অভিষেক পাল, বহরমপুর: বাংলা বললেই বাংলাদেশি! হিন্দি বলয়ে লাগাতার আক্রান্ত হচ্ছেন বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা। পেটের টানে ভিনরাজ্যে গিয়ে জুটছে গণপিটুনি, অকথ্য নির্যাতন। মারের চোটে মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে। আতঙ্ক গ্রাস করেছে মুর্শিদাবাদ জেলার পরিযায়ী শ্রমিক অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে। কিন্তু, বাইরে না গিয়ে বাড়িতে বসে থাকলে তো আর পেট চলবে না! উপায় খুঁজতে গিয়ে এখন হিন্দি ভাষা শিখছেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। ভিনরাজ্যে হিন্দিতে কথা বললে নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি মিলতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা। প্রতিষ্ঠান বা কোনও ইনস্টিটিউশনে হিন্দি শিখতে প্রচুর খরচ। তাই ইউটিউব দেখে হিন্দি বলা রপ্ত করছেন। কখনও একা একা আবার কখনও দলবেঁধে হিন্দিতে কথা বলা দক্ষতা অর্জন করছেন।
বুধবার রাতে ওড়িশার সম্বলপুরে বাংলার যুবককে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ উঠল একদল বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীর বিরুদ্ধে। শুধুমাত্র বাংলা বলার কারণেই মুর্শিদাবাদের সূতির পরিযায়ী শ্রমিক জুয়েল রানাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। প্রকাশ্যে চায়ের দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় বাংলা ভাষায় কথা বলছিলেন রানা। তাতে সন্দেহ হয় স্থানীয়দের। বিজেপির মাতব্বররা সেখানে গিয়ে সবার আধার কার্ড দেখতে চায়। সেটা দেখানোর পরও রেহাই মেলেনি। মারতে মারতে রানাকে মেরেই ফেলা হয়। তাঁর দুই সঙ্গীকে গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি।
ঘটনার কথা জানাজানি হতেই জেলাজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এর আগেও মুর্শিদাবাদের একাধিক পরিযায়ী শ্রমিক ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। ঘর ছেড়ে মোটা টাকা রোজগারের আশায় পরিযায়ী শ্রমিকরা ভিন রাজ্যে কাজে যান। অধিকাংশই রাজমিস্ত্রির ঠিকা শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। অনেকে সাফাই এবং অন্যের বাড়িতেও কাজ করেন। কিন্তু অধিকাংশ কনস্ট্রাকশন সাইটে থাকা বাংলার শ্রমিকরা যখন একসঙ্গে থাকেন, তখনই তাঁদের উপর নেমে আসছে অত্যাচারের খাঁড়া। হিন্দি বলয়ে কাজ করতে গিয়ে কিছুটা হিন্দি শিখলেও লোকজনের সঙ্গে কথা বলার সময় ঘাবড়ে যাচ্ছেন তাঁরা। তাতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। অত্যাচারের মাত্রা বাড়ছে। তাই পরিবারের লোকজনের পরামর্শে অবসর সময়ে ইউটিউবে হিন্দি শেখার চেষ্টা করছেন।
নতুন বছরে অনেকেই বেঙ্গালুরু এবং মুম্বইতে কাজে যাবেন। তাঁরাও এখন হিন্দি শিখতে শুরু করছেন। কেউ প্রতিবেশী হিন্দি জানা ব্যক্তিদের কাছ থেকে হিন্দি শিখছেন। আবার কেউ কেউ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করে হিন্দি ভাষা রপ্ত করছেন। দৌলতাবাদের পরিযায়ী শ্রমিক রতন শেখ বলেন, ‘পাঁচ বছর ধরে ওড়িশায় কাজ করছি। এমন সমস্যায় কখনও পড়িনি। তবে কিছুটা হিন্দি আমি বলতে পারি। এলাকার লোকজন যখন একসঙ্গে থাকি তখন তো বাংলাতেই কথা বলি। বাংলায় কথা বলতে দেখলেই আমাদের উপর অত্যাচার শুরু করছে। ভয়ে অনেকে কাজ ফেলে গ্রামে ফিরছেন। এই পরিস্থিতিতে বাইরে কাজে যেতেই এখন ভয় করছে।’ সূতির পরিযায়ী শ্রমিক লিয়াকত হোসেন বলেন, ‘বাইরে কাজে যাব। তাই হিন্দি বলা প্র্যাকটিস করছি। জানি না পারব কিনা।’