অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশে আর ৪৬ দিন পর জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। এক উত্তাল ছাত্র-যুব আন্দোলনের জেরে গত বছরের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়তে হয়েছে শেখ হাসিনাকে। পতন হয় আওয়ামি লিগ সরকারের। সেই থেকে গত ষোলো মাস ধরে এক অস্থির সময়ের সাক্ষী বাংলাদেশ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। দেড় মাস বাদের সেই নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও অবাধ হবে—তা নিয়ে ইতিমধ্যেই সন্দেহ দানা বেঁধেছে। অনেকের ধারণা, এবারের নির্বাচন রক্তক্ষয়ী হতে চলেছে। পরিস্থিতি যাই হোক, খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের ১৭ বছর বাদে দেশে ফেরার পর যে পড়শি দেশে ভোটের হাওয়া গরম হতে শুরু করেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষণা হওয়ায় হাসিনার দল আওয়ামি লিগ এবারের নির্বাচনে নেই। ফলে মূল লড়াই হতে চলেছে তারেকের দল বিএনপির সঙ্গে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট জামায়েত ইসলামির। বিএনপি-র সরকার চালানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে তাদের একটি তৈরি ভোটব্যাংক রয়েছে। এই নির্বাচনে হাসিনার দল না থাকায় আওয়ামি লিগের প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটের অনেকটাই বিএনপির ঝুলিতে যেতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। রাজনীতির কারবারিদের একাংশের মতে, বাংলাদেশে যাঁরা হাসিনার অপসারণ মেনে নিতে পারছেন না, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের ধারণার পক্ষে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে যাঁরা কট্টর মৌলবাদী জামাতের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা উচিত বলে মনে করেন— এই মতের একটা বড় অংশ বিএনপির সমর্থক না হলেও এবার ভোটটা জিয়ার দলকে দিতে পারেন। তারেক ফিরে আসার পর থেকে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস যেন সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ঘটনা পরম্পরা বলছে, ঢাকার মাটিতে তারেকের পদার্পণের পর থেকেই জামাত ও তার মূল জোটসঙ্গী এনসিপি দলের মধ্যে পরস্পর বিরোধী মতামত মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে। গত বছর জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের একটি অংশ মিলে তৈরি করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনুসের আশীর্বাদধন্য এই দলের জন্মই হয়েছে চূড়ান্ত ভারত বিরোধিতার মধ্য দিয়ে। জামাত তাদের স্বাভাবিক মিত্র। অতএব দুই-দুই চারের অঙ্ক মিলিয়ে এই জোট বাংলাদেশের মসনদ দখল করতে মরিয়া হবে— সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই জোট নিয়ে দুই শিবিরেরই একটি অংশ নানা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। জামাতের বেসুরো অংশ চায় শুধুমাত্র ইসলামি দলগুলোর জোট এবং তাদের অভিন্ন প্রার্থী। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে জামাত-জোটের দুই গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি দল আলাদা কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, এনসিপির মধ্যেও ফাটল দেখা যাচ্ছে। এই দলের একটি অংশ জামাতের সঙ্গে জোট গড়ে ভোটে যেতে চাইলে অন্য একটি অংশ বেঁকে বসেছে। এই অংশের বক্তব্য, দেশে মৌলবাদী হিংসার পিছনে জামাত রয়েছে বলে মনে করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। তারেককে নিয়ে উচ্ছ্বাস ও জনতার ঢল সেই বার্তাই দিচ্ছে। অতএব এই কট্টর মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে জোট করে ভোটে গেলে তা হবে দলের ভাবনার পরিপন্থী। ঘটনা হল, এনসিপির দুই শীর্ষ স্তরের নেতা ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকে ইস্তফাও দিয়েছেন। ফলে শেষপর্যন্ত বিএনপি-বিরোধী জোট কতটা দানা বাঁধবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
বাংলাদেশের নির্বাচন সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও পড়শি দেশ হিসেবে ভারতের মাথাব্যথার যথেষ্ট কারণ আছে। গত ষোলো মাস ধরে যেভাবে বিশেষত সে দেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের উপর হামলার ঘটনা ঘটে চলেছে, তা ভারতের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সঙ্গতভাবেই ভারত কড়া হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। হাসিনার জমানায় দুই দেশের মধ্যে যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, আজ তা অনেকটাই ফিকে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের ভোট ভারতের কাছেও কূটনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত যে বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন চায় এবং তারেকের প্রত্যাবর্তন সেই দৃষ্টিতেই দেখা প্রয়োজন— সে কথা দিল্লির তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, জামাত পুরোমাত্রায় পাকিস্তানের কথা বলা ভারতবিরোধী শক্তি। ভারত বিরোধিতাকে পুঁজি করেই তারা ভোটে লড়বে। এই একই মনোভাব এনসিপি-সহ জুলাই আন্দোলনের একটি বড় অংশের। বাংলাদেশে সদ্য খুন হওয়া ওসমান হাদির দল ইনকিলাব মঞ্চের ভারত বিরোধিতার কথাও সকলেরই জানা। এই প্রেক্ষাপটে জামাতের মতো মৌলবাদী দলের জোটকে ঠেকাতে বিএনপিই উপযুক্ত বিকল্প হতে পারে বলে হয়তো-বা মনে করছে দিল্লি। এমন নয় যে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খুবই মসৃণ। কিন্তু এই মুহূর্তে অনেক বড় ‘শত্রু’ জামাত-জোটকে ঠেকাতে এবং কূটনৈতিক আলোচনার পথ খুলে রাখতে বিএনপি-র জয় সম্ভবত দিল্লির কাছে কাম্য। সামগ্রিক এই পরিস্থিতি অনুধাবন করেই তারেক শান্তি, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বার্তা দিয়েছেন। হাসিনাকে নিয়ে কোনও মন্তব্যই তিনি করেননি। সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের ভোট নিয়ে সব পক্ষেরই জল মাপা শুরু হয়েছে।