কয়েক বছর পাশ্চাত্য দেশে থাকার ফলে ধর্মীয় পরিবেশ আমি বেশ ভালই বুঝতে পারি। ভারত বেদান্তের দেশ, যা বিশ্বাস করে, সকল প্রাণীর ভাগ্য-নিয়ন্তা এক ঐশ্বরিক শক্তি আছে। বেদান্ত বিশ্বাস করে না যে, একটি অচেতন বিধি সব চেতন জীবের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। অবশ্যই এক চৈতন্য-সত্তা, বুদ্ধিমান শক্তি আছেন যিনি পরম নিয়ন্তা ও পথ প্রদর্শক। ‘ন্যায়-সূত্রে’র একটি সূত্রে পাওয়া যায়: “ঈশ্বরই পরমকারণ, যেহেতু মানুষ যে কর্ম করে তা সব সময় ফল প্রসব করে না”। ভারতের বিভিন্ন দর্শন শাস্ত্রের মধ্যে একমাত্র বেদান্তই ঈশ্বর সম্বন্ধে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে তাই বেদান্তের-শ্রেষ্ঠত্ব যেমন স্বীকৃত, এর প্রসারও তেমন ব্যাপক। কিন্তু যে-সকল দার্শনিক মতবাদ ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করেনি তারা হয় নিজ দেশ থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে অথবা বেদান্তের মূল ধারায় মিশে গেছে।
আমরা বিরাট আকারের যন্ত্র, ও খুব জটিল ধরনের কমপিউটারের কথা শুনি এবং তাদের দক্ষ কার্যকারিতা দেখে প্রভাবিত হই। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে, এর পেছনে বুদ্ধিমান সত্তাসকল আছে যারা এগুলি সৃষ্টি করেছে বা চালাচ্ছে ঠিক তেমনি, যদিও মনে হয় এই অনন্ত ও রহস্যময় বিশ্ব আপন স্বভাবে চলছে, কিন্তু একে চালাচ্ছেন এক বিশ্ব-সত্তা, যিনি স্বরূপতঃ পরম বোধশক্তি হয়েও সর্বভূতে অনুস্যূত হয়ে বিরাজ করছেন। জমিতে বীজ বপন করে জল দাও। বীজ অঙ্কুরিত হয়ে বড় হবে। আমাদের কি এটা বিশ্বাস করতে হবে যে, কোন ব্যক্তি বা দেবতা, নারায়ণ বা শিব বৈকুণ্ঠে বা কৈলাসে বসে বীজের ঐ রূপান্তর সাধন করাচ্ছেন? সর্বভূতেই ঈশ্বর অন্যস্যূত হয়ে বিরাজমান। সর্বানুস্যূত এই দৈব সত্তাই জীবনের সকল ব্যাপার নিয়ন্ত্রণ করেন। কিছু কিছু পাশ্চাত্য দার্শনিকও এক সর্বানুস্যূত বিশ্ব-ইচ্ছার কথা বলেন। কর্মবাদ এই ঐশ্বরিক ইচ্ছার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে ঈশ্বর স্বয়ং এই নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে, তিনি এর অধীন নন। তিনি নিত্য শুদ্ধ-মুক্ত ও পরম চিদানন্দস্বরূপ।
বেদান্ত একথাও বলে যে, মানুষের সব সময় কাজ করে যাওয়ার প্রয়োজন। অন্তর্নিহিত সত্তা বিকশিত না হওয়া পর্যন্তই কর্ম করা বিধেয়। যখন জীব নিজের স্বরূপকে ঈশ্বর-সত্তা থেকে অভিন্নরূপে অনুভব করে তখন সে সকল কর্মের গণ্ডির বাইরে চলে গিয়ে মুক্ত হয়। বেদান্তমতে জন্ম-মৃত্যুর আবর্ত থেকে মুক্তিই জীবনের উদ্দেশ্য। আমরা দেখি এ বিষয়ে দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে মুণ্ডক উপনিষদ্ একটি সুন্দর রূপকের অবতারণা করেছেন: মনোরম পালকবিশিষ্ট দুটি পাখি একই বৃক্ষে বসে রয়েছে। একটি পাখি ঐ বৃক্ষের তিক্ত বা মিষ্ট ফল ভক্ষণ করছে; অন্যটি বৃক্ষের চূড়ায় বসে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভাবে দেখছে। কিছু সময় পরে নিচের পাখিটি উপরের পাখিটির দিকে তাকিয়ে থেকে অনুভব করে উপরের পাখিটির সঙ্গে তার কোন ভেদ নেই; সেও ফল খাওয়া ত্যাগ করে ও পরম শান্তির অধিকারী হয়। নিচের পাখিটি হচ্ছে জীব—একটি জীবাত্মা যা কর্ম পাশে বদ্ধ থেকে বার বার সুখ ও দুঃখ ভোগ করে। যখন জীব পরমাত্মার—উপরের পাখি যার প্রতীক তার—সঙ্গে একত্ব অনুভব করে তখন সে সকল আসক্তি ও বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করে স্ব-মহিমায় বিরাজ করে।
কর্ম-বন্ধনে জড়িয়ে চক্রে পিষ্ট হবার প্রয়োজন নেই। দুঃখময় চক্রের দাঁত হতে মুক্তি-লাভের উপায় আছে। ভগবদগীতায় কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হবার সহজ পথ অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, “সকল ধর্মাধর্ম পরিত্যাগ করে একমাত্র আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সকল বন্ধন থেকে মুক্ত করব। অতএব শোক করো না”।
স্বামী যতীশ্বরানন্দের ‘ধ্যান ও আনন্দময় জীবন’ থেকে