐ পরিস্থিতিতে নাদ কিম্বা জ্যোতি কিছুরই কল্পনা করা যায় না, কারণ উহা অব্যক্ত পদ। কিন্তু চিৎশক্তি ক্রিয়াত্মক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নাদ ও জ্যোতি সমসূত্রভাবে সৃষ্টির মূল হইতেই ক্রমশঃ বহির্মুখে অধিকতর আত্মপ্রকাশ করিতে থাকে। এই জন্য চিৎশক্তির যেটা পরবিন্দুর অভিমুখ দিক্ সেটিকে নাদময় বলা চলে এবং যেটি উহার চিৎস্বরূপ পরমেশ্বরের অভিমুখ-দিক্‌ সেটিকে নাদাতীত বলা চলে। বস্তুতঃ চিৎশক্তিতে এইরূপ বিভাগ নাই এবং থাকিতেও পারে না। অর্থাৎ শক্তির বহির্মুখ অবস্থায়ই নাদ ও জ্যোতি স্বীকার করিতে হয়, কিন্তু শক্তির অন্তর্মুখ অবস্থায় বিন্দু অক্ষুব্ধ থাকে বলিয়া বা ক্রিয়াশক্তির উন্মেষ নাই বলিয়া সবই এক পরম অব্যক্তরূপে বিদ্যমান থাকে। তখন নাদ নাই, জ্যোতি নাই, বিন্দু নাই, এবং শিব-শক্তিও যেন নাই, অথচ সবই আছে এক অব্যক্ত মহাসত্তারূপে।এই জন্যই প্রাচীন আগমে পরবিন্দু ও পরনাদে কেহ কেহ অভেদ কল্পনা করিয়াছেন এবং কেহ কেহ ভেদ কল্পনা করিয়াছেন। দ্বৈতদৃষ্টিতে পরবিন্দু হইতে পরনাদ ভিন্ন—এই নাদ সৃষ্টির হৃদয়নিহিত বীজরূপ নাদ নহে, কারণ তাহা বিন্দু হইতে আবির্ভূত হয়। কিন্তু ইহা বিন্দুর অতীত। ইহাকে কোন তত্ত্বের মধ্যে ফেলা যায় না অথবা ফেলিতে হইলে বিশ্বাতীত শক্তিতে অন্তর্ভূত করা চলে। এই স্থলে পরনাদ ও বিশুদ্ধ সংবিৎ বা চিৎসত্তা একপ্রকার অভিন্ন। অদ্বৈতদৃষ্টিতে পরাবাক্ আত্মার স্বরূপ-শক্তি এবং স্বরূপ হইতে অনতিরিক্ত বলিয়া চিদ্রূপা। পরা শক্তি ও পরা বাক্ অভিন্ন—এই জন্যই এই শক্তিকে বোধের নিত্য-সিদ্ধ বাগ্‌রূপা শক্তি বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে, যাহার অভাবে প্রকাশ প্রকাশমান হইয়াও ‘স্বয়ংপ্রকাশ’ পদ-বাচ্য হইতে পারে না। এই পরা বাক্‌ই আত্মার নিজের বিমর্শরূপা স্বরুপানুবন্ধিশক্তি।

Advertisement

বিন্দু ক্ষুব্ধ হওয়ার পরে যে নাদ ও জ্যোতির প্রাকট্যের কথা বলা হইল তাহাই সৃষ্টির মূল। তবে মনে রাখিতে হইবে, সৃষ্টির মূলে সর্বত্রই দুইটি ব্যাপার বিদ্যমান রহিয়াছে।
 ‘শ্রী ওঙ্কারনাথ-রচনাবলী’ (১০ খণ্ড) থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ